প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গতিশীল পুঁজিবাজারের প্রত্যাশা দেড় কোটি মানুষের

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে বিও রয়েছে ২৯ লাখ ২১ হাজার। তবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেড় কোটি মানুষ। এসব মানুষের ভালো থাকা, না-থাকা নির্ভর করে পুঁজিবাজারের সার্বিক অবস্থার ওপর। বাজার ভালো থাকলে এরা ভালো থাকেন, আবার বাজার মন্দা গেলে এদের অবস্থা খারাপ হয়। শুরু হয় ভাগ্য নিয়ে টানাটানি। যে কারণে এ বাজারের ধারাবাহিক গতিশীলতা নিয়ে স্বপ্ন দেখেন তারা।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পুঁজিবাজারে ছাত্র থেকে শুরু করে সব শ্রেণির বিনিয়োগকারী রয়েছেন। এদের কেউ অন্য পেশায় থেকে শেয়ার ব্যবসা করছেন। কেউ জীবনের শেষ সম্বল পেনশনের টাকা নিয়ে এসেছেন এ মার্কেটে। এখানে এমন অনেক বিনিয়োগকারী রয়েছেন, যাদের শেয়ার ব্যবসা ছাড়া অন্য কিছু নেই। এককথায় তাদের সংসারে চলে শেয়ার ব্যবসা করে। ফলে পুঁজিবাজারের যখন ছন্দপতন হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন এসব বিনিয়োগকারী। এর সবচেয়ে বড় প্রতিফল পাওয়া যায় ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসে। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ এ প্যাকেজ ঘোষণা করে। এ প্রণোদনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের সুদ মওকুফ ও কোটা  নিশ্চিতকরণ। গঠন করা হয় বাংলাদেশ ফান্ড। বাজারকে সহায়তা দেওয়ার জন্য শেয়ার কিনতে এগিয়ে আসে আইসিবিসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু কিছুতেই বাজারের পতন ঠেকানো যায়নি।

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বর্তমানে বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। কিন্তু পুঁজিবাজারে এখন যারা রয়েছেন তাদের বেশিরভাগ দীর্ঘদিন থেকে লোকসানে রয়েছেন। বিশেষ করে যারা ২০০৯-১০ সালে বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের পোর্টফোলিওতে এখনও লোকসান রয়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। ফলে নতুন করে লোকসান হলে তাদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। যে কারণে বিনিয়োগ নিয়ে দোলাচলে রয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ২০০৯-এর শেষের দিকে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ডিএসইর সূচক প্রায় ১২০০ পয়েন্ট বেড়ে ৮৯১৮-এ দাঁড়ায়। আর ডিএসইর লেনদেন গিয়ে দাঁড়ায় ৩২৪৯ কোটি টাকায়। ঊর্ধ্বমুখী বাজারে কোনো কোনো শেয়ার ৩০০ থেকে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত অতি মূল্যায়িত হয়ে পড়ে। এর পরপরই বাজারে ধস নামে। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর এক দিনের ব্যবধানে সূচকের পতন হয় ৬০০ পয়েন্ট। তখন যারা ধসের মুখে পড়েছিলেন তারা এখনও লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, তখন বাজারে ধস নামার প্রধান কারণ ছিল পুঁজিবাজার নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ অন্যদের  ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা। এছাড়া তখন ব্যাংকগুলো শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে বাজার থেকে সরে পড়ে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। নিজেদের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে যান বড় বড় বিনিয়োগকারীরা। ফলে পুঁজিবাজারে চরম হতাশা নেমে আসে। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই। ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগ সমন্বয় করায় পুঁজিবাজারে এখন ব্যাংকের ভূমিকা সন্তোষজনক। ঢেলে সাজানো বিএসইসিও বাজার নিয়ে তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও এখন বাজারমুখী। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজার  পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অবস্থায় এই বাজার নিয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে ২৯ লাখ বিনিয়োগকারী বা দেড় কোটি মানুষের ভোগান্তি নেমে আসে।

এ প্রসঙ্গে  ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক মো. রকিবুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা অনেক আশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন তাদের সেই আশার পূর্ণতা পেতে শুরু করেছে। ফলে এখন এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ এ বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখো বিনিয়োগকারী। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখ লাখ পরিবার। কারণ এ বাজারের সঙ্গে লাখ লাখ পরিবারের সদস্যদের ভাগ্য বাঁধা। তবে বিনিয়োগকারীদের একটা কথা বলতে চাই, তারা যেন হাতের সব টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ না করেন।  টাকাটা ভিন্ন ভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কম থকে। আমি মনে করি ১৯৯৬ কিংবা ২০১০-এ যারা সব পুঁজি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এটা ঠিক নয়। বিনিয়োগকারী ভাইবোনদের বলব, পুঁজি আপনার, সুতরাং এর নিরাপত্তা আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে।’

অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, ‘এখন বাজারে অতিমূল্যায়িত শেয়ারের সংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদর রয়েছে হাতের নাগালে।’

তিনি বলেন,  ‘বাজার দিন দিন স্বাভাবিক হচ্ছে, এটা ভালো দিক। তবে এ বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ধরে রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের। আশা করি, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন।’

ডিএসইর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী  বলেন, ‘এ কথা ঠিক, এই বাজারের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য জড়িত রয়েছে। সেজন্য সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। আর বিনিয়োগকারীদেরও সচেতন হতে হবে। কারণ তারা সচেতন থাকলে পুঁজিবাজার ভালো থাকবে। আর পুঁজিবাজার ভালো থাকলে তারাও তাদের পরিবার নিয়ে ভালো থাকতে পারবেন।’

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারি তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘২০১০ সালে কিছু মানুষের জন্য লাখ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘বাজার ভালো থাকলেই সুযোগ-সন্ধানীরা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। তাই বিনিয়োগকারীদের নিরাপদে রাখার জন্য বাজারের প্রতি কঠোর নজরদারি রাখা দরকার।’