দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

গত বছরের মতো এবারও দাম নেই চামড়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক: গতবারের বিরূপ অভিজ্ঞতা আর মহামারির মধ্যে চাহিদা কম থাকবে ধরে নিয়ে এবার উধাও হয়ে গিয়েছিল ফড়িয়ারা। পাশাপাশি ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের কয়েকশ’ কোটি টাকা পাওনা বকেয়া পড়ে থাকা এবং মহামারিকালে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এবার চামড়ায় বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। আর দাম না পেয়ে এ বছরও অনেক জায়গায় চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছেন, কেউ পুঁতে ফেলেছেন।

সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার নির্ধারিত দাম বেঁধে দিলেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর চেয়ে অনেক কম দামেই বিকিকিনি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকায়ও, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনি¤œ। এক বছর আগেও এসব চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় হাতবদল হয়েছে। এবার যত বড় চামড়াই হোক কোনো কোরবানিদাতা কিংবা সংগ্রহকারী ৬০০ টাকার বেশি দাম পাননি।

এ বছর সরকার প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়া ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকায় নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থাৎ আড়তদাররা মাঝারি মানের (২২ ফুট আয়তন) একটি চামড়া ট্যানারিতে বিক্রি করবেন ৭৭০ টাকা থেকে ৮৮০ টাকায়। গত বছর এসব চামড়া বিক্রি হয়েছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়। এ বছর একই মানের চামড়াই কোরবানিদাতাদের কাছে থেকে কেনা হয়েছে গড়ে ৩০০/৪০০ টাকা দরে।

দেশে চামড়ার চাহিদার বেশিরভাগ অংশই পূরণ হয় কোরবানির ঈদে জবাই হওয়া পশু থেকে। এবার ৭০ লাখ গরু জবাই হবে বলে ধারণা করা হলেও হয়েছে ৫০ লাখের মতো বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছাগল ২০ লাখ জবাই হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অপরদিকে কোরবানির চামড়া তিন হাত হয়ে ট্যানারিতে পৌঁছে। কোরবানিদাতার কাছ থেকে তা কিনে নেন মৌসুমি ব্যবসায়ীর, যাদের ফড়িয়া বলা হয়। তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কেনেন আড়তদাররা। সেই চামড়া লবণ মাখিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর বিক্রি করা হয় ট্যানারিতে, যেখানে তৈরি হয় চামড়াজাত নানা পণ্য। গত বছর ফড়িয়ারা যে দরে চামড়া কিনেছিলেন, বিক্রি করতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা কেনা দামও পাননি। তখন অনেকে চামড়া রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলেন কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলেছিলেন। এবার করোনাভাইরাস মহামারিতে চামড়া সরকারি দরও কমে যাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চামড়া কিনতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ হারান। ফলে অনেক স্থানে কোরবানির চামড়ার ক্রেতাই পাওয়া যাচ্ছিল না।

চট্টগ্রামের চৌমুহনীর আড়তে মো. আলম নামে একজন বলেন, আগের বছরগুলোতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ফড়িয়ারা চামড়া নিয়ে এখানে আসত। আর আমরা তাদের কাছ থেকে কিনে নিতাম। এবার সে সংখ্যা কম। গত বছর অনেকেই চামড়া কিনে যে ক্ষতিতে পড়েছিলেন তা পুষিয়ে উঠতে পারেননি। যার কারণে এ বছর অনেকই চামড়ার মৌসুমি ব্যবসা করছেন না।

একাধিক আড়তদার জানান, প্রতিটি চামড়ার মধ্যে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা চালান দিতে হয়। সেই হিসাব ধরে মাঝারি মানের চামড়াগুলো ৬০০ টাকা করে কেনা হয়েছে। এর থেকে বেশি দিয়ে কিনতে গেলে সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী আড়তের লভ্যাংশ থাকে না। এখন কেউ যদি মাঠপর্যায়ে ৩০০/৪০০ টাকায় চামড়া কেনে, সেটা ভিন্ন হিসাব। দেখা গেছে ৩০০ টাকায় কিনে অনেকে আড়তে ৬০০ টাকা করে বিক্রি করছেন, অর্থাৎ অতি মুনাফা করছেন। আড়তদারদের পাশাপাশি কিছু ট্যানারিকেও প্রতিনিধি পাঠিয়ে সরাসরি চামড়া কিনেছেন।

সদর ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ চৌধুরী বলেন, আমরা কোরবানির দিন ও এর পরের দিন ৬৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকায় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছি। এটি সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি। ঢাকার আশেপাশে আমাদের ২০০ লোক কাজ করেছে। প্রথম দিন ১৯ হাজার পিস চামড়া এবং দ্বিতীয় দিন আরও ১০ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।

অপরদিকে গত বছর আড়তদাররা বকেয়া না পাওয়া পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিলে দেখা দেয় সংকট। পরে সরকারের মধ্যস্থতায় সেই জট খোলে। ট্যানারি মালিকদের কাছে কী পরিমাণ বকেয়া পাওনা রয়েছে আড়তদারদের, তার স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। গত বছর হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেছিলেন, এ অঙ্ক অন্তত ৪০০ কোটি টাকা। এ বছর করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্বের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় ট্যানারিগুলো থেকে আড়তদারদের পাওনা আদায়ে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।

হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, আড়তদাররা বকেয়া পেলে চামড়া কিনতে প্রতিনিধি পাঠাতে পারত। তাহলে বাজারের এ দশা হতো না। তিনি বলেন, সরকার এ খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে চাচ্ছে। কিন্তু আড়তদাররা ঋণ না নিয়ে তাদের বকেয়া টাকা উদ্ধারে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে। কারণ এভাবে ঋণ নিয়ে ট্যানারিতে বাকিতে চামড়া বিক্রি করলে সেই ঋণের ফাঁদ থেকে আর ওঠা যাবে না।

অন্যদিকে করোনাভাইরাস মহামারির আগে থেকে বিশ্ববাজারে চামড়ার দরপতন, দেশের ট্যানারিগুলোতে ফিনিশড লেদার জমে থাকায় চামড়া কেনার চাহিদা এবার ছিল কম। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

অপরদিকে কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়া আগামী ৮ আগস্ট (শনিবার) থেকে কেনা শুরু করবেন ট্যানারি মালিকরা। সরকার নির্ধারিত দামে আড়তদার ও ডিলারদের কাছ থেকে এ চামড়া সংগ্রহ করা হবে।

বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেন, ‘চামড়া ইস্যুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দোষ দেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দফায় দফায় বৈঠক করে সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের অভিমত নিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কাঁচা চামড়া নয়, লবণজাত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।’ স্বাভাবিকভাবেই কাঁচা চামড়ার দাম লবণজাত চামড়ার চেয়ে কম হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..