মত-বিশ্লেষণ

গর্ভকাল নিরাপদ করতে মায়েদের পরিচর্যা আবশ্যক

অধ্যাপক সেলিমা খাতুন: ডাক্তার আজ নিশ্চিত করলেন, রাবেয়া মা হতে চলেছে। শুরুতে রাবেয়া বুঝতে পারেনি বিষয়টি। বমি বমি ভাব, ক্লান্তি আর প্রচণ্ড মাথা ঘুরা ও মাথাব্যথা ছিল রাবেয়ার মর্নিং সিকনেস। হাঁটাচলার সমস্যা, পায়ে পানি আসা, খিটখিটে মেজাজ রাবেয়াকে বাধ্য করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে। রাবেয়া ভয় পেলেও গর্ভাবস্থায় এমন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়Ñজানিয়েছেন রাবেয়াকে তার চিকিৎসক।

গর্ভধারণ একটি শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ সময় শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে বলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। এগুলো তেমন উদ্বেগের বিষয় নয়, সহজে সমাধান সম্ভব। তবে অনেক সময় অনেকের ক্ষেত্রে এসব সাধারণ সমস্যাও বেশ কষ্টদায়ক হয় অসচেনতার কারণে। প্রত্যেক গর্ভবতী মা সুস্থ-স্বাভাবিক গর্ভাবস্থা প্রত্যাশা করেন এবং এ সময় কিছু নিয়ম মেনে চললে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়।

গর্ভবতী মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য নিয়মিতভাবে ‘প্রসবপূর্ব যত্ন’ আবশ্যিক। এজন্য পুরো গর্ভাবস্থায় সাত-আটবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যেতে হবে। কিন্তু এটা অনেক সময়ই সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে কমপক্ষে তিনবার যেতেই হবেÑপ্রথম ২০ সপ্তাহের মধ্যে একবার, ৩২ সপ্তাহের সময় একবার এবং ৩৬ সপ্তাহের সময় আর একবার।

গর্ভবতী মায়ের পুরো ঘটনা চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানাতে হবে। ধনুষ্টংকারের টিকা নেওয়া আছে কি না, টিকা না নিয়ে থাকলে নিতে হবে।  শরীরের উচ্চতা অনুযায়ী ওজন ঠিক আছে কি না, রক্তশূন্যতা আছে কি না, উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না, হাতে-পায়ে বা শরীরের অন্যান্য স্থানে পানি এসেছে কি না তা ও পরীক্ষা করে দেখা হয় গর্ভাবস্থায়। এসবই ‘প্রসবপূর্ব যত্ন’-এর আওতায় পড়ে। পূর্ববতী গর্ভাবস্থা বা প্রসবকালীন ইতিহাসও বলতে হবে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে মা হওয়ার ক্ষেত্রে। পূর্ববর্তী ইতিহাস জানা থাকলে সন্তান স্বাভাবিকভাবে প্রসব হবে না কি, অপারেশনের প্রয়োজন পড়বে, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। 

মায়ের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা জরুরি। ডায়াবেটিস আছে কি না, তা আগেভাগেই পরীক্ষা করিয়ে নিলে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। গর্ভের ভ্রƒণ ঠিকমতো বাড়ছে কি না, ভ্রুণের কোনো ত্রুটি আছে কি না ইত্যাদি দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে আল্টাসনোগ্রাফি করাতে হয় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় অবশ্যই বাড়তি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার থাকতে হবে। মায়ের খাবার থেকেই গর্ভের সন্তান খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণ করে। এজন্য গর্ভবতী মায়ের বাড়তি খাবার প্রয়োজন হয়। ভাত ও আমিষের পাশাপাশি গর্ভবতী মাকে পর্যাপ্ত টাকটা শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে নিয়মিত এবং যথেষ্ট পরিমাণ বিশুদ্ধ পানিও পান করতে হবে প্রতিদিন। শাকসবজি ও ফলমূল থেকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণ পাওয়া যায়। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় দুধ ও ডিম থাকলে গর্ভাবস্থায় পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়।  

অনেক সন্তানসম্ভবা ময়েরই গর্ভকালীন কোষ্ঠকাঠিন্য হতে দেখা যায়। কোষ্ঠকাঠিন্য যেন না হয়, সে জন্য খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত আঁশজাতীয় খাবার থাকতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। দৈনিক অন্তত আট গ্লাস পানি পান করা উচিত। আঁশজাতীয় খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। আঁশযুক্ত খাবারের জন্য শাকসবজি, ফলমূল, বীচি জাতীয় খাবার, ডাল, গমের আটা ইত্যাদি খেতে হবে বেশি করে। এছাড়া ইসবগুলের ভুসির শরবত দৈনিক এক গ্লাস খেতে পারলে উপকার পাওয়া যাবে।

একেবারে শুয়ে-বসে থাকাও নয়, আবার দিনভর খাটুনিও নয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এতে গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যাবে। তবে কাপড় কাচা, ভারী জিনিস তোলা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, দ্রুত চলাফেরাসহ ভারী কাজগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। পরিশ্রমের ব্যাপারে প্রথম তিন মাস ও শেষ দুই মাস খুবই সতর্ক থাকতে হবে। উঁচু জুতা গর্ভবতী মায়ের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। তাই উঁচু জুতা ত্যাগ করে ফ্ল্যাট জুতা ব্যবহার করতে হবে। এতে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকবে। পিঠ, কোমর ও পায়ের পেশি ব্যথামুক্ত থাকবে।

দিনে অন্তত ২ ঘণ্টা এবং রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো গর্ভবতী মায়ের জন্য উপকারী। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে চিকিৎকের পরামর্শ নিতে হবে। আরামদায়ক সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান, হালকা ব্যায়াম ও হাঁটাচলা করতে হবে। এতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। গর্ভাবস্থায় ধূমপান গর্ভের সন্তানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ সময় অবশ্যই ধূমপান বর্জন করতে হবে। অন্যের সিগারেটের ধোঁয়াও এড়িয়ে চলতে হবে; কারণ পরোক্ষ ধূমপানেও একই ক্ষতি হয়।

বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা যাবে না। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ভুল ওষুধ গর্ভবতী মা এবং গর্ভের সন্তানের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা যাবে না। গর্ভধারণের শুরু থেকে প্রসব পর্যন্ত একই ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকা ভালো। এতে মা ও গর্ভস্থ শিশুর ইতিহাস ওই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের জানা থাকে; যা পরবর্তী যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ডাক্তারকে সাহায্য করে।

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস দিনের শুরুতে বমি বমি ভাব বা বমি হয়। এই সমস্যা হলে অল্প করে ঘন ঘন খাবার খেতে হবে। সকালে বিস্কুট, টোস্ট জাতীয় শুকনো খাবার খেলে উপকার পাওয়া যায়। গর্ভকালীন এসিডিটির জন্যও সমস্যা হতে পারে। তৈলাক্ত খাবার যতটা সম্ভব কম খেতে হবে। বমি খুব বেশি হলে বা তিন মাসের বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

গর্ভবস্থায় জরায়ু বড় হয় এবং প্রস্রাবের থলি পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হয়। সে কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়, এতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বলে পানি কম খাওয়া উচিত নয় বরং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। সামান্য কাশি হলে কিংবা সামান্য ভারী কিছু ওঠানোর সময় প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার সমস্যা গর্ভাবস্থায় শেষের দিকে বেশি প্রকট হয়। প্রস্রাবের এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো মাংসপেশির ব্যায়াম করলে উপকার পাওয়া যাবে।

সাধারণত গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময় থেকে, বিশেষ করে রাতের বেলায় হাঁটুর নিচে পায়ের পেছনের পেশিতে (কাফ মাসল) খিঁচুনি ও ব্যথা হয়। শোবার আগে কাফ মাসলের ব্যায়াম করলে পেশির খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কা কমে। খিঁচুনি হলে পায়ের আঙুলগুলো হাঁটুর দিকে বাঁকা করে টান টান করে কাফ মাসলের স্ট্রেচিং ব্যায়াম করতে হবে। এতে খিঁচুনি কমবে। এ সময় ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার, বিশেষ করে কচুশাক, দুধজাতীয় খাবার, কলিজা এবং ডিমের কুসুম খেলে উপকার পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরের ওজন বেড়ে যায়। তাছাড়া অস্থিসন্ধির লিগামেন্টগুলোও কিছুটা নরম ও নমনীয় হয়ে পড়ে। এর ফলে পিঠে ও কোমরে ব্যথা হতে পারে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। দাঁড়ানো বা বসার সময় মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে। একটানা বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে না থেকে মাঝে মধ্যে শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে পায়ে কিছু পানি আসতে পারে। তবে অতিরিক্ত পা ফুলে যাওয়া বা পা ফোলার সঙ্গে বেশি রক্তচাপ প্রি-একলামশিয়ার লক্ষণ। এ অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শমতো চিকিৎসা নিতে হবে।

গর্ভকালীন সুস্থতার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন গর্ভবতী মায়ের সঠিক যতœ ও পরিচর্যা এবং সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসা সেবা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ, হাতের নাগালেই। ১৩ হাজার ৮৮২টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার হ্রাসে কাজ করেছে সরকার। কমিউনিটি ক্লিনিকসহ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মা ও শিশুসদন কর্নার সব জায়গায় গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রায় ৩০ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। ৮২ শতাংশের বেশি শিশু টিকাদানের আওতায় এসেছে। গর্ভবতী মায়েরা একটু সচেতন হলে সহজেই এসব জায়গা থেকে সেবা নিতে পারেন। পরিবারের সবার সহযোগিতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে গর্ভকাল হবে নিরাপদ ও আনন্দময়। এ ক্ষেত্রে গর্ভবতী মা এবং পরিবারের সব সদস্যের আন্তরিক সহযোগিতা এবং সচেতনতা এ সময়কে করে সুন্দর, সহনীয় এবং কাক্সিক্ষত।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..