পাঠকের চিঠি মত-বিশ্লেষণ

গাছের চারা রোপণ করে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করি

পাঠকের চিঠি

পৃথিবীর বুকে মনুষ্যকুল বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে অক্সিজেন, যার সবটা জোগান দিয়ে থাকে বৃক্ষ। খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, স্বাস্থ্য ও আসবাবপত্র থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বৃক্ষ আমাদের পরম বন্ধুর মতো সাহায্য করে। এমনকি তার সৌন্দর্যে আমাদের হƒদয় আপ্লুত হয়। বৃক্ষ থেকে ফুল, ফল, ছাল, কাঠ প্রভৃতি সরবরাহ করে আমরা প্রতিনিয়ত পূরণ করি নানা চাহিদা। অর্থাৎ বাসস্থান থেকে শুরু করে ওষুধ তৈরি এবং অক্সিজেন সরবরাহ পর্যন্ত বৃক্ষের অবদান আমাদের জীবনে অতুলনীয়, অনস্বীকার্য। পৃথিবীর বুকে বৃক্ষ পরিবেশকে দেয় মনোরমা রঙিন চিত্র, আর জীববৈচিত্র্য স্থাপন করে বেঁচে থাকার ভারসাম্যযুক্ত অবস্থা।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সবুজ-শ্যামল পৃথিবীর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পৃথিবীর বাতাস হয়ে উঠেছে ভারী এবং প্রাণীর জীবনকে তা করে তুলছে দুর্বিষহ। ফলে নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা এ সুন্দর ভুবনকে রক্ষা করার লক্ষ্যে প্রাণিজগতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে একটি সুন্দর পথ আবিষ্কার করেছেন, আর তা হলো ‘বৃক্ষরোপণ’।

বেশি গাছ লাগানোর মাধ্যমে আমরা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে পারি, কেননা বৃক্ষ মায়ের মতো আঁঁচল দিয়ে আগলে রাখে প্রাকৃতিক পরিবেশকে। বৃক্ষ কখনও দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক সৃষ্ট সমস্যার কবল থেকে পরিবেশকে রক্ষা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না, যার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখতে পেয়েছি সিডর, আইলা, বুলবুল ও পরিশেষে আমপান ঘূর্ণিঝড়ের সময় সুন্দরবনের বৃক্ষের বুকপাতা সংগ্রামের দৃশ্য। যুগযুগ ধরে বৃক্ষ খড়া, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, সাইক্লোন  প্রভৃতি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করে আসছে।

দুঃখের বিষয়, আমরা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেই প্রয়োজন সাপেক্ষে নির্বিচারে উজাড় করছি বন। শুধু উজারই করছি না, বৃক্ষ রোপণে অনাগ্রহী হয়ে উঠছি। কাটার অনুপাতে লাগাচ্ছি না সে পরিমাণ গাছ। কিন্তু বন উজার করে বাসস্থান স্থাপন নিশ্চিত করা হলেও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক বন্য প্রজাতি (গণ্ডার, মাউস হরিণ, বন্য গরু-মহিষ)। আসলে এভাবে যদি এ প্রবণতা চলতে থাকে, তাহলে দেখা যাবে অদূর ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে আর পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে আরও অনেক প্রজাতি। আর তখনই মানুষকে জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে বারবার হিমশিম খেতে হবে। তাই এখনই উপযুক্ত সময় একটি গাছ কাটলে তিনটি গাছ (বনজ, ফলদ ও ভেষজ) রোপণ করি।

একটি দেশের সুস্থ পরিবেশ ও ভারসাম্যযুক্ত জীববৈচিত্র্য সুনিশ্চিতে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে আছে মাত্র ১৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ। এটাও বর্তমানে কমে গেছে, কেননা চার হাজার একর জমির বনভূমি কেটে সৃষ্টি করা হয়েছে রোহিঙ্গা বাসস্থান। তাই আমাদের দেশে সম্প্রতি ঘনঘন ঘটছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমনÑনদীভাঙন, খড়া, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা প্রভৃতি। তাছাড়া আমরা আরও জানি, ঢাকা বায়ুদূষণে বিশ্বে দ্বিতীয় শহর, ঢাকার চারদিকে শুধু কংক্রিট আর ইটপাটকেলের দেয়াল, খোলা জায়গার দুষ্প্রাপ্যতায় পর্যাপ্ত বৃক্ষের দেখা কল্পনাতীত। ফলে সেখানে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর দিন দিন বেড়েই চলছে ঢাকার তাপমাত্রা, যার ফলে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে প্রিয় রাজধানী। এসব সমস্যার পেছনে একটাই কারণ, তা হলো ভূপৃষ্ঠে পর্যাপ্ত বৃক্ষের অভাব।      

আমাদের দেশে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত, অর্থাৎ তিন মাস (আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র) বৃক্ষরোপণের উপযুক্ত সময়। বর্তমানে যেহেতু বাংলা সনের আষাঢ় মাস চলছে, তাই বৃক্ষপ্রেমীদের জন্য চলে এসেছে গাছ লাগানোর শ্রেষ্ঠ সময়। গ্রামীণ পরিবেশে আমরা অহরহ খালি জায়গা পাই; পুকুর পাড়, বাড়ির পাশ, পরিত্যক্ত ভূমি, স্কুল মাঠের পাশ, সড়কের পাশ প্রভৃতি। তাই সেসব জায়গায় আমরা এই বর্ষা মৌসুমে গাছ লাগনোর দায়িত্ব হাতে নিই, আর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে অগ্রসর হই এবং নিজেদের বেঁচে থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করি।

শহরে যেহেতু জায়গা সংকট রয়েছে, তাই আমরা ছাদে কিংবা ঘরের পাশেই টবের ভেতর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিতে পারি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ‘ইনডোর  প্লান্ট’-এর কাজ করা যায়। গবেষণায় জানা গেছে, ছাদে বাগান থাকলে ঘরের তাপমাত্রা এক দশমিক ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। উপরন্তু ছাদে বৃক্ষরোপণ করলে আমরা এই দূষিত শহরে কিছুটা বেশি অক্সিজেন পেতে পারি। তাই ছাদে টবের ভেতর ছোটো ছোটো ফুলফলের গাছ লাগিয়ে আমরা আমাদের বেঁচে থাকার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি।

আমরা যদি এ মৌসুমে তিনটি করে গাছ লাগাই, তাহলে দেখা যাবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মাঝে একটা ব্যালান্স স্থাপন করতে সক্ষম হব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারব বেঁচে থাকার উপযুক্ত পরিবেশ। তাই আমাদের উচিত একটি গাছ কাটলে কম করে হলেও তিনটি গাছ লাগানো। বনায়নে আগ্রহী হলে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা অসম্ভব নয়।

জসীম উদ্দিন

শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..