‘গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কখনোই নিরাপদ হয় না’

ইউনাইটেড সিকিউরিটিজের পরিচালক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাজীব আল মামুন। প্রতিষ্ঠানের বড় দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি পুঁজিবাজার বিশ্লেষক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। সম্প্রতি পুঁজিবাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপট, অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয় শেয়ার বিজের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জুবাইয়া ঝুমা। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

শেয়ার বিজ: অনেক চড়াইউতরাই পেরিয়ে বর্তমানে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে এর মধ্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখবেন?

রাজীব আল মামুন: বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজার অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এখানে অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। তবে এর মধ্যে বড় ভীতি হচ্ছে গুজব। এখানে অনেক রয়েছে গুজব। বিনিয়োগকারীদের একটা বিষয় সবসময় মাথায় রাখতে হবে যে, গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কখনোই নিরাপদ হয় না। এজন্য বিনিয়োগকারীদের উচিত হবে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করা। যে কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে কিংবা কোনো খবর ছড়িয়ে পড়লে সেটা যাচাই না করে বিনিয়োগ করা ঠিক নয়। তবে অতীতের তুলনায় এখন বিনিয়োগকারীরাও অনেক সচেতন। বিশেষ করে পুঁজিবাজারের কারসাজি রোধে এখন তারা সবাই সোচ্চার। এমনকি এখানে ব্রোকার, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীÑসবাই কারসাজি রোধে বেশ সোচ্চার। পুঁজিবাজারে কারসাজি ঠেকাতে সরকার তথা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও গত কয়েক বছরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে এখন বাজার স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজার এখন চাঙা সাধারণ মানুষের ধারণা ব্যাংক সুদের হার কম, তাই মানুষ মার্কেটে অনায়াসে আসছে বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

রাজীব আল মামুন: পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নতুন নতুন কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এছাড়া কিছু ভালো কোম্পানি বাজারে এসেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহী হচ্ছেন। এ কারণেই বাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এর আগেও পলিসি লেবেলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এবার দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন এসেছে, যেগুলো বিনিয়োগকারীদের মাঝে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এনেছে। বাজেটে এ-সংক্রান্ত অনেক ভালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে ওভারঅল বাজারে বেশিসংখ্যক বিনিয়োগকারী আসছেন।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে ৫০টির বেশি কোম্পানির শেয়ার ভালো লেনদেন হয় কিন্তু একশ বেশি কোম্পানির তেমন কোনো লেনদেন নেই বিনিয়োগকারীরা বলছেন, মার্কেটে কিছু (বিশেষ শেয়ার) নিয়ে কারসাজি হচ্ছে তাদের অভিযোগ কতটা সত্য, বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

রাজীব আল মামুন: দেখুন, এখানে আমাদের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে বলতে পারি বিনিয়োগকারীরা যে রকম বাজার চান, সেটার পরিবেশ তো কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে। তবে হ্যাঁ পুঁজিবাজারের কারসাজি রোধে এখন সবাই সোচ্চার। আমরাও অবশ্যই কারসাজিকে ডিপ্রিশিয়েট করি। তবে পুঁজিবাজারে কিছু খারাপ কিছু ভালো তো থাকবেই।

শেয়ার বিজ: কারসাজি রোধে করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

রাজীব আল মামুন: কারসাজি বন্ধ করার জন্য স্টেকহোল্ডার যারা আছেন, যেমন বিনিয়োগকারী, ব্রোকারেজ হাউস, নিয়ন্ত্রণকারী তাদের সবার মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া জরুরি। এর জন্য সবার একটা ইতিবাচক মনোভাব থাকা প্রয়োজন। তবে বর্তমান কমিশন আমার মনে হয় না এর বাইরে কোনো কাজ করে। কারসাজির কোনো বিষয় থাকলে বিএসইসি অবশ্যই সেদিকে নজর রাখবে। বাজারটা তো এক দিনের জন্য নয়। এজন্য সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। যেসব ভালো কোম্পানির শেয়ার রয়েছে, সেগুলোয় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ইচ্ছাই বেশি বলে আমি মনে করি। এছাড়া রুগ্ণ কোম্পানিগুলোয় কিন্তু পর্যবেক্ষণ বসানো হচ্ছে, এগুলোও কিন্তু কারসাজি রোধে কার্যকর উদ্যোগ বলে আমি মনে করি।

শেয়ার বিজ: গত কয়েক বছরে অনেকগুলো নতুন কোম্পানি বাজারে এসেছে কিন্তু রবি ছাড়া সে রকম উল্লেখ করার মতো ভালো কোম্পানি নেই ভালো কোম্পানিগুলো কেন বাজারে আসছে না যেমন ইউনিলিভার, বাংলালিংকÑএসব কোম্পানি কেন আসছে না

রাজীব আল মামুন: এগুলো কিন্তু বেশ কমন প্রশ্ন। এই ধরুন ইউনিলিভার। এটা একটা গ্লোবালি কোম্পানি, বাংলাদেশে মার্জার হয়েছে। ভারতে ইউনিলিভার লিস্টেড, কিন্তু আমাদের এখানে লিস্টেড নয়। এটার জন্য আমার মনে হয় যে, রেগুলেটরদের উচিত হবে উৎসাহ দেয়া; বাজারে আসলে কী ধরনের সুবিধা থাকবে, সেগুলো তাদের বোঝানো। যেহেতু এটা একটা গ্লোবাল কোম্পানি, সেহেতু গ্লোবালি তারাও তো তাদের একটা আউটলাইন ও পলিসি নিয়ে চলে। তাদের পলিসিতে পরিবর্তন আনার জন্য আমাদের করণীয় আছে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পিএসআই ডিএসইতে ঘোষণার আগেই বিনিয়োগকারীরা জেনে যা্েচ্ছÑএটা কীভাবে হচ্ছে, কেন হচ্ছে? এখানে কারও দায়িত্বে অবহেলা আছে কি না?

রাজীব আল মামুন: এখানে কারও দায়িত্বে অবহেলা আছে কি না, সেটা আমি জানি না। তবে আমি মনে করি এ ধরনের তথ্য বিএসইসির মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীদের জানার কথা। আর বিএসইসিরও এগুলোর জানানোর দায়িত্ব। একটা বিষয় এখানে ৩০০-৩৫০ লিস্টেড কোম্পানি, তাদের যাদের গ্রোথ ভালো, তাদের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের যোগাযোগ থাকে। এভাবে বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকেও তারা এ রকম তথ্যের কাছাকাছি আইডিয়া নিতে পারে। আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম পরিবর্তন আসে। তখনও বোঝা যায় কোন কোম্পানির গ্রোথ বাড়ছে, কেন বাড়ছে।

শেয়ার বিজ: বাজার রিলেটেড যে কোনো তথ্য ফাঁসের ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

রাজীব আল মামুন: দেখুন এখানে কিছু গুজব থাকে। আর গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কখনোই নিরাপদ হয় না। এজন্য আমরা যারা ব্রোকারেজ আছি, আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমনকি বিনিয়োগকারীরা যারা আছি, তাদের কারোরই গুজবকে পাত্তা দেয়া ঠিক নয়। স্টক মার্কেটে অবশ্যই কিছু ঝুঁকি তো থাকবেই। তখন যদি কেউ গুজবকে পুঁজি করে বিনিয়োগ বা ব্যবসা করে থাকে, সেটা তো অবশ্যই ঝুঁকি। এটার জন্য পলিসি লেভেলে অনেক কাজও হচ্ছে।

শেয়ার বিজ: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

রাজীব আল মামুন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বশেষ..