দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

গুজবে পড়ছে মৌলভিত্তি কোম্পানির শেয়ারদর!

শেখ আবু তালেব: কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন বিনিয়োগকারীরা। এর বাইরে কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনাকে দেখেই তার প্রতি আকৃষ্ট হন অনেকে। কিন্তু বর্তমান পুঁজিবাজারে এসব তথ্য বিশ্লেষণ কোনো কাজে লাগছে না বিনিয়োগকারীদের। অতীতের অভিজ্ঞতায় মৌলভিত্তির কোম্পানিতেও বিনিয়োগ করে শেয়ারদরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এজন্য তারা দায়ী করছেন, গুজব ও অসৎ বিনিয়োগকারীদের কারসাজিকে।

জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরেই সূচকের পতন হচ্ছে। ৭ নভেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও তা স্থায়ী হয়নি। পরের সপ্তাহেই আগের ধারায় ফিরেছে। সূচকের এই পতন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। ডিএসইর প্রধান সূচক চার হাজার ৭০০ থেকে ৮০০ পয়েন্টেই স্থির থাকছে।

মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর পতন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান বাজার চিত্র দেখে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের বড় বিনিয়োগকারীরা। এমন চিত্রকে স্বাভাবিক বলতে নারাজ পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা।

মৌলভিত্তির একটি উল্লেখযোগ্য কোম্পানি হচ্ছে টেলিকম খাতের গ্রামীণফোন। গত বছরের এপ্রিল মাস থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারদরে পতন হচ্ছে। ৪৯৬ টাকার শেয়ারটি গত এপ্রিলে এসে লেনদেন হয়েছে ৪১৭ টাকায়। শেয়ারটির দরপতন এখনও অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ শেয়ারটি লেনদেন হয়েছে ৩০৬ টাকা দরে। শুধু গত ৯ মাসে শেয়ারটি দর হারিয়েছে ৮৩ টাকা।

পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির ১৩৫ কোটির বেশি শেয়ার রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধনের প্রায় সোয়া এক শতাংশ হচ্ছে কোম্পানিটির। কোম্পানিটির শেয়ারদর পতনে ডিএসইর বাজার মূলধন কমছে আনুপাতিক হারে। এদিকে শেয়ারদর কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। উচ্চদরে শেয়ারটির ক্রেতারা এখন লোকসান গুনছেন।

এছাড়া গত ৯ মাসে জিপিএইচ ইস্পাতের শেয়ারপ্রতি দর ৩৭ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ টাকায়। পুঁজিবাজারে সদ্য তালিকাভুক্ত রানার অটোমোবাইলসের শেয়ারদর গত পাঁচ মাসে ১১১ টাকা থেকে নেমেছে ৫৮ টাকায়, ব্যাংক খাতের ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর গত ৯ মাসে কমেছে সাত টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকের ১৯ টাকা ও ইস্টার্ন ব্যাংকের সাত টাকা।

এছাড়া বেসরকারি খাতের লাভজনক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সামিট পাওয়ারের শেয়ারদর কমেছে পাঁচ টাকা ও শাহজিবাজার পাওয়ারের শেয়ারপ্রতি দর কমেছে ২১ টাকা। একই অবস্থা মৌলভিত্তির অন্যান্য খাতের শেয়ারদরেও।

অব্যাহত শেয়ারদর পতনের বিষয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারে আগের কোনো অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে না। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। যারা শেয়ার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তারা মুনাফা গুনতে পারছে। মৌলভিত্তির শেয়ারেও যখন সপ্তাহ শেষে লোকসান গুনতে হয়, তখন বলা যায়, বাজারে কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। এভাবে চলতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা বাজারে থাকবে না। এই বাজার বিনিয়োগকারীবান্ধব হচ্ছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের প্রতি আস্থা রাখছেন না তারা। বাজারে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। প্রতিনিয়তই আস্থা হারাচ্ছেন সবাই। অথচ বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখাটাই নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মূল কাজ। আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে বাজার উত্থান-পতন এত দ্রুত হবে না। আস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে আগে। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জবাবদিহিতামূলক ও স্বচালিত ভূমিকায় নামতে হবে। তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে দেশের পুঁজিবাজার।

সূত্র জানিয়েছে, বাজার পরিচালনায় ডিএসই এখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ফলে সহজেই শেয়ার লেনদেনের তথ্য ও লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত তা বের করা সম্ভব। কোন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান থেকে এসব শেয়ার লেনদেন হচ্ছে, তা বের করা সময়সাপেক্ষ নয়। কারা অনিয়মতান্ত্রিক লেনদেন করছেন, তাদের খুঁজে বের করা দরকার। যদিও তা হচ্ছে না যথাসময়ে।

অনেকে বলছেন, বর্তমানে উল্টোপথে হাঁটছে আমাদের বাজার, যা বিদেশিদের মাঝেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক মাসে বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়েছেন তারা। বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতা দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মনে সংশয়ের জš§ দেয়। ফলে দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। এটি সুষ্ঠু বাজারের লক্ষণ নয়। বর্তমান চিত্র পুঁজিবাজারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। বর্তমানে তাই হচ্ছে। অনেক কিছুই আমরা পরিচালক হয়েও জানতে পারছি না। পুঁজিবাজার স্পর্শকাতর জায়গা হওয়ায় সবকিছুতেই স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..