দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

গুজবে ৩০ টাকার লবণ ১৫০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক : পেঁয়াজের পর চালের দাম বৃদ্ধির মধ্যেই লবণের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা ছড়িয়েছে। যদিও সে গুজবে কাউকে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সরকার বলেছে, দেশের চাহিদার ছয়গুণ বেশি লবণ মজুত আছে। লবণের দাম বেড়ে যাচ্ছে বলে গত সোমবার সন্ধ্যার পর সিলেট, হবিগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নেত্রকোনা জেলায় গুজব ছড়ায় এবং তাতে লবণ কেনার হিড়িক শুরু হওয়ায় দাম বেড়ে যায়। পরে রাজধানীসহ সারা দেশে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে।

গতকাল বিকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের দোকানগুলোয় লবণ কিনতে প্রচুর মানুষের ভিড় দেখা যায়। কেউ দুই কেজি, কেউ পাঁচ কেজি লবণ কিনছিলেন। এমনকি বন্ধ দোকান খুলেও অনেক বিক্রেতা লবণ বিক্রি করেন। কারণ, কারওয়ান বাজারে গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল।

যদিও বিক্রেতারা প্যাকেটের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অনুযায়ী ৩৫ টাকা দরে লবণ বিক্রি করছিলেন। সকালে রাজধানীর কাজীপাড়া, আগারগাঁও, তেজগাঁও ও বেগুনবাড়ি এলাকার বাজার এবং মুদি দোকানেও লবণ কিনতে ক্রেতাদের বাড়তি ভিড় দেখা যায়।

মিরপুর ১৪-এর মাহিন জেনারেল স্টোরের মালিক মো. জাকারিয়া বলেন, তিনি বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পাঁচ বস্তা (প্রতি বস্তায় ২৫ কেজি করে) লবণ বিক্রি করেছেন। তার দোকানে প্রতি কেজি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি প্রতি কেজি লবণ সাড়ে ২৬ টাকায় কিনেছেন এবং সব সময় এমআরপির চেয়ে কম দামে বিক্রি করেন।

উত্তরা ১২ ও ১৩ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, বেশ কিছু বিক্রেতা বলেছেন লবণ নেই। সব বিক্রি হয়ে গেছে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, জেলার খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম বলেন, গুজব ছড়ানোর পর চরাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষ হুড়োহুড়ি করে লবণ কিনতে ভিড় জমায় বিভিন্ন দোকানে। কেউ পাঁচ কেজি, কেউ ২০ কেজি লবণও কিনেছিলেন।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, লবণের কেজি ২০০ টাকা হয়ে গেছে। এতে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ায় মঙ্গলবার দুপুরের আগে ডিলার ও অনেক পাইকারি ব্যবসায়ীর গুদাম শূন্য হয়ে যায়।

পাইকারি ব্যবসায়ী গনেশ সাহা বলেন, ‘সকাল থেকেই আমাদের দোকানে লবণ কিনতে সাধারণ মানুষ ও খুচরা বিক্রেতারা ভিড় করেন। দুপুর ১২টার মধ্যে সব লবণ বিক্রি হয়ে যায়।’

কোটালীপাড়ায় লবণ কিনতে আসা এক ভ্যানচালক বলেন, ‘গতকাল রাতে ঢাকা থেকে আমার এক আত্মীয় ফোন করে বলেছেন, লবণের কেজি ২০০ টাকা হবে।’

এ অবস্থায় খুচরা বিক্রেতাদের একজনের কাছে এক-দুই কেজির বেশি লবণ বিক্রি করতে মানা করা হয়েছে বলে জানান কোটালীপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহসিন উদ্দিন।

ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, কিছুদিন আগে একটি মহল সিন্ডিকেট তৈরি করে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি করেছিল। এখন তারাই আবার লবণের দাম বৃদ্ধির জন্য গুজব ছড়াচ্ছে।

এদিকে লবণের ঘাটতি নেই জানিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে সাড়ে ছয় লাখ মেট্রিক টনের বেশি ভোজ্যলবণ মজুত রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণচাষির কাছে চার লাখ পাঁচ হাজার টন এবং বিভিন্ন লবণ মিলের গুদামে দুই লাখ ৪৫ হাজার টন লবণ মজুত রয়েছে।

এছাড়া সারা দেশে বিভিন্ন লবণ কোম্পানির ডিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ মজুত রয়েছে। পাশাপাশি চলতি নভেম্বর থেকে লবণ উৎপাদনের মৌসুম শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে উৎপাদিত নতুন লবণও বাজারে আসতে শুরু করেছে।

দেশে প্রতি মাসে ভোজ্যলবণের চাহিদা কম-বেশি এক লাখ টন। অন্যদিকে, লবণের মজুত আছে সাড়ে ছয় লাখ টন। সে হিসেবে লবণের কোনো ধরনের ঘাটতি বা সংকট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, একটি স্বার্থান্বেষী মহল লবণের সংকট রয়েছে মর্মে গুজব রটনা করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় দাম অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

লবণ-সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকির জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রধান কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এর নম্বর হচ্ছে ০২-৯৫৭৩৫০৫ (ল্যান্ডফোন), ০১৭১৫২২৩৯৪৯ (সেলফোন)। লবণ-সংক্রান্ত যে কোনো তথ্যের প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করেছে মন্ত্রণালয়।

এদিকে গুজব ছড়িয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় নেত্রকোনায় তিন ব্যবসায়ীর অর্থদণ্ড হয়েছে। হবিগঞ্জে সাজা দেওয়া হয়েছে চারজনকে। ঠাকুরগাঁও ও গোপালগঞ্জে দুজনকে আটক করা হয়েছে। এসব স্থানে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ ব্যাপক হারে লবণ কিনতে শুরু করলে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়; এক পর্যায়ে অধিকাংশ দোকানে লবণের মজুত ফুরিয়ে যায়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..