সুশিক্ষা

গুরু, শিষ্য ও অভিভাবকের বিদ্যাগুরু

আমাদের চিন্তা যখন কোনো বিষয়ের একটি পর্যায়ে থেমে যায়, তখন তা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। চিন্তাকে নতুন করে আবর্তিত করতে হয়। সেখানে শুরু হয় নব উদ্যম। শুরু হয় নতুন করে পথচলা। এভাবে উদ্যম পরিণত হয় উদ্যোগে। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় নতুন উদ্যোক্তা। নতুনরা ধীরে ধীরে জয় করে নেয় পুরোনোদের স্থান। উন্নত হতে থাকে পৃথিবী নামক গ্রহটি। এখান থেকে প্রাচীনরা হারিয়ে যায় না, বরং স্থান করে নেয় ইতিহাসের পাতায়। সেই ইতিহাসের পাতা হয়ে ওঠে নবীনদের এগিয়ে চলার শক্তি। বৌদ্ধবিহারের জ্ঞানচর্চা যখন জগদ্বিখ্যাত, তখন সুদূর গ্রিস ও চীন থেকেও হিউয়েন সাং ও ফাহিয়েনের মতো পরিব্রাজকেরা অতীশ দীপঙ্করের মতো বিজ্ঞ গুরুদের কাছে দীক্ষা নিতে আসতেন। ইতিহাসের এ ধারা থেকেই শিক্ষার জন্য গুরু-শিষ্যের একে অপরের কাছে আসা এক পুণ্যের কাজে রূপায়িত হয়। ইতিহাসের সে ঘটনার ডিজিটাল পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছে ‘বিদ্যাগুরু’। এখানে বিদ্যার্থীরা খুঁজে নেবেন তাদের কাক্সিক্ষত গুরু-শিষ্য। অভিভাবকেরা পাবেন নিশ্চিত স্বস্তি। বিদ্যাগুরু এমনই একটি ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হতে যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকদেরও দুশ্চিন্তার দিন ফুরাবে।
গুরু-শিষ্যের বর্তমান ধারা: আবির সাজদার রাজধানীর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তিনি এ মহানগরীতে এসে পড়ালেখা করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এখানে গ্রামের মতো পরিশ্রমলব্ধ কাজ পান না। কাজেই তাকে টিউশনির জন্য চেষ্টা-তদবির করতে বড় ভাইদের কাছে অনেক দিন ধরনা দিতে হয়েছে। অবশেষে বহুল কাক্সিক্ষত একটি টিউশনি যদিওবা পেয়েছেন, ক্যাম্পাস থেকে তার দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। রাজধানীর জ্যাম অতিক্রম করে ছাত্রের কাছ যাওয়া-আসা করতেই তার তিন ঘণ্টার মতো মহামূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এরপর দুই ঘণ্টা বিদ্যাচর্চা। এভাবেই মাসব্যাপী চললেও মাসের শেষে কাক্সিক্ষত সম্মানী পান না, পেলেও নির্ধারিত সময় থেকে অনেক দেরি হয়ে যায়। এছাড়া অনেক জায়গায় টিউশনি খুঁজতে গেলে একই সঙ্গে নিজের সাবজেক্ট, সম্মানী, অভিভাবকের চাওয়া-পাওয়া সব মিলিয়ে আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। অন্যদিকে ক্যাম্পাস ছুটি হয়ে গেলেও নির্জনে দিনাতিপাত করতে হয় শুধু একটি টিউশনির কারণে। এসব চলমান সমস্যার যুগোপযোগী অসাধারণ সমাধান নিয়ে আসছে বিদ্যাগুরু। এর মাধ্যমে চাইলেই দেশের একস্থান থেকে অন্যস্থানে সরাসরি অনলাইনে পড়ানো সম্ভব হবে।
অভিভাবক ও শিষ্যের চাওয়া-পাওয়া: শহরে বাবা-মা সন্তানের জন্য চাহিদামতো শিক্ষক পেলেও মানসম্মত পাঠদান, নিয়মানুবর্তিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান থাকেন। অন্যদিকে গ্রামের প্রেক্ষাপটে ভালো মানের শিক্ষক পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন। কারণ এখানে মানসম্মত প্রাইভেট টিউটর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শহরের বর্তমান পরিবেশে অভিভাবকেরা একজন অচেনা আগন্তুককে নিজের সন্তানের দায়িত্ব দিতে অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অন্যদিকে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কিংবা বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পরামর্শ ও সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হন।
বিদ্যাগুরুর বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রম: বিদ্যাগুরুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অঞ্চলভিত্তিক নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত থাকবে। এ সময় শিক্ষক তার পছন্দমতো শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবক তার চাহিদা মোতাবেক শিক্ষক খুব সহজে খুঁজে নিতে পারবেন। সম্মানী লেনদেনের নিরাপত্তার জিম্মায় থাকবে বিদ্যাগুরু ওয়েব কর্তৃপক্ষ। নির্দিষ্ট পন্থায় তা জমা অথবা উত্তোলন করা যাবে। থাকবে না কোনো ধরনের অবাঞ্ছিত ঝুটঝামেলা। এছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা, পেশাগত দক্ষতা, প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর প্রস্তুতির সুবিধা, যা মান্ধাতা আমলের টিউশনি ব্যবস্থায় কল্পনা করা যায় না।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী আছেন, যারা টিউশনি করেন, কিন্তু তাদের থাকে না কোনো ধরনের অফিশিয়াল অভিজ্ঞতার সনদ। ফলে চাকরির আবেদনের সময় অনেকেই পড়েন বিড়ম্বনায়। বিদ্যাগুরু এর সুন্দর একটি সমাধানের ব্যবস্থা করেছে। অন্যদিকে অভিভাবক ও শিষ্যরা পাচ্ছেন দেশের সব খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যয়নরত শিক্ষককে। শিক্ষকদের গ্রেডিং করার ফলে একজন শিক্ষকের যোগ্যতা, নৈতিক চরিত্র, আচার-আচরণ, কমিটমেন্ট সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হবে। ফলে অভিভাবকদের সংকটের জায়গাটি আর থাকবে না।
প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মো. রিয়াজুল করিম। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ২০০৯ সাল থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষা নিয়ে কাজ করছেন। ২০০৯ সালে সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। তিনি ২০১৬-১৭ সালে ওয়ার্ল্ড লিটারেসি ফাউন্ডেশনের অ্যাম্বাসেডরের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ছুটে বেড়ান শহরের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তিনি ২০১৭ সালে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের সহায়তায় একটি স্টাডিও করেন। এতে অংশ নেয় শিক্ষার্থীদের একটি দল। ২০১৩ সাল থেকে এডুকেশন পার্লামেন্ট নিয়ে কাজ করেন। এ তরুণ ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডিউক অব এডিনবার্গ গোল্ড অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন।
বিদ্যাগুরু সম্পর্কে মো. রিয়াজুল করিম বলেন, মফস্বল থেকে বেড়ে উঠেছি, যেখানে ছিল না কোনো ইন্টারনেট কিংবা আদর্শিক মানের শিক্ষক। বর্তমান সরকারের সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টায় ইন্টারনেট সুবিধা অনেক সহজবোধ্য হওয়ায় সবার বোধগম্য হয়েছে যে, শেখার মাধ্যম এখন শুধু বিদ্যালয় আর বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একপক্ষীয় শিক্ষা অনেকাংশে কোনো কাজে আসে না। সেটা মুখস্থ বিদ্যার মতো অর্থহীন। বিদ্যাগুরু এমন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সব বিষয় সম্পর্কে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাছ থেকে মানসম্মত শিক্ষা লাভ করতে পারবে। অডিও, ভিডিও ও অত্যাধুনিক ডিজিটাল বোর্ডের মাধ্যমে পাঠদান প্রক্রিয়ায় কখনোই মনে হবে না শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আসলে অনলাইনে দূরে বসে পাঠ কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বাধীন শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। ভবিষ্যতে মানসম্পন্ন আধুনিক চিন্তার ফসল হিসেবে শহর ও গ্রামে বিদ্যাগুরু শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলব, যা শিক্ষার্থীদের নিজের ইচ্ছামতো শেখার সুযোগ করে দেবে। শিক্ষার্থীরা কাজ করবে নবসৃষ্টির লক্ষ্যে, ‘এ’ প্লাসের প্রত্যাশায় নয়। বিদ্যাগুরু ব্যবহার এতটাই সহজ যে, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীও অনায়াসেই তা ব্যবহার করতে পারবে। এর নতুন আপডেট ও ফিচার নিয়ে কাজ করছেন তিনি। প্রত্যাশা নতুন ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ‘পাঠাও’ কিংবা ‘টেন মিনিটস স্কুল’ ইতোমধ্যে যে অবদান রেখেছে, তার চেয়ে বিদ্যাগুরুর অবদান কোনো অংশে কম হবে বলে মনে হয় না। বিদ্যাগুরু হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতের প্রকৃত স্বাধীন ও পার্সোনালাইজড শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে প্রাথমিকভাবে এক লাখ শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীসহ শিক্ষিত গৃহিণীদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
সর্বোপরি বলা যায়, বিদ্যাগুরু এমন একটি মাধ্যম হতে যাচ্ছে, যেখানে আবিরের মতো কাউকে একটি টিউশনির জন্য কোনো ধরনের বিচ্ছেদ ও বিড়ম্বনা সইতে হবে না।

বেলাল হোসেন

সর্বশেষ..