Print Date & Time : 6 December 2020 Sunday 3:50 am

গৃহকর্মী নির্যাতন রোধে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১৫’-এর বাস্তবায়ন দরকার

প্রকাশ: September 18, 2020 সময়- 12:19 am

গাজী শরিফুল হাসান: বরিশালে একটি ফ্ল্যাট বাসায় খুন্তির ছ্যাঁকা ও লোহার রড দিয়ে ১৩ বছর বয়সি আশা নামের এক শিশু গৃহপরিচারিকাকে নির্মমভাবে পেটানো হয়। পুলিশ খবর পেয়ে নির্যাতনের শিকার ওই শিশু গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে ফ্ল্যাটের মালিক বুলবুলি খাতুনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামি পলাতক রয়েছে। শিশু আশার অভিযোগ একটা কাজ শেষ হওয়ার আগেই নতুন আরেকটা কাজ করতে বলা হতো, কাজে একটু দেরি হলেই বুলবুলি খাতুন গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছ্যাঁকা দিত এবং ছোট-খাটো ত্রুটি হলেই লোহার রড দিয়ে পেটাত। চিৎকার করলে গলা টিপে ধরত। বাইরে বের হতে দিত না। মারধরের কারণে ক্ষত হওয়া স্থানে লবণ-মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দিত। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও চালায় সে।

দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গৃহকর্মে নিযুক্ত। নানা ধরনের কারণে গৃহকর্ম শ্রম হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। গৃহকর্মে নিযুক্তরা মর্যাদা, মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে গৃহকর্মে নিযুক্ত বিশাল এ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও কল্যাণের স্বার্থে গৃহকর্মকে শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রদান, গৃহকর্মীদের জন্য উপযুক্ত কাজ ও নিরাপদ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্রাম, বিনোদন, ছুটিসহ সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে সরকার ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১৫’ প্রণয়ন করেছে।

গৃহকর্ম বলতে রান্না ও রান্নাসংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক কাজে সহায়তা, গৃহ বা গৃহের আঙিনা বা চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, পোশাক-পরিচ্ছদ ধোয়া, গৃহে বসবাসরত শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ, কিংবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির যতœ নেওয়া প্রভৃতি কাজ গৃহকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে নিয়োগকারীর ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত বা মুনাফা সৃষ্টি করে এমন কাজ গৃহকর্ম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে না। গৃহকর্মী বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝাবে, যে নিয়োগকারীর গৃহে মৌখিক বা লিখিতভাবে খণ্ডকালীন অথবা পূর্ণকালীন নিয়োগের ভিত্তিতে গৃহকর্ম সম্পাদন করে। এ ক্ষেত্রে মেস বা ডরমিটরিও গৃহ হিসেবে বিবেচিত হবে।

দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চল সর্বত্রই গৃহকর্মীদের কর্মক্ষেত্রের বিস্তৃতি রয়েছে। এ ব্যাপক পরিসরে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিভিন্ন শ্রেণিভুক্ত নিয়োগকারীর গৃহে কর্মরত গৃহকর্মীর জন্য কাজ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১৫’-এর কিছু বিষয় প্রতিপালন করা প্রয়োজন।

মজুরি নির্ধারণ ও পরিশোধ: উভয় পক্ষের আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারিত হওয়া উচিত। পূর্ণকালীন গৃহকর্মীর মজুরি যাতে গৃহকর্মীর পরিবারসহ সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের উপযোগী হয়, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করবে। গৃহকর্মীর ভরণপোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছদ প্রদান করা হলে তা মজুরির অতিরিক্ত বলে গণ্য হবে। নিয়োগকারী গৃহকর্মীকে প্রতি মাসের মজুরি পরবর্তী মাসের ৭ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

গৃহকর্মী নিয়োগের চুক্তি: ১৪ বছর পূর্ণ করেছে তবে ১৮ বছরের কম এরূপ বয়সে গৃহকর্মে নিয়োজিত কিশোর বা কিশোরী কিংবা হালকা কাজের ক্ষেত্রে ১২ বছর বয়ঃপ্রাপ্ত শিশু নিয়োগ করতে হলে অভিভাবকের সঙ্গে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিয়োগলাভে ইচ্ছুক ব্যক্তির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে নিয়োগ প্রদান যুক্তিযুক্ত। তবে মৌখিক চুক্তি, সমঝোতা বা ঐকমত্য হলে তা গৃহকর্মী ও নিয়োগকারীর কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। নিয়োগের ধরন, নিয়োগের তারিখ, মজুরি, বিশ্রামের সময় ও ছুটি, কাজের ধরন, গৃহকর্মীর থাকা-খাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ ও গৃহকর্মীর বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। নিয়োগপত্র কিংবা চুক্তি বা সমঝোতা বা ঐকমত্যে উল্লিখিত শর্তগুলো উভয় পক্ষ মেনে চলতে বাধ্য থাকবে, তবে লক্ষ রাখতে হবে ওই শর্তাবলি যাতে দেশের প্রচলিত আইন ও নীতির পরিপন্থি না হয়। ১২ বছর বয়সের কোনো শিশুকে হালকা কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার স্বাস্থ্য ও উন্নতির জন্য বিপজ্জনক নয়, অথবা শিক্ষা গ্রহণকে বিঘিœত করবে না, তা বিবেচনায় নিতে হবে। তবে ১২ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

কর্মঘণ্টা, ছুটি, বিশ্রাম ও বিনোদন: প্রত্যেক গৃহকর্মীর কর্মঘণ্টা এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যাতে সে পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন ও প্রয়োজনীয় ছুটির সুযোগ পায়। গৃহকর্মীর ঘুম ও বিশ্রামের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্থান নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর অনুমতি নিয়ে গৃহকর্মী সবেতনে ছুটি ভোগ করতে পারবে।

প্রসূতিকালীন সুবিধা: সন্তানসম্ভবা গৃহকর্মীকে তার প্রসূতিকালীন ছুটি হিসেবে মোট ১৬ সপ্তাহ (প্রসবের আগে চার সপ্তাহ এবং প্রসবের পরে ১২ সপ্তাহ অথবা গৃহকর্মীর সুবিধা অনুসারে) সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান করতে হবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত ভারী কাজ থেকে বিরত রাখা এবং মাতৃস্বাস্থ্যের পরিচর্যায় সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গৃহকর্তা সহায়তা করবে।

চিকিৎসা: অসুস্থ গৃহকর্মীকে কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে এবং নিয়োগকারী নিজ ব্যয়ে তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। এছাড়া কর্মরত অবস্থায় কোনো গৃহকর্মী দুর্ঘটনার শিকার হলে যথাযথ চিকিৎসাসহ দুর্ঘটনা ও ক্ষতির ধরন অনুযায়ী নিয়োগকারী ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।

নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: কোনো ক্রমেই গৃহকর্মীর প্রতি কোনো ধরনের দৈহিক আঘাত অথবা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। গৃহকর্মীর ওপর কোনো রকম হয়রানি ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারের ওপর বর্তাবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ও সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি প্রদান করবে।

নিয়োগকারী, তার পরিবারের সদস্য বা আগত অতিথিদের দ্বারা কোনো গৃহকর্মী কোনো প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যেমন অশ্লীল আচরণ, যৌন হয়রানি বা যৌন নির্যাতন, শারীরিক আঘাত অথবা ভীতি প্রদর্শনের শিকার হলে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। গৃহকর্মীর দায়েরকৃত যৌন হয়রানি, যৌন নির্যাতন, কিংবা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মামলা সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত হবে।

গৃহকর্মী নিয়োগকারীকে অবহিত না করে গৃহ ত্যাগ কিংবা চাকরি ছেড়ে দিলে নিয়োগকারী সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি স্থানীয় থানাকে অবহিত করে সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। গৃহকর্মী না জানিয়ে চলে যাওয়ার সময় যদি অর্থ বা মালামাল সঙ্গে নিয়ে যায়, সেক্ষেত্রে নিয়োগকারী দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে।

‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১৫’ জনগণের কাছে প্রচারের জন্য গণমাধ্যম, মোবাইল মেসেজ, পোস্টারিং, লিফলেট, বুকলেট প্রভৃতি মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। গৃহকর্মী ছাড়াও যেকোনো ব্যক্তি বিপদের সম্মুখীন হলে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে প্রতিকার পেতে পারে। সরকারের এ নীতির বাস্তবায়ন ও গৃহকর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি গৃহকর্মী নিয়োগদাতাদের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও ওয়ার্কশপের অয়োজন করতে হবে।

নিয়োগকারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য: নিয়োগকারী গৃহকর্মীর প্রতি মানবিক আচরণ করবে। প্রত্যেক নিয়োগকারী নিয়োগকৃত গৃহকর্মীর বিষয়ে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালার উল্লিখিত দিকনির্দেশনাগুলো অনুসরণ করবে এবং নীতি অনুযায়ী গৃহকর্মীর প্রাপ্য অধিকার ও সুবিধাদি প্রদান করবে। নিয়োগকারী অভিভাবকহীন কিশোর-কিশোরী গৃহকর্মীর মজুরি তার সম্মতিক্রমে ব্যাংকে জমা রাখতে পারবে, যাতে গৃহকর্মী সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ হয় এবং তার অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। গৃহকর্মী কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। তবে নিয়োগকারী নিজে কোনো শারীরিক বা মানসিক শাস্তি প্রদান করবে না।

গৃহকর্মীর দায়িত্ব ও কর্তব্য: গৃহকর্মী আইনসম্মত সব বিষয়ে গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর বিশ্বাসভাজন থাকবে এবং এমন কোনো কাজ করবে না যাতে পারস্পরিক বিশ্বাসের কোনো ব্যত্যয় বা অবনতি ঘটে। গৃহকর্মী নিয়োগকারীর গৃহের প্রাপ্তবয়স্ক ও দায়িত্বশীল সদস্যের অনুপস্থিতিতে বাড়িঘরের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে থাকবে এবং কোনো ধরনের নীতিবহির্ভূত কাজে জড়াবে না। নিয়োগকারীর পরিবারের শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ ব্যক্তি বা সদস্যদের প্রতি যতœশীল থাকবে। এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যত্যয় ঘটলে নিয়োগকারী গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে এবং গৃহকর্মীর অভিভাবক বা আত্মীয়কে বিষয়টি অবহিত করবে।

কোনো গৃহকর্মী তার নিয়োগকারী দ্বারা নির্যাতন বা বঞ্চনার শিকার হলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের টোল ফ্রি হেল্প লাইন ১০৯ বা জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চাকরি থেকে অপসারণ বা অবসানের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে ন্যূনতম এক মাস আগে অবহিত করতে হবে। যদি তাৎক্ষণিকভাবে গৃহকর্তা গৃহকর্মীর চাকরির অবসান ঘটায়, তাহলে এক মাসের মজুরি প্রদান করতে হবে।

‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১৫’ সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। গৃহকর্মী ও তাদের পরিবারের অসহায়ত্বের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনায় নিতে হবে। মানুষ হিসেবে সবার রয়েছে মর্যাদা ও সম-অধিকার। সব গৃহকর্মীর রয়েছে অধিকার ও মর্যাদা। তাদের গৃহকর্মী হিসেবে না দেখে পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি গৃহকর্মীকেও গৃহকর্ত্রী বা গৃহকর্তার পরিবারকে নিজ পরিবারের মতো মনে করে সঠিক আচরণ করতে হবে। উভয়ের ইতিবাচক মনোভাব ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধ করতে।

পিআইডি নিবন্ধ