মত-বিশ্লেষণ

গোপালপুর গণহত্যা দিবস

কাজী সালমা সুলতানা: আজ ৫ মে নাটোর গোপালপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে গণহত্যা সংঘটিত হয় নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার গোপালপুর সদরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে। এই গণহত্যার শিকার হন উত্তরবঙ্গ চিনিকলে কর্মরত বাঙালিরা। এ ঘটনায় আনোয়ারুল আজিমসহ চিনিকলের ৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীও শহীদ হন।

পাবনায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৫তম পদাতিক বাহিনী স্থানীয়দের কাছ থেকে দখল নিতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তারা রাজশাহীর ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর থেকে জনবল ও রসদের জোগান চায়। মেজর রাজা আসলাম পাবনা এসে পৌঁছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে রাজশাহীর দিকে ফিরে যেতে তাকে বাধ্য করা হয়। স্থানীয় বাঙালি বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় বাধা সৃষ্টি করে। তারা গোপালপুর রেলফটকে স্থানীয় স্টেশনকর্তা রেলওয়ে বগি দিয়ে বাধা তৈরি করেন। 

১৯৭১ সালের ৫ মে সকালে হানাদার বাহিনী নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে প্রবেশ করে। তারা সেখানে নিয়ন্ত্রণ নিয়েই প্রায় ২০০ চিনিকলের কর্মচারীকে জড়ো করে তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা অবসরপ্রাপ্ত লে. আনোয়ারুল আজিম সেনাবাহিনীর হাতে ধরা দেন এবং অনুরোধ করেন যেন নিরীহ লোকজনকে ছেড়ে দেয়া হয়। পাকিস্তান সেনারা লে. আজিম তার পরিবারকে ও মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২০০ জনকে বন্দি করে। তারা বন্দিদের মিলের অফিসার্স কোয়ার্টারের গোপাল পুকুরঘাটে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। এরপর ঘাতকদের ১৩টি মেশিনগানের গুলি একসঙ্গে গর্জে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে পুকুরঘাট লাশের স্তূপে পরিণত হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হতে ঘাতকরা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গুলিবিদ্ধদের হত্যা করে। পরে লাশগুলোকে পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়। শহীদদের রক্তে গোপাল পুকুরের পানি লাল হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ ২০০ জন বন্দির মধ্যে মাত্র চারজনÑআবদুল জলিল শিকদার, খুরশেদ আলম, আবুল হোসেইন, ইমাদ উদ্দিন এবং ইঞ্জিল সর্দার বাঁচতে সক্ষম হন।

পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে আরও বহু মানুষকে এই পুকুরপাড়ে গুলি করে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে গোপাল পুকুরটি ছিল বধ্যভূমি। স্বাধীনতার পরে এই পুকুরের ভেতর এবং পুকুর পাড় থেকে অসংখ্য শহীদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পুকুরটির নামকরণ করা হয় ‘শহীদ সাগর।’ অবসরপ্রপ্ত লে. আজিমের স্মরণে গোপালপুর রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করা হয় আজিমনগর স্টেশন।

সেদিনের গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী খন্দকার জালাল আহমেদের বলেন, ‘১৯৭১ সালের ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় দায়িত্ব পালন করছিলাম। দুজন পাকিস্তানি সেনা আমার দুই পাশে এসে দাঁড়াল। একজন পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে বলল, ‘ইয়ে বাঙালি, মিটিং মে চল’। এ সময় মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা মঞ্জুর ইমান নামের একজন অবাঙালি কর্মচারী বাঙালিদের শনাক্ত করে দিচ্ছিল। এর মধ্যে মিলের কর্মকর্তা অবসরপ্রপ্ত লেফটেন্যান্ট আনোয়ারুল আজিমকেও ধরে আনা হয়। একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আজিমকে বলে, ‘কিসনে মেজর আসলামকে মারা হায়’? তিনি বলেন, জানি না। আজিম এ সময় হানাদারদের সঙ্গে তর্ক শুরু করেন। পরে নরপশুরা আমাদের মিলের অফিসার্স কোয়ার্টারের পুকুরঘাটে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাতকদের ১৩টি স্বয়ংক্রিয় এলএমজি একসঙ্গে আমাদের ওপর গর্জে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে পুকুরঘাট লাশের স্তূপে পরিণত হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মিলে কর্মরত প্রায় ২০০ শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আমাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে পানির মধ্যে গড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। একসময় জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখি, আমার মাথাটা ঘাটের ওপর এবং দেহের অর্ধেক অংশ পানির মধ্যে ডুবে আছে। লাশের স্তূপের মধ্যে উল্টে-পাল্টে জীবন্ত কাউকে খুঁজছিলেন আমার সহকর্মী মেহমান আলী। বুঝলাম, তিনিই আমাকে লাশের স্তূপ থেকে উদ্ধার করেছেন। বহু কষ্টে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম, পাশে পড়ে আছে ছোট ভাই মান্নানের লাশ। হত্যার আগে ও আমাকে পালিয়ে যেতে বলেছিল।’ তিনি আরও জানান, ব্রাশফায়ারের আগ মুহূর্তে মান্নান নামের মিলের এক হিসাব সহকারী শায়িত অবস্থায় মাথাটা সামান্য উঁচু করে পবিত্র কোরআন পাঠ করছিলেন। তাকে দেখে হানাদাররা বলে, ‘তুম মৌলবি হু? ছোড় দাও।’ তখন তিনি বলেন, ‘আমি একা যাব না। সবাইকে ছাড়া।’ হানাদাররা তখন মান্নানকে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পুকুরে অর্ধেক ডুবন্ত অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।

১৯৭১ সালে এদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের নির্মম ঘটনা। সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন অসংখ্য নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেও হার মানায়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা যাদের হারিয়েছি তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তারাই অনুপ্রেরণা হয়ে এদেশের ভবিষ্যৎ প্রজš§কে পথ দেখাবে।

তথ্যসূত্র : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..