প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি: চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বাড়বে ৮৮৯ কোটি টাকা

 

 

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, চট্টগ্রামে বহুজাতিক সার-কারখানা কাফকো ও দেশি সার-কারখানা সিইউএফএলসহ ১৮৩টি ভারী শিল্প-কারখানা, ছয় লাখ আবাসিক গ্রাহক, ৬৩টি সিএনজি স্টেশন, ১০০টিরও বেশি রি-রোলিং মিলসহ বাণিজ্যিক গ্রাহকের গ্যাসনির্ভরতা রয়েছে। এসব গ্রাহকের গ্যাসের মোট চাহিদা ৫০০ ঘনফুট। কিন্তু পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ২৩০ ঘনফুট। চাহিদার অর্ধেকও ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। এ কারণে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারায় উৎপাদন ব্যয় বেশি হচ্ছে। এর মধ্যে কার্যকর হতে যাচ্ছে বর্ধিত গ্যাসের দাম। আর চট্টগ্রামে বিভিন্ন ট্রেড বডিগুলোর মতে, শিল্প খাতের গ্রাহকদের ব্যয় বাড়বে ক্যাপটিভ, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের দামবৃদ্ধির ফলে। এর মধ্যে ক্যাপটিভ বিদ্যুতে সরবরাহ গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ১৫ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ। এতে খাতটির উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়বে ১৭৯ কোটি টাকা। শিল্পে দুই ধাপে গ্যাসের দাম বাড়বে ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। এতে ব্যয় বাড়বে ১৮২ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহƒত গ্যাসের দাম দুই ধাপে বাড়ছে ৫০ শতাংশ। ফলে এ খাতের গ্রাহকদের ব্যয় বাড়বে ৫৩ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহƒত গ্যাসের দাম দুই ধাপে বাড়ছে ১২ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। এতে খাতটির গ্রাহকদের ব্যয় বাড়বে ১২৫ কোটি টাকা। আর আবাসিক গ্রাহকদের ব্যয় বাড়ছে ২০০ কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশ। এছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে সিএনজি ফিড গ্যাসের দাম দুই ধাপে বাড়ছে ১৪ শতাংশের বেশি। এতে ব্যয় বাড়বে ১৫০ কোটি টাকা বা ১৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের গ্যাসসেবা গ্রহণকারী গ্রাহকের বাড়তি খরচ হবে ৮৮৯ কোটি টাকা।

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে সর্বমোট ২৪৪.২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কাফকো এককভাবে ব্যবহার করেছে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর বাইরে সিইউএফএল ৩.৭০ মিলিয়ন, শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র ৩৭.৫২ মিলিয়ন ঘনফুট, কেপিএম ২.৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট, ইউনাইটেড পাওয়ার প্রায় ১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করেছে। এর বাইরে আবাসিক খাতে ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এছাড়া সিএনজি স্টেশনগুলোও রেশনিং করে গ্যাস ব্যবহার করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্প-বাণিজ্যের জন্য আদর্শ স্থান হলেও চট্টগ্রামে জমির স্বপ্লতা ও জমির দাম অধিক, গ্যাস সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদসহ নানা কারণে থমকে গেছে শিল্প-বিনিয়োগ। সম্ভাবনার পুরোটায় অবিকশিত থেকে যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা চট্টগ্রামের পরিবর্তে অন্য জেলায় শিল্প স্থাপন করছেন কিংবা আগ্রহী হচ্ছেন। আর যারা আগে বিনিয়োগ করেছেন তারাও বিপাকে। তাদের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে আছে কেবল গ্যাস না পাওয়ায়। চট্টগ্রামে শিল্পে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে অনেক কারণের মধ্যে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কারণ হলো জ্বালানি সংকট। চিটাগাং চেম্বার

অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রি সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রতিষ্ঠান শুধু গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না।

চালু হওয়ার আগেই দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে কোনো কোনো কারখানা। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ডিমান্ড নোট অনুসারে টাকা জমা দিয়েছে, সার্ভিস লাইন ও অভ্যন্তরীণ লাইন স্থাপন করে গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। সংযোগ দেওয়ার ব্যাপারে গ্যাস বিতরণ কর্তৃপক্ষের সম্মতিপত্র নিয়ে কারখানা স্থাপন করেছেন উদ্যোক্তারা। এরপর ক্যাপিটাল মেশিনারিও আমদানি করেন। শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তারা। কিন্তু এখনও গ্যাস সংযোগ পাননি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) চট্টগ্রাম অফিস সূত্রে জানা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামে ছয় বছর ধরে ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন বিনিয়োগ নেই। তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতম খাত হলেও নানা সংকটে চট্টগ্রামে এ শিল্পের প্রসার ঘটেনি। তাছাড়া গ্যাস সংকট, নতুন করে সংযোগ না দেওয়া ও নিরবছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে ছয় বছরে বন্ধ হয়েছে ১৫টির বেশি ডায়িং প্রতিষ্ঠান। আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের অভাবে কাক্সিক্ষত উৎপাদনে যেতে পারছে না।

এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান শওকত ওসমান শেয়ার বিজকে বলেন, চট্টগ্রামে বিনিয়োগকে সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত করেছে গ্যাস সংকট। এখানকার ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও কোনো উদ্যোগ নেই তা নিরসনে। গ্যাসের দাম বাড়–ক। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস তো আমাদের দিতে হবে। তা না হলে শিল্প বাঁচবে না। চট্টগ্রামের জন্য ফিডার লাইন স্থাপনের বিষয়টি ঝুলে আছে বছরের পর বছর। এখানকার বিনিয়োগকারীরা প্রধানত জ্বালানি সংকটে বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন ঢাকা, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকায়।

চিটাগাং চেম্বার পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, কারও সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে একতরফাভাবে গ্যাসের দাম বাড়াতে পারে না। এমনিতে চট্টগ্রামে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। আর এ বর্ধিত গ্যাসমূল্য কার্যকরে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও নাজুক হয়ে পড়বে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার শিল্পে বিনিয়োগে বড় বাধা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি তিন মাস আগে যে কার্যাদেশ পেয়েছি, তা যদি সঠিক সময়ে ডেলিভারি দিলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ কোটি টাকা।’

চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি খলিলুর রহমান চট্টগ্রামে বিনিয়োগের কম হওয়ার কারণ হিসেবে অভিমত দেন যে প্রধানত জ্বালানির অভাবে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ নেই। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে তবেই এখানে বিনিয়োগ হবে। আনোয়ারা ও মিরসরাইয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশাল বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন সুলভে জ্বালানি সরবরাহ করতে হবে। তা না হলে সুফল পাওয়া যাবে না।

চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট নিয়ে চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ৫০০ এমএমসিএফটি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ২৪০ এমএমসিএফটি। গ্যাসের এ সংকটের কারণে ইতোমধ্যে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে ৬০০ গার্মেন্ট শিল্প-কারখানা ছিল, যা বর্তমানে কমে ৩০০-এ নেমে এসেছে। তিনি প্রত্যাশা করেন, ২০১৮ সালের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ শেষ হলে গ্যাস সংকট নিরসন হবে।

অতীতে সব বড় শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়েছে চট্টগ্রামে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেছিল এখানে। কিন্তু সব সুযোগ-সুবিধা রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় তারা এখান থেকে প্রধান কার্যালয় গুটিয়ে নিয়ে গেছে।

ঢাকা অঞ্চলে গ্যাসের জোগান দেওয়ার জন্য সাতটি সঞ্চালন লাইন রয়েছে। সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চল থেকে ওই সাতটি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ গ্যাস ঢাকা এবং সন্নিহিত এলাকায় সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। আর চট্টগ্রামে রয়েছে কেবল একটি লাইন। আশুগঞ্জ-বাখরাবাদ গ্যাস সরবরাহ লাইন নামের এ একটি মাত্র লাইন দিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য গ্যাস বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের চেয়ে কম। ফলে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৫০ মিলিয়ন গ্যাস নিয়ে চট্টগ্রামে হাহাকার চলছে।