প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গ্যাস-তেল সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে লোডশেডিং

ইসমাইল আলী: সপ্তাহের ব্যবধানে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এতে ৩ জুলাই গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হয়েছে এক হাজার ৬২৯ মেগাওয়াটের। এক সপ্তাহ আগেও তা ছিল মাত্র ৫৮৮ মেগাওয়াট। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও চড়া। এতে দিনে ১১০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তাই তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রও পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে লোডশেডিং দিচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে না সরকার। ফলে কমে গেছে দেশে গ্যাস সরবরাহ। এতে আবাসিকের পাশাপাশি শিল্প খাতও ভুগছে গ্যাস সংকটে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতেও কমিয়ে দেয়া হয়েছে গ্যাস সরবরাহ, যার প্রভাবে হঠাৎ করে নেমেছে বিপর্যয়। শুরু হয়েছে দেশব্যাপী লোডশেডিং। যদিও দ্রুতই এ পরিস্থিতিতে থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাবে, বর্তমানে দেশের সব গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে চালাতে দৈনিক গ্যাস লাগবে দুই হাজার ২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ)। আর বাংলাদেশ তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) বলছে, গত ২৬ জুন বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল এক হাজার ১৬৭ এমএমসিএফ। ৩ জুলাই তা কমিয়ে করা হয়েছে ৯৬০ দশমিক ৬০ এমএমসিএফ। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ২০৬ দশমিক ৪০ এমএমসিএফ বা ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

গ্যাস সরবরাহ কমার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গত ৩ জুলাই দেশব্যাপী বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৪০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন পর্যায়েই ৮১০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকে। সরবরাহ পর্যায় মিলিয়ে তা হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। ফলে লোডশেডিং হঠাৎই শুরু হয়। এছাড়া কয়লা সংকটে আগে থেকেই বসে আছে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৮৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ইউনিট। এছাড়া তেলের উচ্চ দামের কারণে বসিয়ে রাখা হচ্ছে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্র।

যদিও এর এক সপ্তাহে (২৬ জুন) আগে উৎপাদন পর্যায়ে কোনো ঘাটতি ছিল না বিদ্যুতে। বরং চাহিদার অতিরিক্ত রিজার্ভ ছিল। ওইদিন দেশব্যাপী বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন করা হয়েছে ১৪ হাজার ৯২০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন পর্যায়েই ৯২০ মেগাওয়াট রিজার্ভ থাকে।

এদিকে সারাদেশে বর্তমানে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৭০ কোটি ঘনফুট। সাধারণত গড়ে ৩০০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ করা হয়। দুই দিন ধরে সরবরাহ করা হচ্ছে দিনে ২৭৫ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুট করে। কিছু দিন ধরেই ধাপে ধাপে কমানো হচ্ছিল সরবরাহ। এলএনজি কেনা না হলে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই আপাতত। বিশ্ববাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ৩৮ ডলার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ কেনা হয়েছিল ২৫ ডলারে। দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় আপাতত এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কেনা হচ্ছে না।

সরকারিভাবে এলএনজি আমদানি করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। সরকারি এ কোম্পানির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি কেনার কাজটি তারা করলেও সিদ্ধান্ত দেয় পেট্রোবাংলা ও সরকার। গত মাসে স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো (জাহাজ) এলএনজি এসেছে। দিনে ৭৫ থেকে ৮০ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ করা হয়েছে। এ মাসে কয়েক দিন ধরে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। মূলত গত রোববার থেকে সরবরাহ কমে যায়। এখন শুধু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ওমান ও কাতার থেকে আসা এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বই সাশ্রয়ী হচ্ছে। এলএনজির দাম কমলে স্পট থেকে আমদানি করা হবে। এখন দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

এদিকে হঠাৎ দেশব্যাপী লোডশেডিং শুরু হওয়ায় রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, ‘গ্যাস স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরায় স্বাভাবিক হবে।’ কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সরবরাহ অন্যান্য সব দেশের মতো আমাদেরও সমস্যায় ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে আপনাদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি।’

গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় রোববারের মতো গতকালও লোডশেডিং হয় রাজধানীসহ সারাদেশে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।

গতকালও চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পেয়েছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। দিনে এ সংস্থার চাহিদা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। রাজধানীর আরেকটি বিতরণ কোম্পানি ডেসকোর সরবরাহ কমেছে দিনে ১৫০ মেগাওয়াট। এ সংস্থার দিনে চাহিদা ১ হাজার মেগাওয়াট, পাচ্ছে ৮৫০ মেগাওয়াট।

ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, সোমবার সকালে এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পেয়েছি। সন্ধ্যায় তা কমে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট হয়। সব মিলিয়ে ৩০০ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাওসার আমির আলী বলেন, ‘আমাদের ঘাটতির পরিমাণ ১৫০ থেকে ১৭৫ মেগাওয়াটের মতো। চাহিদা থাকে এক হাজার মেগাওয়াট। সকালে পেয়েছি ৮৫০ মেগাওয়াট। বিভিন্ন এলাকায় আধা ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি।’

যদিও সবচেয়ে বেশি খারাপ পরিস্থিতি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায়। দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমনটি জানা গেছে। তারা বলছেন, দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আরইবি। গতকাল সরবরাহ কমেছে ৮৫১ মেগাওয়াট। সারাদেশেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। কোথাও ৮-৯ ঘণ্টাও লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।