প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গ্যাস সংকটে নিবু নিবু মুন্নু ফেব্রিকস: ৯ বছরে পুঞ্জীভূত লোকসান ২২১ কোটি টাকা

পলাশ শরিফ: গ্যাস সংকটের কারণে নামমাত্র উৎপাদন চলছে। শুধু যন্ত্রপাতি ঠিক রাখতে চালু রাখা হচ্ছে। এর জেরে কমছে উৎপাদন। কমছে আয়। এসব কারণে ৯ বছরে প্রায় ২২১ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে মুন্নু গ্রুপের কোম্পানিটি। অন্যদিকে কোম্পানিটিকে দেওয়া প্রায় ২৪৩ কোটি খেলাপি ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বস্ত্র খাতের কোম্পানি মুন্নু ফেব্রিকস নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে বেশ শক্ত অবস্থানে ছিল। এর পরের দশকে এসে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। ২০০০ সালে ১৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা লোকসানের মধ্য দিয়ে পিছিয়ে পড়া কোম্পানির তালিকায় নাম লেখায় বর্তমানে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে থাকা মুন্নু ফেব্রিকস। এরপর গ্যাস সংকটসহ নানা টানাপড়েনের মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু তিন বছর টানা লোকসান ও গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় ২০১০ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। লে-অফ ঘোষণার প্রায় দেড় বছর পর ২০১১ সালে আবারও উৎপাদনে ফেরে মুন্নু ফেব্রিকস। তবে পণ্য উৎপাদনের জন্য নয়, বরং কোম্পানির মূল্যবান যন্ত্রপাতি চালু রাখার জন্য। চাহিদামতো গ্যাস না পেয়ে বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্নু ফেব্রিকসের ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি সচিব বিনয় পাল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মূলত গ্যাস সংকটের কারণেই পুরোপুরি উৎপাদনে ফেরা যাচ্ছে না। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ চেয়ে বারবার আবেদন করা হচ্ছে; কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে স্পিনিং ও উইভিং দুটি সেকশন। গ্যাস না থাকায় একটি সেকশন বন্ধ রেখে অন্য সেকশন চালানো হচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতার ১০-১৫ শতাংশ ব্যবহƒত হচ্ছে। তবে উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় লোকসান কমে আসছে।’

এদিকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ২০০৮ সাল থেকে গত ৯ বছরে প্রায় ২২১ কোটি ২৯ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে মুন্নু ফেব্রিকস। তবে শ্রমিক কমিয়ে আনাসহ বেশকিছু পন্থায় খরচ কমিয়ে লোকসান কমাচ্ছে কোম্পানিটি। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৭-০৮ আর্থিক বছরে প্রায় চার কোটি ৪৪ লাখ টাকা কর-পরবর্তী লোকসান গুনেছিল মুন্নু ফেব্রিকস। আর সর্বশেষ ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে এসে (১৮ মাসে) প্রায় ২৪ কোটি ১১ লাখ টাকা লোকসান করেছে। গত ৯ বছরের মধ্যে ২০১১ সালে সর্বোচ্চ প্রায় ৬২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা লোকসান করেছিল।

চলতি ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এক কোটি ২৯ লাখ টাকা পরিচালন লোকসান গুনেছে মুন্নু ফেব্রিকস। সেই হিসেবে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১১ পয়সা। আর এর আগের আর্থিক বছরের একই সময়ে এক কোটি ৯৮ লাখ টাকা লোকসান গুনেছিল কোম্পানিটি।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে ‘সার্বক্ষণিকভাবে চালু রাখতে হয়’ এমন কিছু যন্ত্রপাতি ঠিক রাখার স্বার্থেই স্বল্প পরিসরে উৎপাদন চালু করা হয়েছে। আর গ্যাস সংকট কাটিয়ে না উঠলে পুরোপুরি উৎপাদন শুরু করা সম্ভব নয়। তবে অসমর্থিত সূত্রগুলো বলছে, কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের প্রায় এক দশক ধরে কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হচ্ছে না। একইভাবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোনালী ব্যাংকের দায়-দেনা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তাই ‘বিলুপ্তি’ ঠেকাতেই উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। যে কারণে উৎপাদনে থাকলেও মূল মার্কেটে ফিরছে না কোম্পানিটি।

তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় মুন্নু ফেব্রিকস। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া, বন্ধক রাখা সম্পত্তি গোপনে বিক্রি ও অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ মুন্নু ফেব্রিকসকে দেওয়া প্রায় ২৩৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। এরই  জেরে সম্প্রতি ঘোষণা করা শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নাম এসেছে কোম্পানিটির। একসময়ের লাভজনক ব্যবসায়িক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, কোম্পানির পরিচালনা-ব্যবস্থাপনায় রদবদল ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে পারছে না।

উল্লেখ্য, লোকসান, লভ্যাংশ না দিয়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে যাওয়া ও উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কারণে ২০১০ সালের অক্টোবরে মূল মার্কেট থেকে আরও কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে ওটিসি মার্কেটে পাঠানো হয়। আর লোকসানের কারণে ২০০৮ সাল থেকে কোনো লভ্যাংশ দিচ্ছে না কোম্পানিটি। লভ্যাংশ না দেওয়া, ওটিসিতে অবস্থান ও টানা লোকসানের কারণে ক্রেতা সংকটে মুন্নু ফেব্রিক্স। গত ২২ মে কোম্পানিটির শেয়ার ওটিসিতে সর্বশেষ ছয় টাকা ৬০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। কোম্পানিটির মোট ১১ কোটি ৫০ লাখ শেয়ারের মধ্যে বর্তমানে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে এক দশমিক ৪৪ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।