রামিসা রহমান : দেশজুড়ে চলমান সিলিন্ডার গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবাসন খাতে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনো পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ পৌঁছায়নি, সেসব এলাকার বাড়ির মালিকরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। একসময় যেখানে অনায়াসেই ভাড়াটিয়া পাওয়া যেত, সেখানে এখন একের পর এক ফ্ল্যাট খালি পড়ে থাকছে। অনেক বাড়ির মালিক মাসের পর মাস ভাড়া পাচ্ছেন না, অথচ ব্যাংকঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও অন্যান্য দায় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে।
রাজধানীর লক্ষ্মীবাজার, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, আফতাবনগর, বাড্ডা, উত্তরখান ও দক্ষিণখানসহ এমন বহু এলাকায় নতুন নির্মিত ভবনগুলো মূলত সিলিন্ডার গ্যাসনির্ভর। এসব ভবনে আগে ভাড়াটিয়ার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু সিলিন্ডার গ্যাসের দাম হঠাৎ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ভাড়াটিয়ারা এসব বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন লাইনের গ্যাস থাকা পুরোনো এলাকায় কিংবা শহরের বাইরে।
মিরপুরের বাড়িমালিক রমজান মিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এই বিল্ডিং বানাতে ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছি। আগে সব ফ্ল্যাট ভাড়া থাকত। এখন চারটা ফ্ল্যাট একসঙ্গে খালি। মাসে প্রায় এক লাখ টাকা ভাড়া কমে গেছে। গ্যাস সংকট আমার জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বাড়ির মালিকদের বড় অভিযোগ, ভাড়াটিয়া চলে গেলে শুধু ভাড়াই কমে না, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ে। লিফট, পানির পাম্প, সিকিউরিটি গার্ড, পরিচ্ছন্নতাকর্মী-সবকিছুর খরচ বহন করতে হয় মালিককেই। তাই বাধ্য হয়ে অনেকেই এখন এসব সেবার মান কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।
মিরপুরের আরেকজন ফ্ল্যাট মালিক সামিয়া আক্তার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাসা খালি থাকলে বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, সোসাইটি চার্জ-সব মালিককেই দিতে হয়। আগে ভাবিনি গ্যাসের কারণে এমন অবস্থা হবে।’
ভাড়াটিয়া সংকটের কারণে অনেক মালিক ভাড়া কমিয়েও সমাধান পাচ্ছেন না। কেউ কেউ দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া কমানোর প্রস্তাব দিচ্ছেন, তবুও ভাড়াটিয়ারা রাজি হচ্ছেন না। কারণ মূল সমস্যা ভাড়া নয়, রান্নার গ্যাসের অতিরিক্ত খরচ।
রিয়েল এস্টেট-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি আবাসন বাজারে এক ধরনের অদৃশ্য মন্দা তৈরি করছে। নতুন ভবন নির্মাণে আগ্রহ কমছে। যারা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা এখন পিছিয়ে যাচ্ছেন। কারণ ভবিষ্যতে গ্যাস সংযোগ পাওয়া যাবে কি না, তা অনিশ্চিত।
মোহাম্মাদপুরের একজন আবাসন ব্যবসায়ী রহমত আলী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আগে লোকজন জিজ্ঞেস করত ফ্ল্যাটের সাইজ, ভাড়া। এখন প্রথম প্রশ্ন-লাইনের গ্যাস আছে কি না?’
এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়া। অনেক ভাড়াটিয়া বাড়ির মালিকের কাছে গ্যাস খরচ কমানোর দাবি তুলছেন, কেউ কেউ ভাড়া কমানোর চাপ দিচ্ছেন। আবার কেউ কোনো নোটিশ ছাড়াই বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, যা মালিকদের জন্য আরও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মোহাম্মাদপুরের বাড়িওয়ালা রিমন আহমেদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘হঠাৎ ফোন করে বলে, আগামী মাসে থাকব না। এত অল্প সময়ে নতুন ভাড়াটিয়া পাওয়া যায় না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শুধু ভোক্তার জীবনযাত্রার খরচই বাড়াচ্ছে না, এটি আবাসন বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভাড়া কমে যাওয়া, ফ্ল্যাট খালি থাকা এবং ঋণ খেলাপির ঝুঁকি বাড়ায় ব্যাংক খাতও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করছে, যার প্রভাব পুরো নগর অর্থনীতিতে পড়বে।’
তিনি বলেন, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্তের ঘাটতি থাকে, সেখানে বাজার নিজের মতো করে ভারসাম্য আনতে গিয়ে দুর্বল পক্ষগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ও মধ্যবিত্ত ভাড়াটিয়ারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গ্যাস সংকট শুধু জ্বালানির সমস্যা নয়, এটি নগরজীবনের সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে যে আস্থার সম্পর্ক, তা ভেঙে পড়ছে। হঠাৎ বাসা ছেড়ে দেওয়া, চাপ সৃষ্টি করা কিংবা দ্বন্দ্বÑএসব সামাজিক অস্থিরতার লক্ষণ। এ ধরনের সংকট শহরের ভৌগোলিক বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। লাইনের গ্যাস থাকা এলাকাগুলো অভিজাত হয়ে উঠছে, আর সিলিন্ডারনির্ভর এলাকাগুলো ধীরে ধীরে অবহেলিত অঞ্চলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সিলিন্ডার গ্যাসের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভোক্তা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি তার প্রভাব পড়ছে আবাসন খাতেও। বাজারে গ্যাস সরবরাহ ও দামের ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকায় এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।’
তিনি বলেন, সরকার যদি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে ভর্তুকি, কর ছাড় বা প্রণোদনা না দেয়, তাহলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি হবে। এর দায় শুধু ভোক্তার নয়, পুরো ব্যবস্থাপনার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শহরের আবাসিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসবে। লাইনের গ্যাস থাকা এলাকা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়বে, সেখানে ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়বে। অন্যদিকে সিলিন্ডারনির্ভর এলাকায় ভবন ফাঁকা পড়ে থাকবে, যা নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও নেতিবাচক।
অনেক বাড়ির মালিক এখন বিকল্প চিন্তা করছেন। কেউ কেউ ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন, কেউ সোলার সিস্টেম বসানোর কথা ভাবছেন। কিন্তু এসব সমাধান বাস্তবায়ন করতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা সবাই করতে পারছেন না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়ির মালিকদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-সরকারি পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। কোথায় লাইনের গ্যাস দেওয়া হবে, কোথায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়ন হবেÑএই বিষয়গুলো স্পষ্ট না হলে আবাসন খাত আরও বড় সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে সিলিন্ডার গ্যাস সংকট এখন বাড়ির মালিকদের জন্য এক অদৃশ্য চাপ। আয় কমে যাওয়া, ভবন খালি থাকা, ঋণের বোঝা-সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই এখন সত্যিকার অর্থেই ‘মাথায় হাত’ দিয়ে বসে আছেন।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post