দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান

নাসির উদ্দিন: টাঙ্গাইলের বাসিন্দা হাফসা খাতুন। মা-বাবার বড় সন্তান। লেখাপড়া খুব একটা করেননি। এসএসসি পরীক্ষাটাও দেয়া হয়নি। মা-বাবার একমাত্র ছেলে পাশের গ্রামের আমজাদ আলীর সঙ্গে অল্প বয়সেই তার বিয়ে দেওয়া হয়। আমজাদ আলীর স্বভাব-চরিত্র ভালো। গ্রামে বাবার বিঘা দশেক জমি আছে, কিন্তু কৃষিকাজ করতে তার ভালো লাগে না। অবশেষে সবার মতামতের ভিত্তিতে বিদেশ যাবে বলে সে সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের ছয় মাস পর আমজাদ আলী জীবিকার উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া পাড়ি জমায়। হাফসা বাড়ির সব কাজ সামলে কৃষিকাজে মন দেয়। জমি থেকে যে পরিমাণ শস্য পায়, তা দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলে যায়। আমজাদ আলীও বিদেশ থেকে মাসে মাসে বাড়িতে টাকা পাঠায়। হাফসা সেই টাকা দিয়ে একটি গরুর খামার তৈরি করে। প্রথমে একটি গাভী দিয়ে শুরু করে। দেখতে দেখতে সেই খামারে এখন ছয়টি গাভী এবং আটটি ষাঁড় হয়েছে। এই কাজে হাফসার শ্বশুর-শাশুড়ি সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। এখন হাফসার একার পক্ষে খামার আর কৃষিকাজ সামলানো সম্ভব হয় না। খামার দেখাশোনা ও কৃষিকাজ সামলানোর জন্য মাসিক বেতনে তিন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। আমজাদ আলী বিদেশ থেকে মাসে যে পরিমাণ টাকা পাঠায়, তার থেকেও বেশি আয় হয় হাফসার খামার থেকে।

নীলফামারীর মেয়ে খাদিজা। বাবা গরিব কৃষক। অন্যের জমি বর্গা চষে সংসার চালায়। ছোটবেলায় খাদিজার মা মারা গেলে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে। সৎ মা খাদিজাকে দেখতে পারে না। বাবাও আর আগের মতো ভালোবাসে না। খাদিজার খালা গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে। এক ঈদে খালা বাড়িতে গেলে তার সঙ্গে কথা বলে খাদিজা গাজীপুরে চলে আসে পোশাক কারখানায় কাজ করবে বলে। ১০ বছর কাজ করে দক্ষ হওয়ার পর তার চোখ খুলে গেল। ১০ বছরে যে টাকা জমা করেছিল, তা দিয়ে নিজে কিছু করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। সে মহিলা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ নিয়ে খালার সঙ্গে মিলে দুজনে কয়েকটি সেলাই মেশিন কিনে গ্রামের মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কাজে নিয়োগ দিল। এখন তার সঙ্গে গ্রামের আরও ২০ মেয়ে কাজ করে।

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জমির অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে শিল্প খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, আয়বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্প খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের বিকাশ শিল্পোন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও দারিদ্র্যদূরীকরণের হাতিয়ার হিসেবে এসএমই খাতকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে এসএমই আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বৃহৎ শিল্পের তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কম পুঁজিনির্ভর। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান এবং আয়ের সুযোগ বেশি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি শক্তির ব্যবহারও অপেক্ষাকৃতভাবে কম এবং পরিবেশ দূষণও কম মাত্রায় হয়।

অফুরন্ত সম্ভাবনার আমাদের এ দেশ। আমাদের রয়েছে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বিপুল সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান (বিসিক) মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৫৭ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছে। বিসিকের  প্রচেষ্টায় দেশে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে এবং সেইসঙ্গে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিসিকের বেশকিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিআরবি কেব্লস, আরএফএল, জামদানি শিল্পসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে আট দশমিক এক শতাংশ। তার আগের বছরে এ হার ছিল সাত দশমিক ৮৬ শতাংশ। অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে চলেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে তিন দশমিক ৫১ শতাংশে নেমেছে, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল চার দশমিক ১৯ শতাংশ। একই সময়ে কৃষি খাতের অবদান ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে কমে ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিল্প খাতের অবদান ও প্রবৃদ্ধি দুটোই বেড়েছে। দেশে প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩১ হাজার বলা হলেও প্রকৃত বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার ৯ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি।

বিবিএস এর হিসাবমতে, মাঝারি শিল্পে একজন লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রয়োজন হয় ৯৫ হাজার টাকা। ক্ষুদ্রশিল্পের জন্য ৯৩ হাজার এবং কুটিরশিল্পের জন্য প্রয়োজন ১০ হাজার টাকা। যদিও এ হিসাবটি অনেক আগের। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন। বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে রূপকল্প-২০২১ গ্রহণ করেছে।

ক্ষুদ্রশিল্পে ঋণের সীমা ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত করা হয়েছে। এসএমই খাতে ঋণ প্রদানে নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, তাই সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তাদের এ খাতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য কমপক্ষে ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের অনুকূলে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং এর সুদের হার ১০ শতাংশ। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকে পৃথক ডেস্ক রাখা হয়েছে।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর বিভিন্ন ধরনের আয়বর্ধক, বৃত্তিমূলক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে। প্রধান কার্যালয়ে বিভিন্ন ট্রেড প্রশিক্ষণসহ জেলা/উপজেলা পর্যায়ে এমব্রয়ডারি ও সেলাই প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু পালন, মৎস্য চাষ, শাকসবজি চাষ, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের আওতায় দুস্থ অসহায় ও প্রশিক্ষত নারীদের আত্মকর্মস্থানের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় এক থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হয়। ঋণ গ্রহীতাদের মূল টাকার সঙ্গে শুধু পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ প্রদান করতে হয়।

কিন্তু বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। করোনার কারণে প্রধান মৌসুম পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরে এসএমই পণ্য বিক্রি হয়নি বললেই চলে। আবার খাদিজার মতো গরু খামারিরা ঈদুল আজহায় গরুর ভালো দাম পায়নি। এবারের বন্যাও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

এ প্রসঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন এন্ট্রাপ্রেনার্স নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ওয়েন্ড) সভাপতি নাদিয়া বিনতে আমিন বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। আর এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান ৮০ শতাংশ। এই খাতের অধিকাংশই এখন বাড়িভাড়া দিতে পারছে না। অনেকেই বেতন দিতে পারছে না। যারা ঋণ নিয়েছে, তারা ঋণ শোধ দিতে পারছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছে। নারী উদ্যোক্তাদের অধীনে প্রায় এক কোটি মানুষ কাজ করছে। সাধারণত পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরকে এসএমই পণ্য বিক্রির প্রধান মৌসুম বলে ধরা হয়। এ বছর সব কাজই বন্ধ ছিল। এই অবস্থায় একটি আপৎকালীন ফান্ড গঠন করা জরুরি, যাতে নারীরা স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘করোনার প্রেক্ষাপটে ছোট ও ক্ষুদ্রশিল্পের উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের জন্য সহায়তা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এই সেক্টরের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা অতি অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করেন। তাদের টিকে থাকার সক্ষমতাও কম।’ এ কারণে তাদের জন্য দ্রুত একটা জরুরি ফান্ড গঠন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তথাপি সরকারের করোনাকালীন প্রণোদনা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..