প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

 

শামসুল হক: উত্তরের জেলা গাইবান্ধা। জেলায় বেশ কিছু চর রয়েছে। চরের সিংহভাগ মানুষ নিরক্ষর। নেই শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ। অধিকাংশ তরুণ বাবার কৃষি পেশাকেই জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়। তাদের চাওয়া-পাওয়াও কম। দুবেলা দুমুঠো মোটা ভাত পেলেই সন্তুষ্ট। তেমনি একটি গ্রাম তারাপুর ইউনিয়নের নিজামখাঁ। নেই বিদ্যুতের আলো। কয়েক বছর আগেও এ গ্রামে অভাব লেগেই থাকতো। কয়েক দিন হলো ওই গ্রামে গিয়ে দেখলাম ভিন্ন চিত্র। গ্রামে পরিবর্তনের হাওয়া। আগের মতো নেই অভাব। ছেলেমেয়ে দল বেঁধে স্কুলে যাচ্ছে। নদীর অপর পাড়ে একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। এ গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলে তেমন যেতো না। শিক্ষকরাও স্কুলে আসতেন কম। এ নিয়ে ছিল না কারও মাথাব্যথা। এটাই যেন নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। এখন শিক্ষার্থীদের পরনে রঙিন পোশাক। মুখে হাসি। মেঠোপথের দু’পাশে সবুজ ক্ষেত। কৃষকরা মাঠে মনের আনন্দে কাজ করছেন। গৃহবধূদের দেখা গেলো চঞ্চল মনে ঘরের কাজ করছেন। যুবকরা কাজ করছেন খামারে। গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলছে সৌরবিদ্যুতের বাতি। এ যেন অচেনা এক পরিবেশ। আমার মনে হয় এ পরিবর্তন শুধু এ গ্রামেই নয়, বাংলাদেশের অন্য গ্রামগুলোরও মোটামুটি একই চিত্র। কোনো গ্রামে বেশি, কোনোটায় কম। শহর-গ্রামে যে পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার জো নেই। সেদিকে যেতে চাই না। গ্রামীণ অর্থনীতির যে পরিবর্তন হচ্ছে, সেটাই বলতে চাই। এ পরিবর্তনে অবদান কার? অনেকে হয়তো বলবেন সরকার বা সংশ্লিষ্ট মহলের। আবার অনেকে বলতে চাইবেন, বেসরকারি উদ্যোক্তা বা এনজিওর।

এ গ্রামের বেশ কয়েকজন যুবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন মুরগি, হাঁস, গরু ও মাছের খামার। সবজি চাষেও পেয়েছেন সফলতা। এদের মধ্যে এক যুবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো তার খামারের কথা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছুটেছেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হতাশ হয়ে দিন পার করছিলেন। মাঝে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টাও করেছিলেন। সেখানেও সফল হতে পারেননি। শেষে পাশের গ্রামের এক বন্ধুর পোলট্রি খামার দেখে নিজে করার চিন্তা করেন। কিন্তু খামার করার মতো অর্থ নেই। চিন্তায় পড়েন, কী করবেন। পড়ালেখা শিখে পোলট্রি খামার করবেন এ নিয়েও ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্ব। তার ওপর নেই পুঁজি। চিন্তা আরও গভীর হয়। বাবার কাছ থেকে টাকা নেবেন, সেটাও নেই। কিন্তু কিছু একটা করতে হবে, এটাই ছিল তার ভাবনা। শেষে বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু টাকা ও মাকে ধরে একটি এনজিওর কাছ থেকে কিছু ঋণ নিয়ে তার যাত্রা। প্রথমে এ পথচলা মসৃণ ছিল না। পড়তে হয়েছে অনেক সমস্যায়। তিনি ছোট খামার করার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ নিতে চেয়েও পাননি। শেষে হতাশ হয়েছেন। কিন্তু আজ তার পোলট্রি খামার রয়েছে। পাশাপাশি করেছেন গরুর খামার। গ্রামে তাকে সফল খামারি হিসেবে সবাই চেনেন। তার খামারে বেশ কয়েকজন কাজ করছেন। তার দেখাদেখি অনেকেই ছোট ছোট খামার গড়েছেন।

দেশে রয়েছে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্তসহ উল্লেখ করার মতো বেসরকারি ব্যাংক। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি ব্যাংক এ শিক্ষিত যুবকদের ঋণ দিতে চায় না কেন? এ অভিযোগ অনেকেরই। কেন তারা ক্ষুদ্রঋণ বা ছোট খামার করার জন্য সহজে ঋণ দিতে চায় না, এর জবাব কী দেবে এসব ব্যাংক কর্তৃপক্ষ? উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ব্যাংকগুলো এসএমই ঋণ দিয়ে থাকে। তাহলে এ ধরনের ঋণ কারা পাচ্ছেন? যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এ ধরনের সহজ প্রসেসে কম সুদে ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে অসংখ্য খামার গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশে বেকার কমে যাবে। অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে যাবে। তবে কিছু ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে, তা উল্লেখ করার মতো নয়। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। যমুনার পূর্ব পাশে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিস্তার আর পশ্চিম পাশে রয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। ব্যাংক দুটি কৃষিতে অবদান রাখবে এমন ধারণা সবার। প্রশ্ন হলো, কৃষিক্ষেত্রে এ ঋণ কারা পাচ্ছেন? সবচেয়ে বড় বিষয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেশি। আমার জানা নেই কতজন কৃষক খেলাপি? অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা ঘুষ-বাণিজ্যের কারণে অন্য খাতে ঋণ দিচ্ছেন। আর কৃষকরা হচ্ছেন বঞ্চিত। কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার কৃষকের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তার সুফল তারা কতটুকু পাচ্ছেন, এটাও ভাবার সময় এসেছে। যারা এ খাতে দুর্নীতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্টরা এটা গুরুত্ব দিয়ে ভাববে, আশা রাখি।

দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছে। কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এসে দেশের উন্নয়ন দেখে অভিভূত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের মডেল বলেও উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশবিষয়ক দূত রুশনারা আলী ঢাকায় এসে আমাদের উন্নয়নে ব্রিটেন কাজ করবে বলে জানান। তিনি আশা করেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে তার দেশের সরকার সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের প্রায় সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে বলেও সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বলা যায়, উন্নতি হয়েছে উন্নয়নের সিংহভাগ সূচকে। স্বাধীনতার সময় দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে আজকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। সরকার বা রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা বলে আসছেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এ কথা সত্য, দেশে অবকাঠামোগত বেশ উন্নয়ন হয়েছে। শহর বন্দর গ্রামের রাস্তাঘাট পাকা হয়েছে। বিদ্যুৎসেবা গ্রামীণ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অনেক গ্রামের মানুষ শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে। শিক্ষাক্ষেত্রেও উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশ আজ রোল মডেল। অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ অনুসরণ করছে। এ প্রাপ্তি কম কিসে। যুবকরা যে কোনো দেশের সম্পদ, তা দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে। দেশের যুবসমাজকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। তাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হবে। তা না হলে এ যুবসমাজ ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। যদি এদের কাজে না লাগানো যায়, সেক্ষেত্রে এই শ্রেণি মাদক, সন্ত্রাস বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। তা দেশের অভিশাপ হয়ে পড়বে। দেশের অর্ধেকেরও বেশি নারী। উন্নত দেশগুলোর নারীরা কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে করপোরেট জগতে। বাংলাদেশেও করপোরেট চাকরিতে নারীদের এখন চোখে পড়ে। তবে এ সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশ কম। আর গ্রামীণ নারীরা গৃহস্থালির কাজ করে থাকেন। তবে অন্য পেশায় নারীর পদচারণ উল্লেখ করার মতো নয়। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানো যেতে পারে। যাতে সমাজে তারা মাথা উঁচু করে চলতে পারে। নারীর ক্ষমতায়নে তাদের কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই। তাই গ্রামীণ নারীর আরও কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেকের অভিযোগ রয়েছে যে, এটা কর্মবান্ধব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষামান ও কারিকুলাম নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়। মেধার মূল্যায়ন হয় না। তাই শিক্ষাক্ষেত্রের এ দুরবস্থা। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন করা যায় কি না, এ নিয়েও ভাবার সময় এসেছে মনে হয়।

কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। দক্ষ জনবল তৈরির জন্য কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। তবে এ শিক্ষাব্যবস্থাও নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, এ ক্ষেত্রেও সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। সরকার বেকার যুবকদের কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে থাকে। এ প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে সঠিকভাবে কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে। বেকারদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোর ফল শহরের স্কুল-কলেজগুলোর তুলনায় ভালো নয়। এর কারণও রয়েছে। গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধাবী শিক্ষকরা থাকতে চান না। তাই ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য ভালো শিক্ষকদের গ্রামীণ এলাকায় চাকরিতে থাকার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও অনুরূপ অভিযোগ রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসকদের থাকাটা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছেন। এ নিয়ম না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। শুধু ঘোষণা নয়, এ জন্য সরকারকে আরও আন্তরিক হতে হবে।

গ্রামীণ অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যুবসমাজকে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারে। গ্রামীণ সমাজে নারীর কাজকে তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বিকাশ ঘটানো যেতে পারে। যাতে সহজেই গ্রামীণ নারীরা কাজ করতে পারেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। গ্রামীণ পর্যায়ে আইটি খাতেরও বিকাশ ঘটাতে হবে। এ জন্য বিদ্যুতায়ন করে ইন্টারনেট সেবার প্রসার ঘটাতে হবে। যাতে ঘরে বসেই যুবকরা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করতে পারেন। বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে। এ জন্য গ্রামের নারীদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। যাতে তারাও আউটসোর্সিংয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। গ্রামীণ উন্নয়নে বেশ কিছু এনজিও কাজ করছে। এক্ষেত্রে এনজিও, সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে এমনটাই প্রত্যাশা।

 

সাংবাদিক