মত-বিশ্লেষণ

গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী

মিজানুর রহমান পলাশ: বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় তিন সন্তানকে রেখে স্বামী মারা যাওয়ার পর মানিকগঞ্জের বরঙ্গাইল গ্রামের রোকেয়া বেগম দু’বেলার খাবার জোটাতে শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হন। এর পর থেকে মাটি কাটা, ইটভাটা ও কৃষিশ্রমিকের কাজসহ যাবতীয় কাজই তিনি করেন যখন যে কাজের সুযোগ পান। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও নারী বলে পুরুষের সমান মজুরি পান না। তারপরও কাজ করেন, কারণ এক দিন কাজ না করলে পরিবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। শুধু রোকেয়া বেগম নন, তার মতো দেশের সব নারী শ্রমিকের অবস্থা প্রায় একই রকম।

পারভীন আক্তারের বাড়ি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পাচুটিয়া গ্রামে। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে উঠান ঝাড়– ও থালাবাসন ধোয়ার কাজ দিয়েই শুরু হয় তার প্রতিদিনের কাজ। রান্নাবান্না থেকে ঘরের কাজ, সব সদস্যকে খাবার পরিবেশন, কাপড় ধোয়া, হাঁস-মুরগির খাবার দেওয়া, তারপর সন্তানকে স্কুলে পাঠানোসহ অন্যান্য টুকিটাকি কাজও করতে হয় তাকে। তিনি কৃষিকাজেও সহায়তা করেন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের। একান্নবর্তী পরিবার, সদস্যসংখ্যা ১৫। কখন যে বেলা গড়িয়ে যায়, টের পান না পারভীন। রাতে সবার খাওয়া শেষ হলে তার খাওয়ার পালা। অনেক দিন তরকারিও জোটে না। ঘুমোতে ঘুমোতে গভীর রাত হয়ে যায়। এভাবেই দিন কেটে যায় পারভীন আক্তারের। পরিশ্রম বেশি হলেও সংসারে অভাব না থাকায় স্বামী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে যৌথ পরিবারে সুখেই আছেন তিনি।

আমাদের দেশের প্রায় সব গ্রামীণ নারীই ঘরে-বাইরে মিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু নারীর এ কাজের স্বীকৃতি নেই বললেই চলে। দেশে নারী দিবস শতবছর পার করলেও এখনও বহু দেশে শ্রমের স্বীকৃতি মেলেনি গ্রামীণ নারীর। এ কারণে ঘরে-বাইরে নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। নারীর ঘরের কাজের কোনো পারিশ্রমিক নেই, নেই কোনো মূল্যায়ন। তাদের এ কাজকে পরিবারে অদৃশ্য অবদান মনে করা হয়। তাদের এ কাজের পারিশ্রমিক থাকলে হয়তো নারী নির্যাতন ও বৈষম্য দু’টোই কমে যেত।

অর্থনৈতিক কাজে গ্রামীণ নারীর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৫ অক্টোবর পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস’। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কৃষিকাজসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে নারীর ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও তাদের সেই কাজকে স্বীকৃতি আর পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হয় না। ‘আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস’ সম্পর্কে জানে না বেশিরভাগ গ্রামীণ নারী। এ দিবস নিয়ে প্রচারণাও খুব একটা নেই। গ্রামীণ নারী শুধু জানে ভোর থেকে মাঝরাত অবধি কাজ করতে হবে, সন্তান ও সংসার সামলাতে হবে।

মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ‘নারী’। একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান সভ্যতার অগ্রযাত্রায় গ্রামীণ নারীর অবদান বিশাল। সভ্যতা ও উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে নারী তার অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। সভ্যতার যত উন্নতি হচ্ছে, নারীর অংশগ্রহণ ততই বাড়ছে। একসময় ঘরের বাইরের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ তেমন ছিল না। ঘরের বউ বাইরে কাজ করবে, তা সমাজও ভালো চোখে দেখত না। কিন্তু আজ সমাজব্যবস্থা আর মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। দেশের উন্নয়নে গ্রামীণ নারীর অবদানও চোখে পড়ার মতো। এ দেশের পারিবারিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পেছনে মূল অবদান রয়েছে তাদের। তারা অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে পারিবারিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখে। পরিবারকে সুশৃঙ্খলভাবে এক সুতায় গেঁথে রাখার পেছনে মূল ভূমিকা নারীরই।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যে দেশ যত বেশি উন্নত, সে দেশের নারী তত বেশি সচেতন ও কর্মঠ। আমাদের দেশেও নিজেদের যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে তারা স্থান করে নিয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। দেশের অর্থনীতি যে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে, তার পেছনেও রয়েছে তাদের অবদান। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে জনসংখ্যার বিরাট অংশ তাদের অক্লান্ত শ্রমের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। শহুরে নারী অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও গ্রামীণ নারী আজও সেগুলো থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ নারীর অবদানকে স্বীকৃতি ও মর্যাদাদান এবং তাদের মধ্যে আরও উৎসাহ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস পালন করা হয়ে থাকে।

১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের চতুর্থ নারী সম্মেলনে ১৫ অক্টোবরকে বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করা হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড উইমেন সামিট ফাউন্ডেশন দিবসটি পালনের জন্য সব দেশকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীর ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে ২০০৭ সালের ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে জাতিসংঘভুক্ত সব সদস্য রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

নারী এখন নিজেরাই আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিচ্ছে। গবাদি পশু পালন, বাড়ির উঠানে বা পরিত্যক্ত জমিতে শাকসবজির চাষ, ফলদ বৃক্ষ রোপণ এবং আবাদি জমিতে ফসল ফলিয়ে এখন বহু গ্রামীণ নারী স্বাবলম্বী। কেউ আবার বাড়ির পাশের ছোট পুকুরে মাচা তৈরি করে ওপরে হাঁস-মুরগি নিচে মাছ চাষ করছেন। কেউ প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং কুটিরশিল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হচ্ছেন। আর্থিক উন্নয়নের ফলে এসব নারী নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন এবং সংসারের উন্নতির জন্য আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন স্বামীকে।

মানবসভ্যতায় কৃষির সূচনা ও বিকাশ ঘটেছে নারীর হাত ধরেই। কৃষক যখন তার উৎপাদিত ফসল বাড়িতে নিয়ে আসে, তার পরের পুরো দায়িত্বই নারীর হাতে। তার পরও কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে নারীর অবদানকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হচ্ছে না, যদিও বর্তমান সরকার কৃষকের পাশাপাশি কিষানি কার্ড বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষিকাজে নিয়োজিত নারীর দাবিÑনারীকে শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করে সব নারীকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নারীকে কিষানি কার্ড দেওয়া হলে কৃষিঋণ ও কৃষকের জন্য দেওয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো গ্রামীণ নারীও পাবে। সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ এক কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী, যার ৬৮ শতাংশ কৃষি, পোলট্রি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী নিয়োজিত আছে কৃষিকাজে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের উন্নয়নের বিশ্বখ্যাতি অর্জনের পেছনে আজকের গ্রামীণ নারীর ব্যাপক অবদান রয়েছে। শুধু কৃষক হিসেবে নয়, গার্মেন্ট সেক্টরে নারী কর্মী ও প্রবাসে নারী কর্মী দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। নারীর এসব অর্জন কেবল বর্তমানেই হচ্ছে তা নয়, আবহমান কাল ধরেই দেশের অর্থনীতিতে নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিকের কাজের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। তাদের জন্য নেই পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা। এমনকি নারী শ্রমিকের ছোট সন্তানের জন্য নেই মাতৃদুগ্ধ পানের ব্যবস্থা।

অশিক্ষা আর সচেতনতার অভাবেই গ্রামীণ নারী অধিকারবঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করে নারী সংগঠনগুলো। তাই শিক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ নারীর সচেতনা বৃদ্ধি ও আত্মকর্মসংস্থানের জন্য দরিদ্র অসহায় নারীকে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা সরকারের উদ্দেশ্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ নারী স্বাবলম্বী হচ্ছে। এ প্রকল্পে উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ৪৬ লাখ ৭০ হাজার। ঋণ গ্রহণকারী উপকারভোগীর সংখ্যা ৩৪ লাখ ২১ হাজার জন। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে আয়বর্ধক কাজ করে পরিবারে সচ্ছলতা আনছে নারী। ‘প্রতিটি গ্রাম হবে শহর’ প্রধানমন্ত্রীর এ নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গ্রাম উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে সরকার এবং গ্রামীণ নারীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

সৃষ্টির সহজাত ধারায় নারী-পুরুষের মধ্যে মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য নেই। তারপরও নারীকে যুগে যুগে বঞ্চিত করা হয়েছে প্রাপ্য অধিকার থেকে। শিক্ষাদীক্ষা ও নৈতিকতার বীজ বপিত হয় পরিবারে নারীর হাতে। আর সেই বীজ থেকে মহিরুহ হয়ে ওঠে মানুষ কোনো মমতাময়ী নারীর যতœশীল ছোঁয়ায়। নারীই সমাজের উন্নয়ন ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তারাই গ্রামীণ অর্থনীতির মূল কারিগর।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..