মত-বিশ্লেষণ

গ্রামীণ শীতকাল

পাঠকের চিঠি

বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবরের শেষের দিকে একটু কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয় পরিবেশ। তারপর হালকা ঠাণ্ডাও অনুভূত হতে থাকে। নভেম্বরের শেষের দিকে পুরোদস্তুর ঠাণ্ডা পড়ে। ঘাসের ওপর শিশির জমে। শীতের শুরুতে ধান কেটে গোলায় তুলেন চাষিরা। চারদিকে নতুন ধানের গন্ধ। একটু হালকা হালকা শীত। নভেম্বরে ধান কাটা হয়ে গেলে ফসলের জমিগুলো অধিকাংশই ফাঁকা থাকে। আবার কেউ কেউ ধান বাড়িতে নিয়ে গেলে সেই খালি জমিতে নানারকম শীতকালীন সবজি চাষাবাদ শুরু করে দেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লালশাক, মুলা বেগুন, লাউ, কুমড়া কিংবা কেউ কেউ দেশি শসা চাষাবাদ করে থাকেন। এই মৌসুমে কৃষকদের উৎসবমুখর সময় কাটে। সবজির দেখাশোনা করা। সাতসকালে সবজি বাজারে নিয়ে বিক্রি করা। দারুণ ব্যস্ত সময় কাটে গ্রামীণ কৃষকদের। আর যেসব জমিতে শীতকালীন সবজি চাষ হয় না। তাতে ছেলেমেয়েরা খেলার উপযোগী করে নানা ধরনের খেলার আয়োজন করে। যেমনÑগোল্লাছুট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, হাডুডু, মৌমাছি খেলা। তার মাঝে সম্প্রতি সময়ে গ্রামে শীতকালে জনপ্রিয় খেলা শর্টপিচ ক্রিকেট। তরুণরা টুর্নামেন্ট আয়োজন করে এ খেলা খেলে থাকেন। এ-পাড়া বা পাশের পাড়ার সঙ্গে খেলা। অথবা এ-গ্রাম ওই গ্রামের সঙ্গে খেলা। এই শর্টপিচ ক্রিকেটে জাতীয় পর্যায়ের দেশীয় লিগের চেয়ে কোনো অংশে উত্তেজনা কম থাকে না। এরকম অনুষ্ঠানে ইউপি মেম্বার থেকে শুরু করে মন্ত্রীর সচিব পর্যন্ত আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন। এলাকার সম্মানীয় লোকরা পুরস্কার ও বিতরণ করে থাকেন। সবার ঘরে ঘরে নতুন ধান থাকে। ওই ধান থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াতে শীতকালীন রং-বেরঙের পিঠা বানিয়ে থাকেন দাদি-চাচিরা। ডিসেম্বরে যখন পুরোদমে শীত পরে, তখন খেজুর রস পাওয়া যায় গাছে। গাছি গাছ থেকে রস আহরণ করে মালিকদের বুঝিয়ে দেন। তবে সম্প্রতি খেজুরের কাঁচা রস খুব একটা পাওয়া যায় না। বাজারের ভেজাল গুড় খেয়ে চাহিদা মেটাতে হয়। ছোটবেলায় রাতে খেজুরের কলস রস চুরি করার স্মৃতি ভুলার নয়। খেজুরের কাঁচা রসের কথা ভাবতেই রসনায় জল চলে আসে। কাঁচা রস চুলায় অনেক সময় দরে আগুনে ঝাল দিয়ে খেজুর গুড় বানানো হতো। এই খেজুর গুড় দিয়ে ভাপা পিঠা খাওয়া লোভজনক ও সুস্বাদু। তবে এখন কাঁচা রস পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। তবে যশোরের দিকে এখনও পাওয়া যায়। শীতের দুপুরে গোসলের আগে গ্রামের দুষ্ট ছেলেরা হাডুডু খেলে থাকে পুকুর পাড়ে। শীতের সময় পুকুর বা দিঘির পানি কমে যায়। ওই পানি কমে যাওয়া অংশে অনেকে ধানবীজ লাগান আবার কেউ কেউ শীতকালীন সবজি চাষ করেন। শীতের সন্ধ্যায় গ্রামের মুরব্বিরা চাদর বা শাল পরিধান করে থাকেন। রাত যত গভীর হয় শীতের তীব্রতা আরও প্রকট হয়। গাছের পাতা থেকে টুপ টুপ করে টিনের চালে পড়া পানির শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়। রাতে উঠতি বয়সের তরুণরা ব্যাডমিন্টন খেলার আয়োজন করে থাকে। এ সাধারণত একটা বিদ্যুতের খুঁটির আশপাশেই হয়ে থাকে। যাতে করে সহজে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। যদিও এভাবে বিদ্যুৎ নেওয়া আইনত অপরাধ। খেলার নেশায় আমরা অপরাধ সহজেই করে থাকি। নভেম্বর এ সময়ে পরীক্ষা প্রায় শেষ হয়ে যেত। তরুণ-তরুণী ঈদের দিনের মতো এদিনগুলো কাটাত। এ বছরের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। করোনা সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। এ বছর স্কুল-মাদরাসা মার্চ মাস থেকে বন্ধ। শহর থেকে গ্রামের সব শিক্ষার্থীই নিজের বাসাবাড়িতে সময় কাটিয়েছেন। শত বিপদেও গ্রাম একটু নিরাপদ। প্রতি বছরের মতো এ বছরের গ্রামের ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব হোক। চাষিরা ফসল চাষ করে লাভবান হোক। কোমলমতি শিশু-কিশোররা গ্রামীণ খেলায় মজে থাকুক।

তাসনিম হাসান মজুমদার

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..