প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গ্রামে কর্মসংস্থান হলে শহরমুখী মানুষের স্রোত কমবে

মোতাহার হোসেন: কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখেছিলেন: ‘রাতে মশা দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকাতায় আছি।’ কালের বিবর্তনে প্রযুক্তি আর উন্নয়নের বদৌলতে অনেক কিছুই বদলে গেছে। কিন্তু ওই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা রাজধানী ঢাকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বরং এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জীবিকার সন্ধানে গ্রাম থেকে মানুষ আসছে ইট, কাঠ, কংক্রিটের এ নগরীতে। বানের পানির মতোই এখন শহরমুখো মানুষের জনস্রোত বইছে। ফলে রাজধানীতে বসবাসরত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন সমস্যায় ফেলছে। এ স্রোত ঠেকানো না গেলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে রাজধানী। তখন পরিবেশ, প্রকৃতি, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নানা সমস্যায় পড়বে ঢাকাবাসী। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে বলা হয়, গ্রাম থেকে শহরমুখো হচ্ছে মানুষ। এ কারণে রাজনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক ঝুঁকির সঙ্গে প্রকৃতিগতভাবে বহুবিধ সমস্যা দেখা দেবে। বিশেষ করে ভূমিধস, অগ্নিকাণ্ড, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, পরিবেশদূষণের মতো সংকট যুক্ত রাজধানীবাসীর জীবনে।

মানুষ বাড়ছে শহরে, বাড়ছে সংকট। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যুক্ত হচ্ছে নানা সমস্যা। মানুষ বহুবিধ কারণে শহরমুখো হচ্ছে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙনে জমি, বসতভিটা ও ফসল হারিয়ে পৈতৃক ভিটেবাড়ি ছেড়ে শহরে আসছে মানুষ। আবার অনেকে আসছে কাজ, অন্ন ও আশ্রয়ের সন্ধানে। আবার কেউ কেউ আসছে ছেলেমেয়ের পড়ালেখার সুবিধার্থে, কেউ নিরাপত্তার জন্য, কেউ আরামদায়ক জীবনের আশায় গ্রাম ছাড়ছে। এভাবে অনেকেই নানা প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটছে।

বিবিএসের প্রতিবেদনে গ্রাম ছাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বিয়ে, উন্নত শিক্ষা, কাজের সন্ধান, চাকরিসূত্রে বদলি, বন্যা, নদীভাঙন, ব্যবসা, পরিবারের সঙ্গে বসবাস, অবসর কাটানোকে।

সম্প্রতি প্রকাশিত মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসবি) প্রকল্পের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী মানুষের হার ছিল হাজারে ৩০ দশমিক তিন জন, যা আগের বছর ছিল ২৯ দশমিক ৫। ২০১৪ সালে এ হার ছিল ২৮ দশমিক ২। ২০১৩ সালে ছিল ২৭ দশমিক ২। ২০১২ সালে ছিল ২৬ দশমিক ২ ও ২০১১ সালে ছিল ২৩ দশমিক ৭। এছাড়া শহরের মানুষের সঙ্গে গ্রামের যোগাযোগও বেড়েছে। ২০১৬ সালে প্রতি হাজারে শহরের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৩ জনে, আগের বছর ছিল ৯০। পাঁচ বছর আগে ২০১২ সালে এ হার ছিল ৬৯ দশমিক ৭।

আগে জীবিকার তাগিদে মানুষ শহরে এলেও এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। উন্নত জীবনের তাগিদেও শহরে পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা ও নাগরিক জীবনের আরাম-আয়েশের কথা চিন্তা করেই শহরের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। এ অবস্থায় জনসংখ্যার ভারে নু্যুব্জ হয়ে পড়ছে শহরগুলো। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। শুধু উন্নত নাগরিক জীবনের জন্যই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগও গ্রাম ছাড়ার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও ঢাকামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কমিয়ে গ্রামপর্যায়ে উন্নয়ন ছড়িয়ে দিতে হবে। তাছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সব কিছুরই বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। দেরি হয়ে গেলে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্য শহরে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হবে। তাছাড়া গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটানো, নতুন কর্মসংস্থান করতে পারলে শহরমুখী মানুষের চাপ কমবে।

অবশ্য মানুষের জায়গা বদলের এ ধারার বিপরীত চিত্র যে নেই, তা নয়। শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হওয়ার প্রবণতা গত পাঁচ বছরে কমেছে। বিবিএসের নমুনা জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে শহর ছেড়ে গ্রামমুখী মানুষের সংখ্যা হাজারে ছিল পাঁচজন, যা আগের বছর ছিল ৫ দশমিক ১। ২০১৪ ও ২০১৩ সালে ছিল ৫ দশমিক ১ করে। কিন্তু ২০১২ ও ২০১১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৩। বিবিএস ১৯৮০ সাল থেকে দৈব পদ্ধতিতে জš§, মৃত্যু, বিয়ে ও স্থানান্তরসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে। শুরুতে নমুনা এলাকার সংখ্যা ছিল ১০৩টি। বর্তমানে দুই হাজারের বেশি নমুনা এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। জরিপ বলছে, গ্রাম থেকে গ্রামে স্থানান্তরের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে হাজারে স্থানান্তরের এ সংখ্যা ছিল ৩৪ দশমিক ৫, যা ২০১৫ সালে ছিল ২৫ দশমিক ৬। ২০১৪ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৩। ২০১৩ সালে ২৬ দশমিক ৬, ২০১২ সালে ১৬ দশমিক ২ ও ২০১১ সালে ছিল ১৫।

এদিকে শহর থেকে শহরে স্থানান্তরের হারও বেড়েছে। ২০১৬ সালে হাজারে এ সংখ্যা ছিল ৯২ দশমিক ৬, যা ২০১৫ সালে ছিল ৬০ দশমিক ৫। ২০১৪ সালে ছিল ৪৮ দশমিক ৯। ২০১৩ সালে ছিল ৪০ দশমিক ৯, ২০১২ সালে ছিল ৪৩ দশমিক ৫ ও ২০১১ সালে এ হার ছিল প্রতি হাজারে ৪২ দশমিক ৫ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্বিকভাবে দেশের বাইরে যাওয়ার হারও বেড়েছে। ২০১৬ সালের জরিপ বলছে, বহির্গমন হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ৫ জনে, যা ২০১৫ সালে ছিল ৫৪ দশমিক ৪। ২০১২ সালে ছিল ৪১ দশমিক ৯। তবে শহর থেকে দেশের বাইরে যাওয়ার হারও বেড়েছে। ২০১৬ সালে হাজারে এ সংখ্যা ছিল ১১৭ দশমিক ২, যা ২০১২ সালে ছিল ৬৯। গ্রাম থেকে বাইরে যাওয়ার এ হার ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৫, যা ২০১২ সালে ছিল ২৩ দশমিক ৫।

এক-দেড় শতক আগে নগরের ‘ঝুঁকি’ বলতে মশা-মাছি ও তা থেকে ছড়ানো ডায়রিয়া, কলেরা কিংবা ম্যালেরিয়ার মতো রোগই ছিল নগরবাসীর প্রধান শত্রু। তখন গ্রামাঞ্চলে নানা রোগ থাকলেও, মশার উপদ্রব ছিল না বললেই চলে। এখন গ্রামেও মশার প্রবল পরাক্রম। ঢাকার মতো শহরে যুক্ত হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পের মতো ঝুঁকি। রয়েছে পানিবাহিত নানা রোগ।

লন্ডনভিত্তিক সংস্থা ভেরিসক ম্যাপলক্রাফট ঢাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় রেখেছে। প্রথম ১০০ শহরের প্রধান শত্রু প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, সুনামি, আগ্নেয়গিরির অগুœ্যুৎপাত, ভূমিধসসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কথা বলছে সংস্থাটি। মানবসম্পদ বিষয়ে বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য মারকারস বসবাসযোগ্য নগরীর যে ক্রমবিন্যাস করে থাকে, তাতে কয়েক বছর ধরে ঢাকার অবস্থান তলানির দিকেই। সর্বশেষ ২২১টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ২০৬তম। ৪০০ বছরের পুরোনো এ শহরের কেন এ অবস্থান, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র ২০০ বছর আগেও ইংরেজ শাসনামলে ঢাকা ছিল বিশ্বের দ্বাদশতম সুন্দর নগরী। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জনজটে ঢাকাকে বর্তমান অবস্থানে এনেছে। অথচ কোনো জনপদের পাশে নদী থাকলে নগরবিদরা সেটাকে ‘সৌভাগ্যবান নগরী’ বলে থাকেন। ঢাকার চারপাশেই নদী ছিল। কিন্তু আমরা এ সৌভাগ্যকে পায়ে ঠেলে নদীগুলোকে প্রায় মেরে ফেলছি। সেগুলো পরিণত হয়েছে এখন ভাগাড়ে। ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তা দৃশ্যমান হয়নি এখনও। প্রত্যাশা থাকবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলক শহরমুখো মানুষের স্রোত ঠেকাতে গ্রামে বিশেষ করে উপজেলা, জেলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেবেন। একইভাবে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে উন্নত মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, উন্নত মানের চিকিৎসাব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ প্রভৃতি। এসব যত দ্রুত করা সম্ভব হবে, ততই দেশ ও জাতির মঙ্গল।

 

সাংবাদিক

motaherbd123Ñgmail.com