প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

গ্রাম জেলা অর্থনৈতিক শুমারি-১৩: ৮৮% ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক

 

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বাণিজ্যিক রাজধানী নামে পরিচিত বন্দর শহর চট্টগ্রামে মুদি দোকান থেকে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানার ৮৮ শতাংশ ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক। প্রতি দশকে বাড়ছে এর হার। তবে এক সময় উৎপাদন খাতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলে কয়েক বছরের ব্যবধানে কমছে এ হার। সম্প্রতি প্রকাশিত চট্টগ্রাম জেলার অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ এ তথ্য ওঠে এসেছে।

এ শুমারিতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত চিত্র ওঠে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় ২০১৩ পর্যন্ত মোট ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৮২ হাজর ৬৩০টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একক ব্যক্তি ও পারিবারিক মালিকানায় আছে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৩টি, যা শতাংশ হিসেবে ৮৮ শতাংশই ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক।

এ পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, অংশীদারির মালিকানায় আছে চার হাজার ৭০৭টি, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি আছে ১০ হাজার ৫৩টি, পাবলিক লিমিটেড ৯১২টি, সরকারি ও আধা-সরকারি মালিকায় আছে তিন হাজার ৪০৪টি, বিদেশি মালিকানায় আছে ২২৬টি,  সমবায়ভিত্তিক ৭২০টি, অলাভজনক ছয় হাজার ৯২৩টি, প্রবাসী মালিকানায় আছে ৮১টি ও অন্যান্য মালিকানায় আছে ছয় হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ অংশীদারিভিত্তিক মালিকানায় আছে এক দশমিক ৬৭ শতাংশ, প্রাইভেট লিমিটেড তিন দশমিক ৫৬ শতাংশ, পাবলিক লিমিটেড শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ, সরকারি ও আধা-সরকারি মালিকায় এক দশমিক ২০ শতাংশ, বিদেশি মালিকানায় আছে শূন্য দশমিক আট শতাংশ, সমবায়ভিত্তিক শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, অলাভজনক দুই দশমিক ৪৫ শতাংশ, প্রবাসী মালিকানায় শূন্য দশমিক শূন্য তিন শতাংশ ও অন্যান্য মালিকানায় আছে দুই দশমিক ২০ শতাংশ।

একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সব খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা ও গাড়ি মেরামতের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি, এক লাখ ৯৬ হাজার ৯৮৪টি। এ হার মোট প্রতিষ্ঠানের ৫১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার পরে আছে উৎপাদনমুখী খাত। এ সংখ্যা ৫৮ হাজার ৬২০টি (১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ)। এর পরই আছে হোটেল ও রেস্তোরাঁ, সংখ্যায় ৩৫ হাজার ৭৪৪টি (৯ দশমিক ৩৯টি)। পরিবহন ও সংরক্ষণাগার খাতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার (৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ)।

অর্থনীতিবিদ ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মুহাম্মদ সিকান্দর খান বলেন, বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে বিভিন্ন শিল্পের অসামান্য উন্নয়নের মূলে রয়েছে বেসরকারি খাতে এ শিল্প স্থাপন ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত ভূমিকা। যার প্রমাণ চট্টগ্রাম জেলা অর্থনৈতিক শুমারিতে সার্বিকভাবে ফুটে উঠেছে, যা শিল্পের লক্ষণীয় প্রবৃদ্ধিরই প্রমাণ। চট্টগ্রামের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই পরিবারভিত্তিক প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে গঠিত যার ফলে এদেশে গোষ্ঠীগত শিল্পোদ্যোগ ধারণার বিকাশ লাভ করেছে। পাশাপাশি শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে পরিবারে অন্যান্য সদস্যরা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মাধ্যমে শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা ব্যবহার করে এ জেলায় শিল্পকারখানার সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা ছিল। কারণ, এ জেলা থেকে বন্দর দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে তা রফতানি করা যায় সহজেই। সব প্রকারের ভারী শিল্পের সূচনা হয়েছিল এ চট্টগ্রাম থেকে। অথচ সময়ের পরিক্রমায় একে একে বন্ধ হয় ইস্পাত কারখানা, পাটকল, কেমিক্যাল কারখানা, চামড়া প্রক্রিয়াজাত কারখানা। ধীরের ধীরের করছে পোশাক কারখানা। পোশাকশিল্পেরও সূচনা হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে।

তবে অন্যান্য খাতের তুলনায় উৎপাদনমুখী খাতের হার বেশি বাড়েনি। অর্থনৈতিক শুমারিতে উৎপাদনমুখী খাতের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনমুখী খাতের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আবার ৭৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান গ্রামে। শহরে (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা সদর) এ খাতের প্রতিষ্ঠানের হার ২৭ শতাংশ। উৎপাদনমুখী খাতের ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই কুটিরশিল্প, যেগুলোর স্থায়ী সম্পদ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। চট্টগ্রামে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৭৪টি। পাশাপাশি বাড়ছে পাইকারি ও খুচরা পণ্য বেচাকেনায় এ অঞ্চলের মানুয়ের অংশগ্রহণ। সম্প্রতি প্রকাশিত চট্টগ্রাম জেলার অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ এ তথ্য ওঠে এসেছে।

চট্টগ্রাম ওমেন চেম্বারের পরিচালক ও নারী উদ্যোক্তা নুজহাত নেওরী কৃষ্টি বলেন, বাংলাদেশের শিল্পদ্যোক্তা উন্নয়েনের ইতিহাসে একটি ইতিবাচক দিক হলো পরিবারের চার দেয়ালের গন্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। শুরুর দিকে নারীরা গৃহস্থলি কাজের অতিরিক্ত কাজ যেমন ফাস্টফুড, বুটিকশপ এবং বিউটি, দুগ্ধজাত দ্রব্যাদির মতো ক্ষুদ্র ব্যবসার বিউটি পার্লারের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের মধ্যে সীমিত রাখলেও আজকাল নারীরা অনেক অভিজাত এবং চ্যালেঞ্জিং শিল্প কর্মকাণ্ডে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করছে এবং সফলতার সঙ্গেই পুরুষের মতোই শিল্পোদ্যোগ দক্ষতা প্রদর্শন করছে। আর এক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক গৃহীত শিল্পনীতিমালা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও শিল্পোদ্যোগী করে তুলতে সাহায্য করছে।