সম্পাদকীয়

গ্রাহকের বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখুন

 

গ্রাহকের হিসাবের বার্ষিক সর্বোচ্চ স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ কারণে সচেতন গ্রাহকদের মনে স্বভাবতই সৃষ্টি হবে অসন্তুষ্টি। আমাদের ধারণা, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী ও বিনিয়োগগ্রহীতারা। তাতে এ ধরনের গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় ও লেনদেনে। আমরা মনে করি, গ্রাহকের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। বস্তুত এটি কার্যকর হলে স্বল্প মেয়াদের সঞ্চয়ে উৎসে কর কাটার পর গ্রাহককে মূলধনও হারাতে হতে পারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিই শুধু বাড়বে না, সৃষ্টি হতে পারে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি। গুরুত্বপূর্ণ এ নীতি প্রণয়নে প্রয়োজনীয় হিসাব ও বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা না হলে দেশের আর্থিক খাতের জন্য এটি হয়ে উঠতে পারে বোঝা।
সন্দেহ নেই, রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় রেখেই গ্রহণ করা হয়েছে সিদ্ধান্তটি। সর্বনি¤œ ৫০ টাকার যে ধাপ প্রস্তাব করা হয়েছে, তার মাধ্যমে এ শুল্কের আওতায় আনা যাবে আরও বেশি মানুষকে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্থিতির বিদ্যমান ধাপ পুনর্বিন্যাস ও শুল্ক হার কিছুটা কমানো হলে গ্রাহকরা খুব বেশি অসন্তুষ্ট হবেন না। অবগারি শুল্ক গ্রাহকের হিসাব থেকে সমন্বয় করা হবে বছরে একবার। এ অবস্থায় তাদের মধ্যে যে ভীতি সৃষ্টি হবে, তা সহজে দূর করা যাবে না। আমাদের ধারণা, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে। আমরা চাইবো, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো ভেবে দেখা হোক।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করতে আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে দেখেছি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। বলা বাহুল্য, খাতটি ঘিরে সরকারের ভিশন বাস্তবায়নেরই অংশ ছিল ওগুলো। এ লক্ষ্য অর্জনে ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার মতো উদ্যোগও ছিল। বাস্তবতা হলো, ওইসব হিসাবে ব্যাংক চার্জ না থাকলেও তা আবগারি শুল্কমুক্ত নয়। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই সংগত কারণেই। কিন্তু এ ‘বিশেষ’ হিসাবগুলোর ব্যাপারে সংগত বিবেচনা করা না হলে তাতে সরকারের লক্ষ্য অর্জনও কঠিন হবে। এক্ষেত্রেও আমরা নীতিনির্ধারকদের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করি।
জানা যাচ্ছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চূড়ান্ত করা শুল্ক প্রস্তাবে এরই মধ্যে সই করেছেন অর্থমন্ত্রী ও সংস্থাটির চেয়ারম্যান। বাজেট বক্তৃতায় এ নিয়ে সংসদ সদস্যদের আলোচনার সুযোগ থাকবে। আমরা চাইবো, নিজেদের বক্তৃতায় তারা বিষয়টি উত্থাপন করবেন গুরুত্বসহকারে। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আন্তরিকতা দেখালে এনবিআরের চূড়ান্ত করা শুল্ক প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা অসম্ভব নয়। মনে রাখা দরকার, শুল্কভীতি সৃষ্টি করে মানুষকে আর্থিক খাতবিমুখ করা অর্থনীতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। উন্নয়নের যে ধারায় আমরা রয়েছি, একে বেগবান করার জন্য সরকারের উচিত সঞ্চয়কে উৎসাহ জোগানো ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা। আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করার জন্যও এটা দরকার। বলা বাহুল্য, অবগারি শুল্কসংক্রান্ত তথ্যগুলো অনেকের অজানা। এসব ব্যাপকভাবে প্রচার করা গেলে এ ব্যাপারে জনসাধারণের জানাবোঝা তৈরি হবে। বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব নিতে হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের। সরকারিভাবে এ ব্যাপারে প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হলে মানুষের আস্থাও বাড়বে। তাতে হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক সমন্বয়ের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সেটা অনেকটা কমে আসবে। এজন্য গৃহীত সিদ্ধান্তটি ব্যাপকভাবে প্রচারের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগও আমরা চাইব।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..