Print Date & Time : 17 April 2021 Saturday 3:32 am

‘গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় সর্বদা তৎপর বিটিআরসি’

প্রকাশ: January 25, 2021 সময়- 12:26 am

শ্যামসুন্দর সিকদার ২০১৪ সাল থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে এবং ২০১৭ সাল থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে যথাক্রমে সচিব ও সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান। ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। সম্প্রতি টেলিযোগাযোগ খাতের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হামিদুর রহমান

শেয়ার বিজ: আগামী তিন বছরের জন্য সরকার আপনাকে বিটিআরসির দায়িত্ব দিয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে তিন বছর পর প্রযুক্তি খাতে দেশকে কোথায় দেখতে চান?

শ্যামসুন্দর সিকদার: আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। ২০২১ সালের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল নতুন দশক। এ দশকই হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের। এ বিপ্লব সামনে রেখেই মেট্রোপলিটন শহর, জেলা ও উপজেলা ছাড়িয়ে দুর্গম অঞ্চলের মানুষদের দোরগোড়ায় টেলিযোগাযোগ সেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে বিটিআরসি। চলতি বছর ফাইভ-জি প্রযুক্তির নীতিমালা ও নিলাম শেষ হবে। এই প্রযুক্তির হাতে ধরেই আসবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, বিগ ডেটা ও আইওটির মতো নতুন প্রযুক্তি। বর্তমানে দেশে মোবাইল গ্রাহক প্রায় ১৭ কোটি এবং ইন্টারনেট গ্রাহক ১১ কোটির বেশি। আমি বিশ্বাস করি, আগামী তিন বছরে সারা দেশে পৌঁছে যাবে ফাইভ-জি সেবা, বাড়বে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা। মোবাইলকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের পরিধি বাড়বে। আমূল পরিবর্তন আসবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ও অর্থনীতিতে।

শেয়ার বিজ: আপনি বিটিআরসিকে যে পর্যায়ে পেলেন, এখান থেকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে কী ধরনের উদ্ভাবনী নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে?

শ্যামসুন্দর সিকদার: টেলিযোগাযোগ খাত অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি খাত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত আসছে নতুন ও উন্নত প্রযুক্তি। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে দেশে ফাইভ-জি হ্যান্ডসেটের উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামাঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেয়া এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গ্রাহককে মানসম্পন্ন সেবার নিশ্চয়তা দিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বিটিআরসি। এরই মধ্যে ইন্টারনেট অব থিংস-সংশ্লিষ্ট ডিভাইস আমদানির জন্য নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এ খাতের বিদ্যমান বিভিন্ন লাইসেন্সিং নীতিমালার আধুনিকায়নেরও কাজ চলছে।

শেয়ার বিজ: ডেটা বা সাইবার সুরক্ষায় আপনি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন?

শ্যামসুন্দর সিকদার: প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে সাইবার অপরাধের সংখ্যাও। রাজধানী ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে সাইবারসংশ্লিষ্ট অপরাধের ঘটনা। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তায় ইন্টারনেটে ব্যবহƒত কনটেন্টগুলো মনিটরিং করা হচ্ছে। সাইবার স্পেসকে আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে ভবিষ্যতে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন করারও পরিকল্পনা আছে।

শেয়ার বিজ: গ্রাহক অভিযোগ নিয়ে বিটিআরসিতে বেশ ভোগান্তি রয়েছে যেমন, অভিযোগ করলে গ্রাহকের তুলনায়  প্রতিষ্ঠানকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়, বা সমাধান পেতে দীর্ঘ সময় লাগে গ্রাহকস্বার্থ রক্ষায় আগামী দিনে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?

শ্যামসুন্দর সিকদার: গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় বিটিআরসি সর্বদা তৎপর। বর্তমানে গ্রাহকরা বিটিআরসির শর্টকোড ১০০-তে ডায়াল করে এবং বিটিআরসির মেইলবক্সের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা টেলিযোগাযোগ সেবা-সংশ্লিষ্ট নানা অভিযোগ করতে পারছে। গ্রাহকের অভিযোগ গ্রহণ করে তা সমাধানের জন্য সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের কাছে ট্রান্সফার করা হচ্ছে। অপারেটরগুলো সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে তরঙ্গ স্বল্পতা, কলড্রপ ও নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তা সমাধানে কাজ করতে অপারেটরগুলোকে বারবার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ সেলের তদারকির জন্য বিটিআরসির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি রয়েছে, যারা প্রতিমাসে অভিযোগ ও নিষ্পত্তির বিষয়গুলো মনিটরিং করে থাকেন। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে গ্রাহক অভিযোগ গ্রহণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩, আর নিষ্পত্তির হার ছিল পাঁচ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫৪। অভিযোগ নিষ্পত্তির পরিমাণ ৯৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সেবা অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরও বাড়বে এক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যয়সাশ্রয়ী করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না? করলে সেটি কেমন সময়ের মধ্যে করতে চান?

শ্যামসুন্দর সিকদার: ২০০৮ সালে প্রতি এমবিবিএস ব্যান্ডউইথের মূল্য ছিল ৭২ হাজার টাকা, যার বর্তমান মূল্য মাত্র ৩৫০ টাকা। টেলিযোগাযোগ খাতে উন্নয়নের ফলে সংশ্লিষ্ট  প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি মানসম্পন্ন টেলিকম সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে টুজি সেবার ভয়েস কলের জন্য আইটিইউ কর্তৃক ‘কস্ট মডেলিং’ করা হয়। বর্তমানে দেশে ফোরজি সার্ভিস চালু হয়েছে। এছাড়া ইন্টারনেটের চাহিদাও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টারনেট গ্রাহক বৃদ্ধির জন্য গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট মূল্য হ্রাস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। গ্রাহক পর্যায়ে ট্যারিফ হ্রাসের লক্ষ্যে সাবেমেরিন কেব্ল/আইটিসি এবং ওওএ’র ব্যান্ডউইডথের মূল্য বারবার কমানো হয়েছে। তবে, ইন্টারনেটের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জন্য সাবেমেরিন কেব্ল/আইটিসি এবং ওওএ’র ব্যান্ডউইডথ মূল্যই শুধু পরিমাপক নয়; ব্যান্ডউইডথ মূল্য ছাড়াও নেটওয়ার্ক কম্পোনেন্ট (Core network equipment, Access network equipment), ট্রান্সমিশন কস্ট (NTTN cost, Transmission equipment), বার্ষিক স্পেকট্রাম ফি, লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিংসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। বর্তমানে দেশের ডেটার মূল্য গ্রাহকের সহনীয় পর্যায়ে আছে এবং বিদ্যমান মূল্যেই যাতে গ্রাহক  মানসম্পন্ন ডেটা সেবা পায়, সে লক্ষ্যে বিটিআরসি কাজ করছে। এছাড়া ডেটা ট্রান্সমিশন খরচ নির্ধারণেও কাজ চলছে।

শেয়ার বিজ: গত কয়েক বছর থেকেই ঘাটতিপূর্ণ জনবল দিয়ে বিটিআরসি পরিচালিত হচ্ছে জনবল বাড়ানোর বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

শ্যামসুন্দর সিকদার: বিটিআরসির ঘাটতিপূর্ণ জনবল বাড়ানোর বিষয়ে এরই মধ্যে শূন্যপদে জনবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে এবং নিয়োগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে। দেশের আট বিভাগীয় শহরে বিটিআরসির বিভাগীয় অফিস চালু করার নিমিত্তে ৩২০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকারের অনুমোদনের পর পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

শেয়ার বিজ: ভ্যাট আইনে বিটিআরসিকে ভ্যাট আদায়ের ক্ষমতা দেয়া আছে তা সত্ত্বেও মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো আদালতের দোহাই দেখিয়ে আসছে বিষয়গুলো নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

শ্যামসুন্দর সিকদার: এনবিআরও চাচ্ছে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণেই থাকুক। এ বিষয়ে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অচিরেই একটি সুরাহা হতে পারে।