মত-বিশ্লেষণ

গ্রাহক প্রতিনিধিত্বহীন ঢাকা ওয়াসার লোকসান কমানোর উপায় কী?

এসএম নাজের হোসাইন: কভিডের মধ্যেও আলোচিত বিষয় ছিল ঢাকা ওয়াসা গ্রাহক পর্যায়ে পানির দাম বাড়াবে। পানির দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে ওয়াসার বোর্ড চেয়ারম্যান প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ওয়াসাকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে তারা উদ্ধার করতে চান। সে কারণে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। যদিও পরবর্তী বোর্ড সভায় প্রস্তাবটি স্থগিত রাখা হয়। কভিড মহামারির এ কঠিন সংকটে ওয়াসা বোর্ড সদস্যরা সাধারণ ভোক্তাদের সমস্যার কথা বিবেচনা করায় তাদের অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধিই কি একমাত্র সমাধান, নাকি আরও উপায় আছে?

বিশুদ্ধ সুপেয় পানি প্রাপ্তি সব নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র তার নাগরিগকদের অন্ন, বস্ত্র, খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করবে। সে আলোকে রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় জনগণের অত্যাবশ্যকীয় পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ঢাকা ওয়াসাকে। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটির সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিও সরবরাহ করতে পারে না ওয়াসা। এছাড়া পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। তবুও নিয়মিতই মুনাফা করে আসছিল ঢাকা ওয়াসা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। এর পরও গত অর্থবছরে পানির মূল্য বাড়ায় ঢাকা ওয়াসা। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেকর্ড লোকসান করেছে এ সংস্থাটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া ঢাকা ওয়াসার আর্থিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ওয়াসা মুনাফা করেছিল প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ২৯৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে সংস্থাটি। লোকসানের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, পরিচালন তথা বেতন-ভাতা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিক্রয় ও বিতরণ প্রভৃতি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি। এছাড়া সরকার থেকে গৃহীত ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। চলতি অর্থবছরও ওয়াসা লোকসান করবে বলে প্রাক্কলন করেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রাহকদের কাছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৩ হাজার ৮৩৪ কোটি ৯৬ লাখ গ্যালন পানি সরবরাহ করে ঢাকা ওয়াসা। এতে ওয়াসার রাজস্ব আয় হয় এক হাজার ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৩৫২ কোটি ২৬ লাখ গ্যালন পানি সরবরাহ করেছিল ঢাকা ওয়াসা। এতে ওয়াসার রাজস্ব আয় হয়েছিল ৯৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছর পানি সরবরাহ খাতে ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব আয় বেড়েছে ৬১ কোটি ১২ লাখ টাকা। আবার গত অর্থবছর সংস্থাটির পানি অপচয় হ্রাস পেয়েছে এক শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্থাটির পানির অপচয় হার দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ হার ছিল ১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

এদিকে গত এপ্রিলে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির দাম ১১ টাকা ৫৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা নির্ধারণ করে ঢাকা ওয়াসা। এক্ষেত্রে দাম বাড়ানো হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৩৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। দাম বাড়ে প্রায় আট শতাংশ। এর মাত্র ৯ মাস আগে অর্থাৎ গত অর্থবছর জুলাইয়ে পানির দাম পাঁচ শতাংশ বাড়ায় ওয়াসা। তবে কভিডের মাঝে পানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা হলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি।

ঢাকা ওয়াসার মূল সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নতুন প্রকল্প নিতে বেশি আগ্রহী। পানি উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবহারে ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ঘটানো হলেই লোকসান কমানো সম্ভব। কারণ ঢাকা শহরে যেখানে পানি আছে, সেখানে প্রচুর পানি অচপচয় হচ্ছে, আর যেখানে নেই সেখানে শুধু হাহাকার। কয়েক দিন আগে পুরো পানি সরবরাহ লবণাক্ত ও ঘোলাটে হয়ে পড়েছিল। ওয়াসার নীতিনির্ধারকদের হাতে সে খবর ছিল না। পরে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির কারণে কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হয়। এটাতে প্রমাণিত হচ্ছে, ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম তদারকি ও কাজের গুণগত মান উন্নয়নে কোনো তৎপরতা নেই। আর অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লস পুরোটা খামচে ধরেছে ওয়াসাকে। অনেক জায়গায় ওয়াসার পানির পাইপ থেকে বিপুল পরিমাণ পানি নিঃসরণ হয়ে স্যুয়ারেজের লাইনে চলে গেলেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ কোনো খবরই রাখে না। ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজের তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ভোক্তাদের মাঝে পানির অপরচয় রোধে সচেতনতা বাড়ানো, পানির লাইনে নিয়মিত নজরদারি ও লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ করা, পানি চুরি ও অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা গেলে বর্তমান উৎপাদিত পানি দিয়ে নগরবাসীর পানির সমস্যা সমাধান করা সম্ভব ছিল। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ওয়াসার কোনো সুনির্দিষ্ট পানি বিতরণেন পরিকল্পনা নেই। সব সেবা সংস্থারই সংকট বা আপৎকালীন একটি পরিকল্পনা থাকে। যদি কোনো স্থানে পানির সাময়িক সংকট হয়, সেটা ওয়াসা কীভাবে সমাধান করবে, তা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই।

এছাড়া ওয়াসার পরিচালনা পর্ষদে ভোক্তাদের কোনো সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব নেই। ‘ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন, ১৯৯৬’ অনুসারে ঢাকা ওয়াসা পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, শিল্প ও বণিক সমিতির প্রতিনিধি, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যন্টস অব বাংলাদেশের প্রতিনিধি, সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি, বার কাউন্সিলের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের প্রতিনিধি এবং পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিনিধিরা তাদের সংশ্লিষ্ট সংগঠন কর্তৃক মনোনীত হলেও পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধি ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক তারই আজ্ঞাবহকে মনোনীত করে থাকেন। বর্তমান ওয়াসার বোর্ড চেয়ারম্যানও একই প্রক্রিয়ায় মনোনীত। স্বাভাবিক কারণেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক মনোনীত বোর্ড সদস্য বা চেয়ারম্যান যিনিই হোন না কেন তার পক্ষে তার মনোনয়নদানকারীর কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা আদৌ সম্ভব নয়। আইনের মারপ্যাঁচে বলা আছে, পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিনিধি। একজন ব্যক্তি কীভাবে পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী হতে পারেন? তা প্রশ্নের অবতারণা হতে পারে। তবে পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিনিধি হতে হলে তাকে ভোক্তাদের সঙ্গে সংযোগ থাকতে হবে। আর সরকার ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ প্রণয়ন করেছে। যেখানে ধারা নং ৫-এর ১৬ উপধারায় বলা আছে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে। তারই ধারাবাহিকতায় ক্যাব সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভোক্তাস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণ ও কমিটিগুলোয় প্রতিনিধিত্ব করে এলেও ঢাকা ওয়াসায় তা মানা হয়নি।

দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আরেকটি জটিল সমস্যা হলো শাসন ব্যবস্থায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের অভাব। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মালিক সব জনগণ বলা হলেও বর্তমানে শাসন ব্যবস্থায় সমাজের সব পর্যায়ের নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। এজন্য সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা আবশ্যক। এই সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়টি রাজনীতিতে অনুপস্থিতির কারণে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, অবজ্ঞা ও সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত মূল্যহীন হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায়। সেখানে অনেকগুলো খাতে শুধু সরকারি কর্মকর্তা আর ব্যবসায়ীই নীতি নির্ধারণ করে থাকেন। অথচ এক্ষেত্রে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বা যাদের জন্য এই সেবা সার্ভিস তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকে না। তবে অনেক জায়গায় এসব পদও সমাজের ওপরতলার লোকজন দখল করে নেন। নীতিনির্ধারক মহল চিন্তাও করে না এই সেবা বা বিধানে তাদের কোনো মতামতের প্রতিফলন হওয়ার দরকার আছে কি না।

তাই এখন ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি দূর করা এবং শুধু গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর চেয়ে সরকারি সেবা সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি। একই সঙ্গে পানির দাম বাড়ানোর আগে গণশুনানির আয়োজন করে ভোক্তাদের মতামত নিয়ে সেবার মান ও দাম নির্ধারণে ভূমিকা নিতে হবে। কারণ ওয়াসা রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। জনগণের করের টাকায় এর ব্যয়ের একটি বড় অংশ নির্বাহ করা হয়। সে কারণে জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালন ব্যয়, ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধসহ নানা অজুহাতে ভোক্তা পর্যায়ে পানির দাম বাড়ানোর খোঁড়া যুক্তি থেকে বের হয়ে এসে সেবা সংস্থার ব্যবস্থাপনার মান, পানি ব্যবহারকারীদের সত্যিকারের অংশগ্রহণ, কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির দুর্বলতা কাটানো সম্ভব।

ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..