প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক

মেহেদী হাসান: মূলধন ঘাটতি, পুঞ্জীভূত লোকসান, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ডুবতে বসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। ব্যাংকটি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নির্দেশনা দিলেও সেগুলো যথাযথ পরিপালিত হয়নি। ফলে রাকাব’র সার্বিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটিকে বাঁচাতে সম্প্রতি ১০ দফা নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাকাবের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭১০ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৩ কোটি টাকা। এছাড়া গত অর্থবছরের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২৭ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ২০২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ২৫ শতাংশ খেলাপি। বাড়ছে রাকাবের লোকসানি শাখার সংখ্যাও। মোট ৩৭৯টি শাখার মধ্যে ১১৮টিই লোকসানি শাখায় পরিণত হয়েছে বিশেষায়িত এ ব্যাংকের।

জানা গেছে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ২০০৬-০৭ অর্থবছর থেকে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমওইউতে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ প্রবৃদ্ধি যথাযথ রাখা, লোকসানি শাখা ও পরিচালন ব্যয় কমানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সুপারভিশনের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবছর একবার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অর্জনের মূল্যায়ন করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, এ ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বৈঠকে আর্থিক সূচকের উন্নয়নে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান ব্যাংক দুটিকে সম্পদের গুণগত মান বৃদ্ধির তাগিদ দেন। ভালো গ্রাহকদের ঋণ প্রদানের পাশাপাশি নতুন বিতরণকৃত ঋণ যাতে শ্রেণীকৃত না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাকাবের মোট আমানতের ৬৫ শতাংশ স্থায়ী আমানত হওয়ায় সুদ ব্যয় অত্যধিক। আলোচ্য সময়ে ব্যাংকটির মেয়াদি আমানত ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এমওইউ’র শর্তের পরিপন্থি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কৃষিতে ঋণ বিতরণের প্রধান লক্ষ্য হলেও গত কয়েক বছরে দৈনন্দিন ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণ বিতরণ করেছে রাকাব। এসব ঋণের বেশিরভাগই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে সামগ্রিকভাবে বেড়ে গেছে খেলাপি ঋণ। সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যাংকটির লোকসানি শাখা। এদিকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় এর বিপরীতে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকটি। এমনি পরিস্থিতিতে ঋণ আদায় বাড়িয়ে খেলাপি ঋণ কমাতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি লোকসানি শাখা কমিয়ে ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক সূচক উন্নতির করার কঠোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

রাকাবের আর্থিক সূচকের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ নির্দেশনা

রাজশাহী কৃষি ব্যাংকের আর্থিক সূচকের উন্নয়নে সম্প্রতি ১০টি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনাগুলো হলো মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে ভবিষ্যতে আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির মাধ্যমে মূলধন ঘাটতি পূরণে সচেষ্ট থাকা; ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গাইডলাইনগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ এবং ঋণ নিয়মাচার মেনে ঋণ মঞ্জুরির জন্য পরিচালনা পর্ষদকে অধিক দায়িত্বশীল হতে হবে; শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়সহ অন্যান্য আর্থিক সূচকগুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। নতুন বিতরণকৃত ঋণ যাতে শ্রেণীকৃত না হয়, সে ব্যাপারে যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে; আন্তশাখা লেনদেনের এন্ট্রিগুলো দ্রুত সমন্বয় করতে হবে; আগামী অর্থবছরের মধ্যে উচ্চ সদুবাহী আমানত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করার মাধ্যমে সুদ ব্যয় হ্রাস করতে হবে; ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ (২০১৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করতে হবে; কোর রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং কোর রিস্কের প্রতিটি সেগমেন্টের রেটিং ন্যূনতম সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে; লোকসানি শাখাগুলোকে লাভজনক শাখায় উন্নীতকরণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নতুন শাখা খেলার আবেদন করতে হলে ক্যামেলস ও কোর রিস্ক রেটিংয়ের উন্নতি এবং অলাভজনক শাখার সংখ্যা হ্রাস করতে হবে; তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে অটোমেশনের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপপূর্বক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অটোমেশন (সিবিএস পরিপূর্ণ বাস্তবায়নসহ) কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মঈন উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ এবং লোকসানি শাখা কমিয়ে আনতে আমরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। ব্যাংকটির আর্থিক সূচকের উন্নয়নে চলতি বছরের গত জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫০ দিনের একটি কর্মসূচি নিয়েছিলাম। এতে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জেনারেল ম্যানেজারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সবাইকে অঞ্চল ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি আমরা একটা বিজয় মেলা করেছি। এ মেলা করে আমরা ১৭৯ কোটি টাকা আদায় করেছি। যার মধ্যে খেলাপি ঋণও রয়েছে। আগামী বৈশাখী মেলায় এর দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা আমরা আদায় করতে পারব। আমরা জুন মাসে মধুমেলার আয়োজন করে থাকি। সে মেলাতেও আমরা প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার মতো আদায় করতে পারব। আমরা লোকসানি শাখার সংখ্যাও কমিয়ে আনতে কাজ করছি।