দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের কার্যকারিতা যাচাই প্রয়োজন

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংলাপে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: কভিড-১৯ মহামারিতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা ঋণের অর্থ বড় ব্যবসায়ীরা পেয়েছেন পুরোটাই। কিন্তু এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে বিতরণ হয়েছে সামান্যই। ঋণের অর্থ বণ্টন প্রক্রিয়া ও সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাই হওয়া দরকার, যাতে প্যাকেজের কার্যকারিতা বুঝা যায়। প্যাকেজ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ব্যবস্থাপনা, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ বাড়ানো উচিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের বলে মতামত দিয়েছেন আলোচকরা।

‘অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে এমন অভিমত দেন তারা। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় সংলাপটি। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।

প্যানেল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক পরিচালক মার্সি মিয়ান টেম্বন, ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি, বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক, সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান ও বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ।

প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী হয়েছে। বাংলাদেশেও প্রভাব পড়ে। সরকার উদ্যোগী হয়ে এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করে; যা দেশের মোট জিডিপির চার দশমিক ৩৪ শতাংশ। বাংলাদেশ সঠিক সময়ে ঋণ প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করায় পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারছি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকার জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশেও আঘাত হানতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় শনাক্তের হার বাড়ছে বাংলাদেশে। এজন্য পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে যেতে পারে। কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে জাপান বিনিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশ যদি বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করে, তাহলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে জাপানি ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হয়ে উঠবেন। এতে জাইকা ও জাপান সরকার সহযোগিতা করতে রাজি আছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশকেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার সময় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের আবাসিক পরিচালক মার্সি মিয়ান টেম্বন বলেন, কর্মসংস্থান নিশ্চিত ও কর্ম হারানো ব্যক্তিদের পুনর্বহালের বিষয়টি ভাবতে হবে। কীভাবে ক্ষতি কমিয়ে আনা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রণোদনার অর্থ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। ক্ষুদ্র ও এসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে প্রণোদনার অর্থ গেলে অর্থনীতি ঘুরে  দাঁড়াতে পারবে। প্রণোদনার অর্থ বড়রা পেলেও ছোটদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিতের সময় হয়েছে। প্রণোদনার অর্থ ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিতে আনা দরকার। বিশেষ করে প্রবাসী কর্মীদের দিকেও নজর দিতে হবে বাংলাদেশকে।

সভায় জানানো হয়, প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে কর্মসংস্থান ধরে রাখা, পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ শেকলের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে হাতে নেওয়া হয়েছে সাতটি প্যাকেজ। প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে বেতন দেওয়ার ফলে ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত ৩৮ লাখ শ্রমিক এর সুফল পেয়েছেন।

আলোচনা পর্বে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, শীত শুরুর পর সারা বিশ্বে এমনকি বাংলাদেশেও মহামারির দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এজন্য আরও একটি প্যাকেজ ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে তার আগে বর্তমান প্যাকেজের একটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হতে পারে। এতে বুঝা যাবে, অর্থনীতিতে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের প্রভাব কতটুকু পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রের জন্যই প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়নি। সামনের দিকে এটি হওয়া উচিত।

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে অনেক কারখানায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল, কম শিক্ষিত ও কম প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা চাকরি হারিয়েছেন। এখন শিক্ষিত যুবকরা এই স্থান দখল করেছে। এখন নতুন করে এসব কর্মহীন হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে ভাবতে হবে।

বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, এই মহামারির কারণে দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির দিকে গেছে। আশা করছি, অচিরেই এ পরিস্থিতি থেকে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব। আমরা যদি ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ভালোভাবে টিকে থাকতে পারি, তাহলে আমাদের আর চিন্তা করতে হবে না। সে জন্য আমাদের প্রয়োজন এ ধরনের আরেকটু সহায়তা। প্যাকেজের মেয়াদ পাঁচ বছর করলে তৈরি পোশাক খাত উপকৃত হবে।

এরপর সাংবাদিক ও আগত অতিথিদের প্রশ্নোত্তর দেন মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। প্রণোদনার অর্থ বণ্টনে ব্যাংকগুলোর উদাসীনতা রয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের কর্মীরা সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু দেশীয় অন্যান্য খাতের কর্মীরা এ সুবিধা পাননি বলে উš§ুক্ত আলোচনায় উঠে আসে। তাদের জন্যও প্রণোদনা ঘোষণা করা উচিত। নইলে অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি হবে না। এর উত্তরে মুখ্য সচিব বলেন, আমরা গ্লাসে অর্ধেক পানি আছে সেটিই বলতে চাই। সবকিছুতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রাখতে চাই। আপনাদের পর্যবেক্ষণ আমাদের সহায়তা করবে।

সর্বশেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদরা যে পর্যালোচনা দিয়েছেন, তার সারবত্তা রয়েছে। এসএমই খাতগুলোতে এখনও বরাদ্দের সব টাকা পৌঁছানো যায়নি। এর জন্য আলাদা কর্মকৌশল ঠিক করা দরকার। আবার মহামারির সেকেন্ড ওয়েব নিয়েও নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। আমরা আজ মতামত নিতে এসেছি। প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্যই ছিল কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা। আপনাদের মতামতকে আমরা গুরুত্ব দেব।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..