প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা গ্রাস করছেন ন্যাশনাল ব্যাংক

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে বছর দুয়েক আগেই ন্যাশনাল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার বড় গ্রাহক নূরজাহান, এমইবি, ছগির অ্যান্ড ব্রাদার্স, আহাদ ট্রেডিং ও জালাল অ্যান্ড সন্স এবং আগ্রাবাদ শাখায় মোস্তফা, লিজেন্ড হোল্ডিংস ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে। আর সম্প্রতি এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে এহসান গ্রুপ। সব মিলিয়ে এসব গ্রুপের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের অনাদায়ী পাওয়া প্রায় এক হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এসব পাওনা আদায় নিয়ে চিন্তিত ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড কর্তৃপক্ষ।

ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৬ অনুসারে, প্রথম প্রজšে§র বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ১৭২ কোটি ৭১ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে সাব-স্ট্যান্ডার্ড লোন ১১২ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, ডাউট লোন ১৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও বেড বা লস লোন এক হাজার ৯০৬ কোটি ৭১ লাখ ১৮ হাজার টাকা। আর ২০১৫ সালে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩০৪ কোটি ৬০ লাখ ও ২০১৪ সালে ৯১০ কোটি ২৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা।

সূত্রমতে, ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি তালিকায় আছে দেশের বহুল আলোচিত তেল ব্যবসায়ী জহির আহম্মেদ রতন ও তার অন্যান্য ভাইদের মালিকানাধীন নূরজাহান গ্রুপ। ব্যাংকটির ২০১৫ সালে বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে এ গ্রুপের কাছে অনাদায় দেনার পরিমাণ ছিল ৬০১ কোটি টাকার অধিক। এর মধ্যে নূরজাহান সুপার এডিবল অয়েলস লিমিটেড ও খালেক অ্যান্ড সন্সের ৩০৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং মেরিন ভেজিটেবলস অ্যান্ড আহম্মেদ ট্রেডার্স ২৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখার গ্রাহক।

তালিকায় আরও আছে চট্টগ্রামের আলোচিত তেল ব্যবসায়ী শামসুল আলমের পারিবারিক মালিকানাধীন এমইবি গ্রুপ। ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখায় রয়েছে এমইবি গ্রুপের ২১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ। এছাড়া চট্টগ্রামের শিল্প গ্রুপ মোস্তাফা গ্রুপের ১৪৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবদুল হাইয়ের মালিকানাধীন লিজেন্ড হোল্ডিংসের ঋণের পরিমাণ ১৬২ কোটি টাকা, ছগির অ্যান্ড ব্রাদার্সের ১৩৯ কোটি টাকা, ‘চিনি বশর’ নামে পরিচিতি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হাজী আবুল বশরের মালিকানাধীন আহাদ ট্রেডিং ও জালাল অ্যান্ড সন্সের ১৬৮ কোটি টাকা।

সদ্য এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক আবু আলমের মালিকানাধীন এহসান গ্রুপের ৪৭৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আর এসব পাওনা মিলে হয় প্রায় এক হাজার ৯১১ কোটি টাকাও অধিক, যা ন্যাশনাল ব্যাংকের পাঁচ বছরের নিট মুনাফার চেয়েও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৬ সালে নিট মুনাফা ছিল ৫৫৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ছিল ৩৮৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ছিল ২৬৬ কোটি দুই লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ছিল ২১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং ২০১২ সালে নিট মুনাফা ছিল ১৪৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৫৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

এদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের আরও দুই শিল্প গ্রুপের ঋণের পাওনা পরিশোধের কিস্তি অনিয়মিত হয়ে পড়েছে বলে জানান ব্যাংকটির বেশ কয়েকজন সিনিয়র ব্যবস্থাপক। এ নিয়ে চিন্তিত ব্যাংক পরিচালনা পর্যদ।

ন্যাশনাল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক আবু আলমের মালিকানাধীন এহসান গ্রুপ বিভিন্ন সময় নেওয়া ঋণের পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৭৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে মেসার্স আলম এন্টারপ্রাইজের কাছে ৪৭ কোটি ৬১ লাখ এক হাজার ৬৪ টাকা, মেসার্স বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজের কাছে ৪৭ কোটি ৫১ লাখ ১০ হাজার ৯৬১ টাকা, এহসান রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের কাছে ১৪৩ কোটি তিন লাখ এক হাজার ৬১৩ টাকা, এহসান স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের কাছে ২৩৮ কোটি ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ৭১৩ টাকা। এ গ্রুপটির কর্ণধার আবু আলম দুবছর ধরে পাওনা পরিশোধে একাধিকবার সময় বাড়িয়ে নিলেও পাওনা প্রতিবারই ব্যর্থ হন। ফলে ব্যাংকে বন্ধক থাকা গ্রুপটির এক হাজার ৩৩৯ শতাংশ জমি নিলামে বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এহসান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক আবু আলম শেয়ার বিজকে বলেন, লোন ৩০০ কোটি টাকার কম হলেও সুদের কারণে তা ৪৭৭ কোটি টাকা দেখাছে। আমি ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য ব্যাংক থেকে ১৩-১৪ শতাংশে লোন নিই। কিন্তু কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতায় আরও চার-পাঁচ শতাংশ সুদ যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায় স্ট্যাবলিশম্যান্ট কস্টও আছে ১০ শতাংশ। সব মিলে গড়ে ৩০ শতাংশ দায় বহন করে আমাদের ব্যবসা করতে হচ্ছে। আর আবাসন ব্যবসায় গত কয়েক বছরের চলমান মন্দা তো ছিলই। ফলে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ি। এখন নিয়মানুসারে ব্যাংক পাওনা আদায়ে অগ্রসর হবে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছু গ্রুপকে ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে বেশি মুনাফার জন্য বেশি অর্থায়ন করেছেÑযা এক সময় ব্যাংকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। আর খেলাপি ঋণের সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকও সঠিকভাবে প্রকাশ করে না। এছাড়া একাধিক ব্যাংক থেকে একটি গ্রুপ যেন বিপুল পরিমাণে ঋণ নেওয়ার সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এতে সাধারণ জনগণের আমানত রক্ষা পাবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের ঝুঁকি থেকেও রক্ষা পাবে।

ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ভিপি ও খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক শাহাদাত হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, এসব ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে যখন ঋণ নেন, তখন তাদের অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু পরে ব্যবসায়িক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লে ঋণ পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ফলে এক সময় তারা পুরোপুরি খেলাপি হয়ে পড়েন। এতে খুব চিন্তিত আছি। আর নানান জটিলতায় আটকে আছে এদের কাছে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী পাওনা। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছি।

ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে এসএমএসে বিষয়টি জানানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। এছাড়া ডিএমডি এএসএম বুলবুলের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি বার বার ফোন কেটে দেন। ফলে উভয় কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।