সাক্ষাৎকার

‘চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার’

শিল্পোদ্যোক্তা আলমাস শিমুল। দেশের ইস্পাত খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পাশাপাশি পরিচালক হিসেবে আছেন জিপিএইচ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড, জিপিএইচ শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড, জিপিএইচ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, চিটাগং ক্যাপিটাল লিমিটেড, জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদারস লিমিটেড, এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লিমিটেড, ক্রাউন পলিমার ব্যাগিং লিমিটেড, ক্রাউন মেরিনার লিমিটেড এবং ক্রাউন পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডে। ছয় ভাই একসঙ্গে পরিচালনা করছেন জিপিএইচ গ্রুপের ব্যবসা। এখন এ গ্রুপের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। বর্তমান সম্প্রসারণ কাজ, বাজার চাহিদা, আগামীর সম্ভাবনা, চট্টগ্রামের বাণিজ্যসহায়ক পরিবেশ প্রভৃতি নিয়ে নিজ কার্যালয়ে কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল আলম

শেয়ার বিজ: কী কী উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে দেশের ইস্পাত খাতে এ বৃহত্তম প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে?

আলমাস শিমুল: বছর কয়েক আগে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে গ্রুপ চেয়্যারম্যান জাহাঙ্গীর ভাইয়ের নেতৃত্বে কাজ শুরু করি। এ কাজের জন্য আমাদের এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ পুরোদমে চলছে। সব ঠিক থাকলে আমাদের প্লান্টটি ২০১৯ সালের মার্চ মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাবে। এতে আমাদের সক্ষমতা প্রায় সাতগুণ বাড়বে। প্রধান উদ্দেশ্য ভালো ও মানসম্মত ইস্পাত তৈরি করা। কারণ এখন দেশে মানসম্মত ইস্পাতের অনেক চাহিদা ও মানসম্মত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ প্রকল্পের ফলে সংশ্লিষ্ট খাতে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বৈশ্বিক বা স্থানীয় আইনের সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে অনেক কম থাকবে। সামগ্রিকভাবে আমদানির বিকল্প সৃষ্টি, পরিবেশবান্ধব, কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ৫০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সাশ্রয় হবে।

শেয়ার বিজ: সম্প্রসারণ প্রকল্পটির বিশেষত্ব কী?

আলমাস শিমুল: জিপিএইচের নতুন প্লান্ট প্রতিষ্ঠায় আমরা বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি কোয়ান্টাম টেকনোলজি বেছে নিয়েছি। এটি এশিয়ায় প্রথম কোয়ান্টাম টেকনোলজি-সমৃদ্ধ প্লান্ট। আর বিশ্বে তৃতীয়, যা মেক্সিকো, ইতালির পর তৃতীয়। এ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ ইকুইটি জিপিএইচের। তাছাড়া আমরা ইউসিবিএলের নেতৃত্বে দেশের ১২ ব্যাংকের কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ১৫৪ মিলিয়ন ডলার ঋণপ্রাপ্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্টের জন্য ভারতের বিশ্বখ্যাত এমএন দস্তুর লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছি। চীনের সিচুয়ান এয়ার সেপারেশন প্লান্ট কোম্পানির সঙ্গে দৈনিক ২৫০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ও তরলাকারে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এবং আর্গন উৎপাদনের জন্য চুক্তি হয়েছে। এসব আমাদের বেসরকারি খাতের জন্য বড় অর্জন, যা উদাহরণ হয়ে থাকবে দেশের ইতিহাসে। রেফারেন্স হিসেবে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা আমাদের কাছে আসবে। আশা করি জিপিএইচের এ উদ্যমী ও গতিশীল প্রচেষ্টা উপমহাদেশে ইস্পাতশিল্পে বিপ্লব ঘটাবে। এ সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের প্রতি টন ইস্পাত উৎপাদনে মাত্র ৩০০ কিলোওয়ার্ট বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে। যা বর্তমানে মিলগুলোয় লাগে ৬৫০ থেকে ৭০০ কিলোওয়ার্ট। আর গ্যাসের ব্যবহার একেবারে শূন্য। অথচ বর্তমানে মিলগুলোয় প্রতি টনে ৪০ থেকে ৫০ কিউবিক ঘনফুট গ্যাস ব্যবহৃত হয়। এখানে পৃথিবীর খ্যাতনামা ইটিপি ব্যবহার করা হবে। এতে পরিবেশ দূষণ একেবারে শূন্যের কোঠায় চলে আসবে। ফলে চুল্লির পাশেই সবুজ গাছ লাগানো যাবে, যা বর্তমান প্লান্ট এরিয়ায় তেমন দেখা যায় না। এতে পরিবেশ দূষণ কম হবে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় হবে। এ সাশ্রয়কৃত জ্বালানি নতুন কোনো কারখানায় ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। আর কারখানার উৎপাদন প্রায় সাতগুণ বাড়বে। এতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ আমদানি শুল্ক, অগ্রিম আয়কর, মূল্য সংযোজন কর প্রভৃতি বাবদ প্রায় আড়াই কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করবে।

শেয়ার বিজ: সম্প্রসারণ প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আপনাদের উৎপাদন কত হবে?

আলমাস শিমুল: আমাদের নতুন প্লান্ট সম্প্রসারণ কাজ শেষে এমএস বিলেটের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ১০ লাখ আট হাজার টনে। এমএস রডের উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে সাত লাখ ৬০ হাজার টনে দাঁড়াবে। তাছাড়া কারখানায় রড ও বিলেটের বাইরে ইস্পাতের ভবন তৈরিতে ব্যবহƒত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও তৈরি করবে। আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিশ্ব নির্মাণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শেয়ার বিজ: একজন ব্যবসায়ী হিসেবে চট্টগ্রামে শিল্পোন্নয়নে কী কী প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছেন?

আলমাস শিমুল: চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সবচেয়ে বেশি আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার। কারণ এখানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্দর, সস্তা শ্রম, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, মিঠাপানির সহজলভ্যতা, ব্যাংকিং, বাজারসহ সবগুলো উপাদান থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামে কয়েক বছরে হাতেগোনা কয়েকটি শিল্প স্থাপন ছাড়া তেমন চোখে পড়ার মতো নতুন শিল্প স্থাপিত হয়নি। যেসব কারণে চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানা উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিরসরাইয়ে ভ্যাট তল্লাশি কেন্দ্র। এ ভ্যাট তল্লাশি কেন্দ্র থাকায় চট্টগ্রামে উৎপাদিত সব পণ্যের শতভাগ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে আনুপাতিক হারে শতভাগ গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল ও আয়কর পরিশোধ করতে হয়। এতে করে চট্টগ্রামের শিল্পপণ্য উৎপাদনে খরচ বেশি হয়। বাংলাদেশের আর কোথাও স্থায়ীভাবে ভ্যাট তল্লাশি কেন্দ্র না থাকায় ওই অঞ্চলের শিল্প-কারখানাগুলোয় সরকারি শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ থেকে যায়। যদি ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া যায়, তাহলে আনুপাতিক হারে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া সহজ ও সম্ভব হয়। ভ্যাট তল্লাশি কেন্দ্র তুলে দেওয়ার পক্ষে আমি নই। অথচ দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের মহাসড়কে ভ্যাট তল্লাশি কেন্দ্র স্থাপন করলে সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণ বাড়বে। চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানার উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচে সমতা আসবে। কেউ কোনো রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাবে না এবং দেশ উপকৃত হবে। এছাড়া বড় দারোগাহাট এলাকায় গাড়ির ওজন পরিমাপক যন্ত্র স্থাপনের ফলে চট্টগ্রামের উৎপাদিত পণ্যের যানবাহন ১৩ টনের বেশি পণ্য বহন করতে পারে না। এতে পরিবহন খরচ বেশি হয়। এ কারণে গ্রাহক, সাধারণ ডিলার বা পাইকাররা চট্টগ্রাম থেকে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাত করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ বাংলাদেশের আর কোথাও এ ধরনের গাড়ির ওজন পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে ঢাকা বা আশেপাশের শিল্পাঞ্চলের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী স্বাচ্ছন্দ্যে ৩০ টন, ৩৫ টন বা ৪০ টন পরিবহন করছে। ফলে চট্টগ্রামের উৎপাদিত পণ্য প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছে। একইভাবে এ অঞ্চলে প্রয়োজনীয় পানি ও গ্যাসস্বল্পতা আছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানাগুলো প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার বেশি উৎপাদন চালু রাখতে পারে না। অথচ ঢাকা বা অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন বজায় থাকে বিধায় তাদের উৎপাদন খরচ আমাদের চেয়ে অনেক কম হয়। ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রাম অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

শেয়ার বিজ: চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে নীতিনির্ধারকদের কাছে আপনাদের দাবি কী?

আলমাস শিমুল: চট্টগ্রামকে বলা হয় বাণিজ্যিক রাজধানী। অথচ ছোটখাটো কাজ থেকে শুরু করে বড় যে কোনো কাজের জন্য ঢাকামুখী হতে হয়। এতে করে সময় ও খরচ বাড়ে, যা শিল্প উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা। সুতরাং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চট্টগ্রামে স্থানান্তর করার জোর দাবি করছি। পাশাপাশি দেশের ‘অর্থনীতির প্রাণ’খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও ব্যবসাবান্ধব বন্দর হিসেবে গড়ে তুলুন। এখানে জাহাজজট, কনটেইনারজট স্থায়ীভাবে রোধ করতে হবে। কারণ আমদানি করা শিল্পের কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে ৩০-৪৫ দিন সময় লাগে। এতে অপ্রত্যাশিত ক্ষতির দায় তো আমাদের বহন করতে হচ্ছে। সমগ্র দেশ যেখানে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে গ্যাস, পানি, ভ্যাট তল্লাশি কেন্দ্র, ওজন পরিমাপক যন্ত্র প্রভৃতির কারণে কেন চট্টগ্রাম পিছিয়ে থাকবে। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে, চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে জাতীয় বড় অর্জন হবে না। ফলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো অবস্থা হবে।

শেয়ার বিজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আলমাস শিমুল : শেয়ার বিজকেও ধন্যবাদ।

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..