প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চট্টগ্রামের ৭০ খালের অর্ধেকেরই অস্তিত্ব নেই

১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম শহরের জন্য প্রণীত মহাপরিকল্পনায় ড্রেনেজ সিস্টেম সম্পর্কিত সব ধরনের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু উপেক্ষা করা হয়েছে এ প্ল্যানের সুপারিশগুলো। এতে ভারি বর্ষণ হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে শহরটিতে, বাড়ছে ভোগান্তি। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের তৃতীয় পর্ব

সাইফুল আলম ও সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম শহরের প্রথম মহাপরিকল্পনায় (১৯৬৯ সালে) নগরে প্রবাহিত ৭০ খালের অস্তিত্ব থাকলেও এখন আছে ৩৪টি। ৪৮ বছরে এসব খালের ৩৬টি হারিয়ে গেছে চট্টগ্রাম থেকে। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নকালেও শহরের কোথাও জলাবদ্ধতা ছিল না। আর ২২ বছর পর নগরীর ৩২ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়মিত জলাবদ্ধতার শিকার। পাশাপাশি গত চার দশকে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় অব্যাহত দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, আবাসিক ও শিল্পবর্জ্যরে কারণে হারিয়ে গেছে অনেক খাল বা কার্যকারিতা হারিয়েছে খালগুলো।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে চট্টগ্রামের ৩৪ খালের মধ্যে ২২টি যুক্ত আছে কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে, পাঁচটি যুক্ত হালদায় আর সাতটি সরাসরি সাগরের সঙ্গে যুক্ত। কার্যকরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এসব খালের ড্রেনেজ ব্যবস্থার ৪০ শতাংশই নিষ্ক্রিয়। কখনও কখনও এ ব্যবস্থা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সক্রিয় করা গেলেও জলাবদ্ধতা স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নিতে হলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি মহানগরীর পানি নিষ্কাশনের জন্য এক হাজার ৬০৫ কিলোমিটার বিভিন্ন আকৃতির নালা আছে। এসব বিদ্যমান খাল ও নালানর্দমা দিয়ে ঘণ্টায় ১০ কোটি ঘনমিটার পানি নিষ্কাশন সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। ফলে একটু ভারি বৃষ্টি হলে নগরের পানি যথাসময়ে নিষ্কাশন হচ্ছে না।

download (5)সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর এক্ষেত্রে ৪৮ বছরের অদক্ষতা ও উদাসীনতায় ৩৪-৩৬টি খাল হারিয়েছে অস্তিত্ব। আর বিদ্যমান খাল ও নালা দখল করে নির্মিত হয়েছে ২০০’র অধিক স্থাপনা। ফলে পানি ধারণ ও প্রবাহের ক্ষমতা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। যা এখন নগরবাসীর প্রধান চিন্তার কারণ। কেননা, ১৯৯৫ সালে মহাপরিকল্পনায় ৯২ বর্গমাইল এলাকার ভৌতিক বৈশিষ্ট্য, ভূমির ভৌগোলিক অবস্থান, খাল-নালার ক্যাচমেন্ট এরিয়া ও গতিপথ বিবেচনা করে ১০টি স্টাডি বিভক্ত করা হয়। খাল ও নালার পানি প্রবাহের ধারণক্ষমতা রক্ষায় পরিকল্পনার প্রথম ধাপে পাঁচটি নতুন খাল খনন, দ্বিতীয় ধাপের প্রথম পর্যায়ে ১৪টি খাল সংস্কার ও দ্বিতীয় পর্যায়ে চারটি খালের সংস্কারের কথা ছিল। একই সঙ্গে নাসির, চাক্তাই, মির্জা, শীতল, ঝরনাছড়া, হিজরা ও নয়াখালের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৯টি সিল্ট ট্রিপ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।

মহাপরিকল্পনার অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে ছিলÑবিদ্যমান খালগুলোর সমস্যা খুঁজে বের করে সমাধান করা, নতুন খাল খনন, পুরোনো খালগুলোর গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়ানো, জলাধার নির্মাণ, জোয়ারের সময় নগরে পানি প্রবেশ ঠেকাতে কর্ণফুলী নদীর সংযোগ খালের

মুখে সøুইস গেট স্থাপন ও নদীর দুই তীরে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ। কিন্তু এসব সুপারিশের কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি ২৩ বছরেও। ফলে বিভিন্ন সংস্থার ব্যয়গুলো রোধ করতে পারেনি নগরের জলাবদ্ধতা।

সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দায়িত্ব এড়িয়েছে। অপরদিকে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী খাল খনন প্রকল্পটি তিন বছর আগে অনুমোদন পেলেও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে এখনও কাজ শুরু করতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে ড্রেনেজ সিস্টেম চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৪ সালে বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত খাল খননে একটি প্রকল্প নেয় সরকার। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল এর কাজ। কিন্তু শেষ তো দূরের কথা, এখনও কাজ শুরুই করতে পারেনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এমনকি প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণও হয়নি। সময়মতো এ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারলে নগরীতে চলমান জলাবদ্ধতা সমস্যা অনেকটা লাঘব হতো বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তবে সিটি করপোরেশন বলছে, প্রয়োজনীয় টাকা ছাড় না হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

untitled-9_76424চট্টগ্রাম শহরে মোট কয়টি খাল রয়েছে, পরিধি কতটুকু, গভীরতা কতÑতার সঠিক পরিসংখ্যান চসিক, চউক বা জেলা প্রশাসন কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। যদিও বিভিন্ন সময় নগর পরিকল্পনাবিদরা চট্টগ্রাম শহরে ১৪৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ১৭টি প্রধান খাল থাকার কথা বলে আসছেন। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অতীতে বর্ষা সামনে রেখে শহরের ৩৪টি ছোট-বড় খাল ও নালা থেকে মাটি, ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করে থাকে। এ হিসাবেই এখনও ৩৪টি খাল রয়েছে, যেগুলো দৃশ্যমান। আর চউক বলেছে ৩৬টি। তবে এগুলোর প্রতিটিই হারিয়েছে তার প্রশস্ততা। এসব খালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑচাক্তাই, মির্জা, রাজা, চশমা, নাছির, বির্জা, খন্দকিয়া, কাজির, গয়নাছড়া, বামনশাহী, কাট্টলী, ত্রিপুরা, ডোম, শীতল ঝরনাছড়া, মায়া, হিজড়া, মহেশ, ডাইভারশন, মরিয়ম বিবি, সদরঘাট, রামপুরা, পাকিজা ও মোগলটুলী খাল উল্লেখযোগ্য।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহিনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহর পানিতে ডুবে থাকলেও দেখা যায় খালের মুখে ৫০০ গজের মধ্যে কোনো পানিপ্রবাহ নেই। প্রতিটি খালের মুখে ৫-১০টি অবৈধ স্থাপনা আছে। এ অবৈধ স্থাপনার তালিকা আমাদের কাছে আছে; কিন্তু  সেসব উচ্ছেদ সম্ভব হয়নি। কারণ আমাদের কাছে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নেই। আর রাজনৈতিক চাপও থাকে। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা গেলে নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার ৮০ ভাগ নিরসন হবে।’

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘১৯৬৯ সালে প্রণীত ওই মাস্টারপ্ল্যানে চট্টগ্রাম শহরের শুধু কালুরঘাট থেকে নেভাল একাডেমি পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীতে ৩৪টি খালের মুখ চিহ্নিত করা হয়েছিল। আর পুরো শহরে খাল ছিল ৭০টি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা যৌথভাবে নতুন ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যানের জন্য যে জরিপ শুরু করে, তাতে চট্টগ্রাম শহরের খালের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৩৪টি। আর কালুরঘাট থেকে নেভাল একাডেমি পর্যন্ত পাওয়া গেছে ২২টি। বাকি ১২টি খালের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। আর আমাদের শিক্ষার্থীদের জরিপে পাওয়া গেছে মাত্র ১৮টি খাল।’

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়–য়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘২২ বছরেও ড্রেনেজ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কোনো কাজ হয়নি। যা হয়েছে, তা বিজ্ঞান ও কারিগরিসম্মত নয়। ফলে অল্প বা ভারি বৃষ্টিতে নগরের ৩২ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে হলে খাল দখলমুক্ত, নতুন খাল দ্রুত খনন, পাহাড় কাটা পুরোপুরি বন্ধ, নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং, খাল ও নালাগুলোর সংস্কার ও গভীরতা বাড়াতে হবে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তা না করে যদি টাইডেল রেগুলেটর করে, পাম্প বসিয়ে নগরের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়।’

সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিন বলেন, ‘নগরীতে জলাবদ্ধতার কারণ হলো নগরীর সবকটি নালা ও খাল বেদখল এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কেননা অতীতে ড্রেনেজ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আর খাল সীমানা নির্ধারণ জরিপ শেষে হলে খাল ভরাট করে গড়ে ওঠা ভবন ও দোকানপাট উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসনে আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের বিষয়টিও দ্রুত চূড়ান্ত হবে। এ প্রকল্পের আওতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে পতেঙ্গা থেকে পাঁচ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার এবং কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত নদীতীরে ১৪ কিলোমিটার উঁচু বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ করা হবে। এছাড়া চাক্তাই, রাজাখালী, মহেশ ও নাছির খাল সম্প্রসারণ ও ড্রেজিং করা হবে। সে সঙ্গে নতুন খাল খনন করা হবে। ওয়াটার লগিং ড্রেনেজ প্রজেক্টের আওতায় নগরীর ২৭টি বড় খালের মুখে সøুইস গেট নির্মাণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক মাটি উত্তোলন করে পুনর্খনন করা হবে।’

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বেশ কিছু খালের অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে উচ্ছেদ কার্যকর পরিচালনা করা হবে।’