বাণিজ্য সংবাদ

চট্টগ্রামে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ কমেছে

বিনিয়োগ নিবন্ধন

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: ব্যবসা ও বাণিজ্যসহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে বন্দরের নতুন জেটি, টার্মিনাল ও টানেল নির্মাণ এবং একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ ও রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ বহুমাত্রিক কাজ শেষ হয়েছে, কিংবা শেষের পথে। কিছু নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ থাকায় গত অর্থবছরের (২০১৮-১৯) চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্প, বাণিজ্য ও ট্রেডিং ব্যবসায় বিনিয়োগ প্রস্তাবনা ছিল ছয় হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা আগের (২০১৭-১৮) অর্থবছরের ছিল ছয় হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ কমেছে ৭৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সূত্রমতে, সদ্যসমাপ্ত (২০১৮-১৯) অর্থবছরের দেশি, যৌথ ও শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবনা প্রকল্প ছিল ১৭২টি। এসব প্রকল্পের বিপরীতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছয় হাজার ৫২০ কোটি ১৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগ প্রকল্প ছিল ১৬১টি। এসব প্রকল্পের বিপরীতে রয়েছে ছয় হাজার ৪৬৭ কোটি ৪১ লাখ ১২ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থান হবে ১৪ হাজার ৮৭ জনের। একই অর্থবছরের যৌথ বিনিয়োগ ছিল সাতটি প্রকল্পে। এর বিপরীতে রয়েছে ১৪ কোটি ৮৫ লাখ ২৬ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থান হবে ৩৪৬ জনের। পাশাপাশি একই সময়ে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধন হয় মাত্র চারটি। এ চারটি প্রকল্পে বিনিয়োগ সম্ভাবনা মোট ৩৭ কোটি ৮৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এক হাজার ৬৯ জনের, যেক্ষেত্রে আগের অর্থবছরে (২০১৭-১৮) ১৬৮টি প্রকল্পের বিপরীতে ছয় হাজার ৫৯৯ কোটি ৫৮ লাখ ১৭ হাজার টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাবনা ছিল। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের তুলনায় বিনিয়োগ কমেছে ৭৯ কোটি ৪৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
সরকারি বিভিন্ন সেবাপ্রদানকারী সংস্থার উন্নয়নচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে দেশের আমদানি ও রফতানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রসারিত হয়নি। গত ২০ বছরে নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হয়নি। তবে গত বছরের এক হাজার কোটি টাকার নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং এক হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ বাস্তবায়িত হয়। পাশাপাশি লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল, বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল এবং কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়। এছাড়া টানেল নির্মাণ, গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, সিতাকুণ্ড-মিরশরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, একাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণ, চলমান এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজ, রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ বহুমাত্রিক কাজ শেষ হয়, কিংবা শেষের পথে। আরও কিছু নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবে। সব মিলিয়ে এসব প্রকল্পে এক কোটি টাকারও অধিক ব্যয় হচ্ছে। আর এসব প্রকল্পের সুফল ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগ করবেন।
ট্রেডবডি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্টগ্রাম। আর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে অবস্থিত। পাশাপাশি গত ৪৮ বছরে বেসরকারি উদ্যোগে একে একে গড়ে উঠেছে ভারী শিল্পখ্যাত ইস্পাত, সিমেন্ট, তেল পরিশোধন কেন্দ্র, জাহাজনির্মাণ, জাহাজভাঙা, এলপিজি প্লান্টসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের একাধিক বড় পাইকারি বাজারও এটি। আর এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আছে ২০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫ লাখেরও বেশি।
অন্যদিকে এ শহরকে বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব শহরে পরিণত করার জন্য সরকারি সেবাপ্রদানকারী ৩২টির বেশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা স্বাধীনতার পর থেকে কাজ করলেও এখনও চট্টগ্রাম পুরোপুরি বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি, যার ফলাফল কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম। তারা বলেন, বিদ্যমান বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরকারের গৃহীত বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত সময়ের বাস্তবায়িত হলে অব্যশই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ শত গুণ বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে জুনিয়র চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, গত অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা। এটা অপ্রত্যাশিত। এত উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকার পর যদি বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে সরকারের উচিত সঠিক কারণ খুঁজে বের করা। আর বিদেশিদের বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, ট্রেড শো-সহ আমাদের দূতাবাসগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
সম্প্রতি আলাপকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবসাবান্ধব পোর্ট করার জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অল্প সময়ে এক হাজার কোটি টাকার অধিক ব্যয়ে যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়। পাশাপাশি প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের কাজ চলামান। বে টার্মিনালে ডেলিভারি ইয়ার্ড ও অত্যাধুনিক ট্রাক টার্মিনাল নির্মিত হবে। ফলে চট্টগ্রাম শহরে ট্রাকের যে যানজট হয়, সেটা আর হবে না। এছাড়া বন্দরের অর্থায়নে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। এর ফলে সরাসরি মূলসড়ক বাদ দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে বন্দরগামী গাড়িগুলো বন্দরে চলাচল করতে পারবে। ফলে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন এবং জনদুর্ভোগ কমবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..