দিনের খবর সারা বাংলা

চট্টগ্রামে করোনা-আক্রান্ত রোগীদের জন্য ভারসাম্যহীন চিকিৎসা ব্যবস্থা!

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের পরীক্ষাকৃত নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। আর পরীক্ষা ছাড়া উপসর্গ নিয়ে আছে আক্রান্তের চেয়েও দ্বিগুণ রোগী। পাশাপাশি হৃদরোগ, কিডনি রোগ, বার্ধক্যজনিত রোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও প্রায় হাজার খানেক বাড়ছে। এ বিপুল পরিমাণ কভিড ও নন-কভিড রোগীকে সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

আর বেসরকারি হাসপাতাল করোনা সন্দেহে এবং রহস্যজনক কারণে সেবা নিতে ইচ্ছুকদের সেবা দিতে নানা অজুহাত দেখিয়ে বিরত থাকছে। এতে সাধারণ নাগরিকের বাড়ছে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি। পাশাপশি বেশ কয়েকজন অনেকটা বিনা চিকিৎসায় মুহূর্তের মধ্যে মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ অনেকটা উদাসীন প্রশাসন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো।     

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় এক কোটির বেশি নাগরিকের বসবাস। এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৯৮৫। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন মাত্র ২১৯ জন, আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৭৫ জন। এছাড়া হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২২৪ জন।

এদিকে চট্টগ্রামে সরকারিভাবে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত করোনা চিকিৎসার জন্য ৩১৫টি বেডের কথা বলা হলেও মূলত ২২০টি বেড আছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১০ সিটের আইসিইউ বেডসহ মোট ১১০ বেড, ফৌজদারহাটের বিশেষায়িত হাসপাতাল বিআইটিআইডিতে ৩০ সিটের আইসোলেশন বেড, একই এলাকায় ফিল্ড হাসপাতালে ৫০ সিট ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩০ সিটের অবজারভেশন বেড রয়েছে। এসব বেড বর্তমানে ২১৯ করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

এছাড়া ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১৪টি ও বেসরকারিভাবে ১০ অ্যাম্বুলেন্স মিলে মোট ২৪টি অ্যাম্বুলেন্স জরুরি সেবা প্রদানের জন্য প্রস্তুত আছে। অপরদিকে চট্টগ্রাম মহানগরে ৭০টির মতো ছোট-বড় বেসরকারি হাসপাতাল আছে। আর এসব হাসপাতালে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য ১২১টি আইসইউ বেড রয়েছে, যদিও চাহিদার তুলনায় এসব বেডে আইসিইউ সুবিধা কম। এছাড়া নানা অজুহাতে অনেক রোগী সময়মতো আইসিইউ সুবিধা না পাওয়ায় মৃত্যুবরণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলায় গত রোববার ১১৮ জন, তার আগের দিন ২৭৯ জন, ২৯ মে ২২৪ জন এবং ২৮ মে ২২৯ জনকে আক্রান্ত পাওয়া গেছে। কিন্তু সরকারি চিকিৎসা সুবিধা বাড়েনি। অর্থাৎ শুরুতে যে ৩১৫টি বেড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা-ই আছে। অপরদিকে গত ৪ এপ্রিল এক সমন্বয় সভায় করোনা-আক্রান্ত রোগী বাড়লে চিকিৎসার জন্য ১২টি হাসপাতালের তালিকা করেছিলেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক। এছাড়া হলি ক্রিসেন্ট, ইম্পেরিয়ালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতাল চিকিৎসায় ব্যবহƒত হচ্ছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একটি বেডও বাড়েনি। বেসরকারি হাসপাতাল অধিগ্রহণও করা হয়নি।

এদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও আক্রান্তদের সেবা দিচ্ছে নারাজ। এর জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থাও নেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগ। মূলত চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতার কারণে এমনটা হচ্ছে বলে অনেকে জানিয়েছেন। যদিও আক্রান্তের তুলনায় চিকিৎসা বেড কম হওয়ায় দৃশ্যমান উপসর্গ না থাকলে রোগীকে বাড়িতে আইসোলেশনে রাখা হচ্ছে।

এদিকে গত ১৩ মে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতে তিনটি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধান অনুসারে লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু এ নির্দেশনার প্রয়োগও দেখা যায়নি।

করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়া বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালের সাবেক ডাক্তার ও মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল জানান, জেনারেল হাসপাতালে করোনা-আক্রান্ত রেগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে আমারও করোনা পজিটিভ আসে। তখন আমার সাবেক কর্মস্থল অর্থাৎ ম্যাক্স হাসপাতালের এমডি লিয়াকত আলী খানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। যখন তিনি শুনলেন করোনা পজিটিভ, তখন নিজের হাসপাতালে নিরলস শ্রম দেওয়া আমাকে ভর্তি তো করলেনই না, এমনকি দিলেন না অক্সিজেনের একটি সিলিন্ডারও। কী অমানবিক আচরণ! আমি তো তার সহকর্মী ছিলাম।

বেসরকারি চিকিৎসাসেবা দিতে কেন এত অপারগতাÑতা জানতে বেশ কয়েকবার বেসরকারি হাসপাতাল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ম্যাক্স হসপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাক্তার লিয়াকত আলীর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বী শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। হলি ক্রিসেন্টসহ কয়েক হাসপাতাল চালু করার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কভিড-১৯ আক্রান্ত এমন রোগী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে ২১৯ জন। পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আরও পাঁচটি আইসিইউ বেডসহ মোট ৩০০ বেড চালু করা হবে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে অনুমোদিত আইসিইউ সুবিধা আছে ১২১টি। তবে প্রকৃতপক্ষে কয়টি চালু আছে তা আমরা জানি না।

তিনি বলেন, আইসিইউ সংকটে কয়েক জন মারা গেছে, এটা ঠিক। তবে ভালো হওয়ার সংখ্যাও তো বেশি। এ সময় করোনা-আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরা তো সাড়া দিচ্ছেন নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। 

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ। আর প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় এর ঠিক ১০ দিন পর ৩ এপ্রিল। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৯৮৫ জন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..