দিনের খবর বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

চট্টগ্রামে খালাস হওয়া জাহাজের অর্ধেকই ক্লিংকারবাহী

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের আমদানি ও রপ্তানির প্রধান গেটওয়ে চট্টগ্রাম বন্দর। প্রধান এ সমুদ্রবন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে আমদানি পণ্যবাহী ৯০টি জাহাজ আছে। এসব সমুদ্রগামী জাহাজের মধ্যে ৬৫টি থেকে পণ্য খালাসের কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে ২৭টি হলো সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী জাহাজ। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সময়মতো জাহাজ না পাওয়ায় আসন্ন বর্ষাকে সামনে রেখে বিপুল পরিমাণে ক্লিংকার বন্দর দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, দেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ সম্পাদিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। গত ৮ এপ্রিল বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে অবস্থান করা আমদানি পণ্যবাহী ৯০টি জাহাজ ছিল। এর মধ্যে ৬৫টি জাহাজে পণ্য খালাস কার্যক্রম চলছে। আর খালাস হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ক্লিংকারবাহী জাহাজ। এ সময়ে ক্লিংকারবাহী ২৭টি জাহাজ থেকে ক্লিংকার খালাস করা হয়। এসব ক্লিংকার ছোট জাহাজে (লাইটার ভেসেল) করে দেশের ৩৭টি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানায় নেয়া হবে। এছাড়া এ সময়ে বন্দরের খালাস প্রক্রিয়ায় থাকা সাধারণ কার্গো ছিল ১৯টি, কনটেইনার জাহাজ ছিল সাতটি, খাদ্য পণ্যবাহী জাহাজ ছিল ছয়টি, তেলবাহী তিনটি ও চিনিবাহী তিনটি। এছাড়া বার্থ ও জেটি খালি না থাকায় পণ্যবাহী ২৫টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস হয়নি। পাশাপাশি আমদানি করা পণ্য নিয়ে আসা শতাধিক সমুদ্রগামী জাহাজ বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।  

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকাশিত একটি আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সিমেন্টের ক্লিংকার আমদানি করা হয়েছে এক কোটি ৪২ লাখ ৯ হাজার ৫৭২ মেট্রিক টন। একইভাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের এক কোটি ৬৯ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এক কোটি ৯৬ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ মেট্রিক টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দুই কোটি ১৪ লাখ ৯২ হাজার ১৬৩ মেট্রিক টন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দুই কোটি ৪৮ লাখ ২৬ হাজার ৬৯৯ মেট্রিক টন ক্লিংকার আমদানি করা হয়।

সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে, বর্তমানে দেশে ৩৭টি সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। করোনার কারণে গতবছর এ খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। এ খাতে গত ছয় বছরে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০১৬ সালে। ২০১৫ সালের তুলনায় সে বছর ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এরপর ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে সিমেন্ট বিক্রি বেড়েছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। সে বছর দেশে তিন কোটি ১৩ লাখ টন সিমেন্ট বিক্রি হয়। অর্থাৎ এক বছরে বাড়তি ৪৩ লাখ টন সিমেন্ট বিক্রি হয়েছিল। ২০২০ সাল বাদ দিলে এ খাতে বছরে গড়ে আট থেকে ১০ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর দেশে খনিজ সম্পদের ঘাটতি থাকায় সিমেন্ট মিলগুলো প্রয়োজনীয় ক্লিংকার, লাইমস্টোন জিপসাম, ফ্লাই অ্যাশ ও আয়রন সেøগ ইত্যাদি কাঁচামাল সরাসরি আমদানির ওপর নিভর্রশীল, যা প্রতিবেশী ভারত, চীন, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন থেকে আমদানি করা হয়, আর নদীপথে ক্লিংকার সিমেন্ট কারখানাগুলোয় নেয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে কয়লার দাম ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে টনপ্রতি ক্লিংকারের দাম বেড়েছে চার মার্কিন ডলার বা ৩৪০ টাকা। ফলে সব কোম্পানি সিমেন্টের দাম বাড়িয়েছে বা দাম সমন্বয় করেছে। গত মাসে বস্তাপ্রতি ৩০-৪০ টাকা দাম বেড়েছে।

এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, নির্মাণশিল্পের প্রধান উপকরণের মধ্যে পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় সিমেন্ট। করোনার শুরুতে এ খাত বিপর্যস্ত হয়েছে। তবে খুব দ্রুতই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসে খাতটি। গত বছরের শেষ ছয় মাসে ২০১৯ সালের তুলনায় সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। একইভাবে চলতি বছরেও এ ধারা অব্যাহত আছে, বিক্রিও বেড়েছে। বিশ্ববাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের দাম ও জাহাজভাড়া বাড়ায় আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সিমেন্ট খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকায় কাঁচামালের দাম বাড়লেও অন্য খরচ কমিয়ে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তারা বলেন, আসন্ন বাজেটে দেশে প্রস্তুত করা সিমেন্টের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হলে দ্বৈত কর সমন্বয় করা উচিত। এ ছাড়া আমদানি পর্যায়ে নির্ধারিত শুল্ক ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫০ টাকা নির্ধারণ করা দরকার। এতে সিমেন্ট বিক্রি বাড়লে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।

মোস্তফা গ্রুপ ও মোস্তফা হাকিম সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার আলম শেয়ার বিজকে বলেন, গত বছর করোনার কারণে সিমেন্টশিল্প অনেক চাপে পড়ে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিক্রি ৪০ শতাংশেরও বেশি কমে গিয়েছিল। ফলে আমদানিও কমেছিল। আর এখন নির্মাণ মৌসুম চলার কারণে চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জাহাজ সংকট এবং বিভিন্ন দেশে আবার লকডাউন শুরু হওয়ায় সবাই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য নিজ নিজ সক্ষমতা অনুসারে আমদানি বাড়িয়েছে। ফলে একসঙ্গে অনেক জাহাজ বন্দরে আসছে। তিনি আরও বলেন, গত সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে জাহাজ সংকট প্রকট থাকায় কেউ সিমেন্ট আমদানি করেনি। তাই এবার আগেই সবাই আমদানি করছে। 

উল্লেখ্য, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকারের টনপ্রতি মূল্য ৬০ ডলার, যা তিন মাস আগে ছিল ৪৪-৪৫ ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে টনপ্রতি মূল্য বেড়েছে ১৫-১৬ ডলার।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..