বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে ওয়াটার বাস সার্ভিস

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের বেশিরভাগ বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্য চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। বন্দর থেকে আমদানি ও রফতানিবাহী পণ্য পরিবহনে রয়েছে ছয় হাজারের অধিক ট্রাক ও ট্রেইলর। শহরের প্রধান সড়কের বিকল্প একাধিক সড়ক না থাকায় প্রায়ই বন্দরকেন্দ্রিক পণ্যবাহী যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে নগর। এতে বিমানবন্দরগামী যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার অফিসগামী মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। নগরবাসীর এসব ভোগান্তি কমাতে চালু হচ্ছে ওয়াটার বাস সেবা। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ওয়াটার বাস চালু করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের এ প্রধান বাণিজ্যিক শহরের আমদানি ও রফতানিবাহী কার্যক্রমে গতি বাড়াতে এবং যানজটমুক্ত নগর উপহার দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ওয়াটার বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয়। বিমানবন্দরগামী যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার অফিসগামী মানুষজনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলীতে ওয়াটার বাস চালু করছে। চলতি মাসেই শুরু করার লক্ষ্যে প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে সব ধরনের প্রস্তুতি।
ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু হলে নগরীর সদরঘাট থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘাট পর্যন্ত চলাচল করতে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট সময় লাগবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের লাগেজ সদরঘাটেই নিয়ে নেওয়া হবে। আর ঘাট থেকে শার্টল বাসে যাত্রীদের বিমানবন্দর টার্মিনালে পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে দুটি ওয়াটার বাস দিয়ে যাত্রী পারাপার শুরু হবে। বর্তমানে সড়কপথে পার হতে এখন কমপক্ষে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। আর যানজট হলে তো তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগে। আর এ ওয়াটার বাস সার্ভিস পরিচালনা করবে এসএস ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ওয়াটার বাসে সদরঘাট থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করেছে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মরত ও বিমানযাত্রীদের মতে, বাণিজ্যিক শহর হওয়ায় শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, চিকিৎসাসহ নানা কাজে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল করতে হয় দেশি-বিদেশি বিমানযাত্রীদের। কিন্তু যাওয়ার পথে নগরীর আগ্রাবাদের পর থেকে শুরু হওয়া এ যানজটে বারিক বিল্ডিং, নিমতলা, বন্দর, সল্টগোলা ক্রসিং এবং ইপিজেড থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত পুরো এলাকা স্থবির হয়ে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে মানুষ। হাজারো প্রাইম মুভার, কাভার্ডভ্যান ও ট্রাকের দখলে থাকে পুরো রাস্তা। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলে আসছে। শত শত গাড়ির ধকল সামলে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটিতে যান চলাচল কঠিন হয়ে উঠেছে। বারিক বিল্ডিং থেকে বিমানবন্দর পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা সময় লাগা অনেকটা প্রাত্যহিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে পরিস্থিতি আরও বেগতিক হয়ে ওঠে। মূলত বন্দরকেন্দ্রিক এই যানজটের কবলে পড়ে ফ্লাইট মিস করার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। এ যানজট এড়াতে শত শত যাত্রী এখন বিমানের পরিবর্তে রেল বা বাস ধরে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াত করতে শুরু করেছেন। শহর থেকে বিমানবন্দর গিয়ে ফ্লাইট ধরা রীতিমতো একটি অগ্নিপরীক্ষা।
বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, পতেঙ্গা এলাকায় বিমানবন্দর ছাড়াও রয়েছে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি, জ্বালানি তেল বিপণনকারী পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার প্রধান ডিপো, টিএসপি কমপ্লেক্স, সাইলো, ড্রাইডক, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল এবং বেসরকারি মালিকানায় একাধিক রিফাইনারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত প্রায় হাজারখানেক ব্যক্তির যাতায়াত করতে হয়। পাশাপাশি কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের নিয়মিত এ জট মোকাবিলা করেই গন্তব্যে যাতায়াত করতে হয়। এতে প্রতিদিন বিমানযাত্রী ও দর্শনার্থী মিলে আট হাজারের মতো মানুষের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী চরম ভোগান্তির শিকার হন। বিপুলসংখ্যক এসব মানুষকে নিত্য হয়রানি থেকে রক্ষা করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সদরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ বিষয়ে এসএস ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাবাব হোসেন বলেন, চলতি মাসেই ওয়াটার বাস চালু করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। এর মধ্যে সদরঘাট ও পতেঙ্গা এলাকায় পল্টুনসহ টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। শুরুতে দুটি ওয়াটার বাস দিয়ে এ সার্ভিস চালু হবে। পরে আরও দুটি বাস যুক্ত হবে। সাধারণ সড়কপথে সদরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত যেতে হয় ৩০ কিলোমিটার দুই ঘণ্টায়। আর ওয়াটার বাসে লাগবে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট। এছাড়া যাত্রীদের হাতব্যাগ ছাড়া অন্য সব লাগেজই আমরা বহন করব। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট অপারেটরের সঙ্গে আমাদের কাজ চলছে বুথ স্থাপন করার জন্য। তখন যাত্রীদের লাগেজ চেক ইন সদরঘাটেই সম্পন্ন করা হবে। যাত্রীরা ওয়াটার বাসে চড়ে পতেঙ্গা বিমানবন্দরের কাছে টার্মিনালে গিয়ে নামবেন এবং ৩০০ মিটার পথ শার্টল বাসে চড়ে বিমানবন্দর টার্মিনালে প্রবেশ করবেন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ শেয়ার বিজকে বলেন, যানজটের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য আমরা ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করতে যাচ্ছি। চলতি মাসেই ওয়াটার বাস চালু করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেওয়া হয়েছে। অল্প কিছু কাজ বাকি রয়েছে এবং কিছুদিনের মধ্যে পুরো কাজই শেষ হবে। শুরুতে দুইটি ভ্যাসেল দিয়ে সার্ভিস চালু করা হবে। যাত্রীদের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে ওয়াটার বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে। এছাড়া ফ্লাইটের সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে এ ওয়াটার বাস সার্ভিস চলবে।
উল্লেখ্য, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব চট্টগ্রাম ড্রাইডককে দেওয়া হয়। আর ড্রাইডক ওয়াটার বাস পরিচালনার জন্য চুক্তি করে এসএস ট্রেডিংয়ের সঙ্গে। আর প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে এ রুটে যাত্রী পরিবহন করবে।

সর্বশেষ..