বাণিজ্য সংবাদ

চট্টগ্রামে পাঁচ বছরে তিন শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ

 

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে ছোট-বড় ৯০০ গার্মেন্টের অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫০০টি কারখানা পুরোদমে উৎপাদনে রয়েছে। বিভিন্ন কারণে গত পাঁচ বছরে ৩০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পোশাক রফতানি খাতে চট্টগ্রামের বাজার অংশীদারিত্ব এখন মাত্র ১৪ শতাংশে নেমেছে।

তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের মতে, বিশ্বমন্দার সময় বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টরে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছিল। সেই সময় বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলো একে একে বিদেশি অর্ডার হারাতে থাকে। বন্ধ হতে থাকে অসংখ্য কারখানা। এরপর জিএসপি থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক উৎপাদক প্রতিষ্ঠাঠানগুলো। জিএসপি সুবিধা দেশের গার্মেন্ট সেক্টরের জন্য অনেক বড় ভূমিকা রাখতো। টাকার অঙ্গে এ সুবিধা খুব বেশি না হলেও ইমেজের দিক থেকে এর ভূমিকা ছিল অনেক। যা ক্রমে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পোশাক রফতানিকারক দেশে উন্নীত করে। জিএসপি সুবিধার পাশাপাশি কমপ্লায়েন্স ইস্যুও দেশের গার্মেন্ট খাতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, দুর্ঘটনা ঠেকানো এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও মজুরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমপ্লায়েন্সের দাবি তোলে। আমেরিকা ও ইউরোপের ক্রেতাদের সংগঠন অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স থেকে ছাড়পত্র না পেলে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোকে পোশাক তৈরির অর্ডার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে চট্টগ্রামে গত দুবছরের ৪০টিরও বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। আর গত পাঁচ বছরের চট্টগ্রামের আট শতাধিক কারখানার মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে তিন শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় চট্টগ্রামে তৈরি পোশাক রফতানি বহুলাংশে কমে গেছে। পাশাপাশি ব্যাংকের উচ্চ সুদ, জমি সংকট ও দক্ষ শ্রমিকের অভাবে চট্টগ্রামের গার্মেন্ট খাতের সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বর্তমানে চালু অধিকাংশ কারখানার অবস্থাও বেশ ভালো না। এরমধ্যে ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির বদলে পুরোনো অনেক অর্ডার ফেরত গেছে। এ সংকট জাতীয় রফতানিতেও প্রভাব ফেলছে। পাঁচ পোশাক রফতানি খাতে চট্টগ্রামের অংশীদারিত্ব ছিল ৩২ শতাংশ। এখন তা মাত্র ১৪ শতাংশে নেমেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিজিএমইএ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে নতুন কারখানা চালুর হারও কমছে। ২০১৪ সালে নতুন কারখানা হয়েছে ৮০টি। অথচ এর আগে ২০১৩ সালে ১৪০টি, ২০১২ সালে ২০০টি কারখানা চালু হয়েছিলো।

নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। তিনি অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের শর্ত পূরণ করা অধিকাংশ গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে এসব গার্মেন্ট মালিককে কারখানা কমপ্লায়েন্স করতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া কারখানা স্থানান্তরের মতো প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বন্দরের সুবিধা থাকায় যে কোনো ধরনের গার্মেন্ট কারখানা চালু এবং পণ্য রফতানিতে বিপুল অর্থ সাশ্রয়ের সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম অঞ্চলে গার্মেন্টস সেক্টরের বিকাশে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ করা দরকার।’

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি মঈন উদ্দিন আহামেদ মিন্টু শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে গার্মেন্ট কারখানা চালানো অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে প্রায় ১০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে একের পর এক কারখানা বন্ধ হলে রফতানি বাণিজ্যে আমাদের অংশীদারিত্ব সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসবে। তিনি গার্মেন্ট খাতের বিকাশে সরকারের সহায়তা কামনা করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাজোটেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।’

বিকেএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও স্ট্যান্ডিং কমিটি অন চিটাগং অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যান শওকত ওসমান এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে আরএমজি সেক্টরের অবস্থা ভালো না। বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশয় রয়েছে। সরকার এগিয়ে না এলে গার্মেন্ট সেক্টরে বিদ্যমান সমস্যা ঘুচবে না। স্বল্পমূল্যে বেজার মাধ্যমে জমি বরাদ্দ দেওয়া ব্যবস্থার পাশাপাশি গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার সময় এসেছে।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে ২০১১ সালে বিজিএমইএ’র তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৭৫টি। এর মধ্যে বর্তমানে উৎপাদনে আছে ৪০০টি। আর বাকি ২৭৫টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ। অপরদিকে বিকেএমইএ তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১২৫টি। এরমধ্যে উৎপাদনে আছে শতাধিক প্রতিষ্ঠান। আর ২৫টির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। বিজিএমইএ’র পরিসংখ্যান মতে, ২০০৮ সালে দেশে পোশাক কারখানা ছিল পাঁচ হাজার ৬০৮টি। যা সর্বশেষ মাত্র তিন হাজার ১১০টিতে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দুই হাজার ৪৯৮টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৫ সালেই ২২০টি নিটওয়্যার কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

 

সর্বশেষ..