দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

চট্টগ্রামে পাঁচ বছরে নিবন্ধন মাত্র ৫৭ কোটি টাকার

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: এক সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম ছিল বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান জায়গা। এ শহরের ভৌগোলিক, বন্দর, জমি ও অবকাঠামোগত সুযোগ থাকায় ১২টি বহুজাতিক কোম্পানি বিনিয়োগ করেছিল। পরে নানা জটিলতায় বিদেশি কোম্পানিগুলো সম্প্রসারণের পরিবর্তে ‘সংকোচন নীতি’ গ্রহণ করে। ফলে কমতে থাকে বিদেশি বিনিয়োগ। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে মাত্র ৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চল অনেকটা বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণহীন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, সদ্য বিদায়ী ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্প, বাণিজ্য ও ট্রেডিং ব্যবসায় শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য চার বাণিজ্যিক প্রকল্পের বিপরীতে বিনিয়োগ নিবন্ধন নেওয়া হয় ২১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে ৯৮৯ জনের। যেখানে ২০১৮ সালে চার প্রকল্পের বিপরীতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন নেওয়া হয়েছিল ২৩ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থান হয় ২৭৫ জনের। অর্থাৎ, বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে এক কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

একইভাবে ২০১৭ সালে দুই বিনিয়োগ প্রকল্পের বিপরীতে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়। এতে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ছিল ২৫৯ জন। আর ২০১৬ সালে দুই প্রকল্পে দুই কোটি টাকা বিনিয়োগে আগ্রহ ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীর। ২০১৫ সালে চট্টগ্রামে বিনিয়োগ করার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল না। অথচ দেশের প্রধানতম বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রাম। বাড়ানো হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা, গড়ে তোলা হচ্ছে একাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল, নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত হচ্ছে টানেল, বাড়ানো হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। গত পাঁচ বছর ছিল না কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গোলযোগ। এত সম্ভাবনার পরও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল খুবই কম।

জানা যায়, ভারতের স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে কারখানা গড়ে তোলে। বার্জার পেইন্টস কোম্পানি ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ব্যবসা শুরু করে। আর ২০০৩ সালে বার্জার পেইন্টস তাদের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়। ওষুধ ও রসায়ন খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজার ও গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন এবং হাইডেলবার্গ সিমেন্ট চট্টগ্রামে কারখানা স্থাপন করে। এর মধ্যে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের ওষুধ কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। ভোগ্যপণ্য ও ভ্যাকসিন ব্যবসা পরিচালনাকারী কোম্পানিটি ১৯৬৩ সালে ফৌজদারহাট শিল্প এলাকায় কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এদিকে জমি পেয়ে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ পুরোদমে কাজে লাগাতে পারেনি। অথচ ১৯৯৪-৯৫ সালে বাংলাদেশ-কোরিয়ার দু’দশকের সম্পর্ক উভয় দেশের সরকারপ্রধানদের দ্বিপক্ষীয় সফরে নতুন দিগন্ত দেখছে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ঢাকা-সিউল যৌথ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রস্তাব উঠল কোরিয়ান মালিকানায় একটি বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে এলো এ দেশের পোশাকশিল্পে অগ্রযাত্রার দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ইয়ংওয়ান করপোরেশন। যদিও নানা সমস্যায় স্যামসাংয়ের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ফেরত যায়। এরপর আর কোনো বড় বিনিয়োগ হয়নি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সচিব মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ শেয়ার বিজকে বলেন, ৮০’র দশকের পর চট্টগ্রাম ছিল বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা। তখন শিল্পের জন্য জমি ছিল, দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন, বন্দরসহ সব ধরনের সেবা ছিল এবং নগরায়ণ ছিল কম। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেন। আর এখন শিল্পের জন্য জমি সংকট, জমির উচ্চমূল্য, নগরবাসীর সংখ্যা বেড়েছে, কমেছে সেবা প্রদানকারী সংস্থার সক্ষমতা। এখনও গ্যাস সংকট ও অবকাঠামোগত সংকট আছে। এছাড়া বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারগুলো আছে বেকায়দায়। পাশাপাশি লগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোসহ নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতাও আছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বন্দরসহ গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে কাজ করছে। এতে আবার চট্টগ্রাম আগের মতো বিনিয়োগ আকর্ষণে শীর্ষস্থানে থাকবে।      

এ বিষয়ে চিটাগং কসমোপলিটন জুনিয়র চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, গত পাঁচ বছরে বিদেশি বিনিয়োগ মাত্র ৫৭ কোটি টাকা। এটি অপ্রত্যাশিত। এত উন্নয়ন প্রকল্প চলমান হওয়ার পর যদি বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে সরকারের উচিত সঠিক কারণ খুঁজে বের করা। আর বিদেশিদের বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, ট্রেড শো ও আমাদের দূতাবাসগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, এটা ঠিক, সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। তবে তা সাময়িক সমস্যা। আর এসব উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করবেন। তখন আশা করি বিনিয়োগ বাড়বে।   

উল্লেখ্য, সদ্যবিদায়ী ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্প, বাণিজ্য ও ট্রেডিং ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ছয় হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে কমেছে এক হাজার ১৪৪ কোটি টাকা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..