বাণিজ্য সংবাদ

চট্টগ্রামে শিল্প-বাণিজ্যের উন্নয়নে মানসম্পন্ন গবেষণা প্রয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে আছে প্রকৃতি সৃষ্ট দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। আছে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি। আগামীর ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে মহেশখালীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনাল। পাশাপাশি আছে সস্তা শ্রমের বিপুল বাজার। আর সব মিলে আগামী দশকের বিনিয়োগের জন্য আদর্শ কেন্দ্র হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের উদাসীনতা, কাক্সিক্ষত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাসহ বিভন্ন কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের জন্য গবেষণার প্রয়োজন। গতকাল শনিবার সকালে নগরীর এক হোটেলে আয়োজিত চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা, সমস্যা ও সমাধান শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল ও স্থানীয় পত্রিকা আজাদী যৌথভাবে এ গোলটেবিল অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে। ওই আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতা ও সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের কাছে অবস্থানগত সুবিধা, বন্দর সুবিধা, যোগাযোগ সুবিধা, সস্তা শ্রমবাজারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার কারণে চট্টগ্রাম এখন বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু ব্যাংক-বিমা সুবিধা নেওয়ার জন্য আমাদের ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অনেক বেশি ভোগান্তির শিখার হতে হচ্ছে। পাশাপাশি যোগাযোগ ছাড়া তো কোনো কিছু কল্পনা করা যায় না। ফলে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্প এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

চসিকের সাবেক মেয়র ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের সভাপতি মাহমুদুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামে গত কয়েক দশকে তেমন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। কারণ অর্থ ও নাতি উভয়ে ঢাকামুখী। আর আমাদের নেতৃত্বও ঢাকামুখী। ফলে দীর্ঘদিনের নীতি-নির্ধারকদের উদাসীনতার কারণে আজ চট্টগ্রাম শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি মঈন উদ্দিন আহামেদ মিন্টু বলেন, চট্টগ্রামে গার্মেন্ট কারখানা চালানো অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে। গত দু’বছরের প্রায় ১০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে একের পর এক কারখানা বন্ধ হলে রফতানি বাণিজ্যে আমাদের অংশীদারিত্ব সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসবে। তিনি গার্মেন্ট খাতের বিকাশে সরকারের সহায়তা কামনা করেন। চট্টগ্রামের গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে বিরাজিত এ সংকটের মধ্যে জাতীয় রফতানিতেও প্রভাব ফেলছে। পাঁচ পোশাক রফতানি খাতে চট্টগ্রামের অংশীদারিত্ব ছিল ৩২ শতাংশ। এখন তা ঠেকেছে মাত্র ১৪ শতাংশে। বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাজোটেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

একই আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে সদস্য জাফর আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর খুব দ্রুততার সঙ্গে বে-টার্মিনাল নির্মাণ করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা দ্রুত শেষ হবে। আর কর্ণফুলী ড্রেজিং নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত। কারণ বন্দর সরাসরি কর্ণফুলির সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি কিছুদিন আগে নগরীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে বেসরকারি অফডকগুলো সরানোর জন্য সিদ্ধান্ত নেয়।

ব্যবসায়ী এসএম আবু তৈয়ব বলেন, চট্টগ্রামে শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা, সমাধান ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করার জন্য একটা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা করা দরকার। এর জন্য আমরা চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অর্থায়ন করতে পারি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণগুলোতে সমন্বয় করেও সরকার এ ব্যাপারে কাজ করতে পারে।

অংশগ্রহণকারী অন্য বক্তারা বলেন, অতীতে দেশের সব বড় বড় শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়েছে চট্টগ্রামে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেছিল এখানে। কিন্তু সব সুযোগ-সুবিধা রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় তারা এখান থেকে প্রধান কার্যালয় গুটিয়ে নিয়ে গেছে। এখনও চট্টগ্রাম অঞ্চল তৈরি পোশাক, রাসায়নিক, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেলিযোগাযোগ, কৃষিনির্ভর শিল্প কারখানা, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, টেলিভিশন, মনিটর, চিকিৎসা ও অপারেশনের যন্ত্র, প্লাস্টিক, আইটি ও আইটি সম্পর্কিত শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য আদর্শ স্থান। এর জন্য বিনিয়োগে আগ্রহী চীন, জাপান, ভারত, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ। এসব শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে এক লাখের বেশি মানুষের। কিন্তু সঠিক নেতৃত্ব ও সহায়ক পরিবেশ না থাকায় সম্ভাবনার পুরোটাই অব্যবহƒত থেকে যাচ্ছে।

সর্বশেষ..