দিনের খবর সারা বাংলা

চট্টগ্রামে সংকুচিত হচ্ছে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশবাসী করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কে দিনপার করছে। সর্বক্ষেত্রে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী মনে করেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদানে অনীহা প্রকাশ করছে বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসক। নিরাপত্তার অজুহাতে বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরাসরি এড়িয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ  জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত সাধারণ মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম মহানগর। এ শহরে ৭০ লাখ নাগরিকের বসবাস। এসব নাগরিকের জন্য সরকারি হাসপাতাল আছে হাতেগোনা কয়েকটি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচালিত কয়েকটি হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১০টি বেসরকারি হাসপাতাল আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী সন্দেহে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদানে অনীহা প্রকাশ করছে। আবার বেসরকারি হাসপাতালগুলো ও চেম্বারের ব্যক্তিগত সেবাপ্রদানকারী চিকিৎসক সরাসরি সেবা প্রদান এড়িয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের লায়ন দাতব্য চক্ষু হাসপাতাল, শেভরন আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রুটিন চিকিৎসা ও অপারেশন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এদিকে হাসপাতাল মালিকদের পরিচিত ও  ভিআইপি রোগীদের ছাড়া কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। বেশিরভাগ সেবাপ্রাপ্তিদের হাসপাতালের গেট থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এদিকে ঋতু পরিবর্তনের কারণে সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশির রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে অজানা আতঙ্কে অনীহা প্রকাশ করছেন চিকিৎসকরা। অনেকে ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধের নোটিসও দিয়েছেন।

গতকাল নগরের জিইসি এলাকার বেসরকারি রয়েল হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেডের আইসিইউ-এইচডিইউ ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক নুরুল আমিন বলেন, করোনাভাইরাস সন্দেহে আমাদের হাসপাতালের আইসিইউ (ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট) ও এইচডিইউ (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে) ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর যে চিকিৎসককে ওই রোগীকে সেবা দিয়েছেন তাকেও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। তবে তিনি করোনায় আক্রান্ত কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

জনৈক রোগীর স্বজন শিক্ষিকা সালমা আবেদিন শেয়ার বিজকে বলেন, গত তিনদিন ধরে চট্টগ্রামের পলি ক্লিনিক হাসপাতালের ডাক্তাররা জ্বর, সর্দি ও কাশির রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে না।  

গত সোমবার অ্যাপসের মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, করোনাভাইরাসে নতুন করে চিকিৎসকসহ আরও ছয়জন আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে একজন চিকিৎসক ও দুজন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। নতুন ছয়জনকে নিয়ে বাংলাদেশে মোট ৩৩ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যাদের মধ্যে মোট পাঁচজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আর আক্রান্তদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হওয়ায় দেশে কভিড-১৯-এ তিনজনের মৃত্যুর খবর এ পর্যন্ত নিশ্চিত করেছে আইইডিসিআর।

বেসরকারি হাসপাতালের কর্মরত একাধিক চিকিৎসক বলেন, চট্টগ্রামে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পার্সোনাল প্রোটেকশন ইক্যুইপমেন্ট-পিপিই) পর্যাপ্ত নেই। আমরা নিজেরাই তো চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছি। তবে জ্বর বা সর্দি হলেই চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বাতায়ন বা ফোনে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ আছে।

বেসরকারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন বলেন, চিকিৎসকরা কেন নিজের সুরক্ষার জন্য বিনিয়োগ করছেন না? ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ কিনার সামর্থ্য ডাক্তারদের নেইÑএটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ঢালাওভাবে চেম্বার বন্ধ রাখার ঘোষণা, অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সরকারের ওপর দোষারোপ পেশার প্রতি অসম্মান। সাপোর্টিং স্টাফদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা নিয়েও ডাক্তাররা কিছু বলছেন না। আমরা সম্মিলিত চেষ্টা চাই, দায়িত্ব কর্তব্যে নিষ্ঠা চাই। যেহেতু এটা মহান পেশা সেহেতু কিছু মহত্ত্ব দেখাতে হবে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক একরামুল হক তার ফেসবুকে পোস্টে লিখেছেন, ভিটামিন-সি ভাইরাস ঠেকাতে অনেক কার্যকর। কমলা-লেবুতে প্রচুর ভিটামিন-সি পাওয়া যায়। পাইকারি বাজারে লেবুর ডজন ২৫০ টাকা পার হয়েছে। দেশের অন্যতম ওষুধের বড় পাইকারি বাজারের অনেক দোকান ঘুরে ভিটামিন-সি (সিভিট) ট্যাবলেট পাইনি। ইনহেলারসহ প্রয়োজনীয় ওষুধেরও সংকট প্রকট।

নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক চট্টগ্রামের বড় একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের চারপাশে অনেক বিদেশফেরত রোগী আছেন তারা তাদের রোগ ও পরিচয় গোপন রেখে চিকিৎসা গ্রহণে আসছেন। এতে কয়েকজন ডাক্তার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারদের সুরক্ষা উপকরণের অভাব আছে। এছাড়া কোনো হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী আছেন বলে প্রচার পায়, তবে পুরো হাসপাতালের ব্যবসা মন্দায় পড়বে। ফলে সব মিলিয়ে নিরাপত্তার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তবে এটা সাময়িক সিদ্ধান্ত। এতে আতঙ্কিত হওয়া কিছু নেই। কোনো সিরিয়াস (প্রকট) রোগীরা সবগুলো হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নতুন করে আর কেউ কোয়ারেন্টাইনে যাননি, আইসোলেশন বেডেও কেউ নেই। কিট হয়তো কালকে (গতকাল বুধবার) চলে আসবে। পিপিই কিছু আছে আমাদের। আর প্রতি সপ্তাহে কিছু কিছু আসছে। আমরা নিজেরাও তৈরি করছি হাসপাতালে। আমরা বারবার বলছি, সর্দি, কাশি হলে সরকারি হাসপাতালে আসবেন। সর্দি-কাশি নিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়ার দরকার নেই। সরকারি হাসপাতালে আলাদা ফ্লু কর্নার করা হয়েছে। নর্মাল সর্দি ও কাঁশি হলে হাসপাতালেই যাওয়ার দরকার নেই। যেখানে লোক সমাগম, সেখানে করোনাভাইরাস। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কী করা যায়, এ বিষয়ে বিএমএ নেতাদের সঙ্গে বসবেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার। এছাড়া আমরা বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে দুটি করে আইসিইউ বেড চাচ্ছি।

প্রসঙ্গত, সরকারি হিসেবে চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত কোনো করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয়নি। আর জ্বর, শর্দি ও কাশির জন্য চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ইনফেকটেডডিজিস হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল এবং বন্দর হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরকারিভাবে ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসকে (বিআইটিআইডি) প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..