বাণিজ্য সংবাদ

চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে চার মাসে ১৮২ মামলা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে প্রতিনিয়তই বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। খেলাপি কমাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন উদ্যোগেও কমছে না ঋণখেলাপির সংখ্যা। প্রতি মাসে খেলাপি তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। এসব ঋণ আদায়ে গত চার মাসে (জুন-সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে ৩০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ১৮২ মামলা করে। এসব মামলার বিপরীতে পাওনার পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৬৬৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। যা চলতি বছরের প্রথম চার মাসের দ্বিগুণেরও বেশি।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ভারী শিল্পায়নকালে সবচেয়ে বেশি শিল্প-কারখানা, ট্রেডিং ব্যবসা, পোশাক কারখানা, তেল ও চিনি রিফাইনারি, জাহাজ ভাঙা শিল্প প্রভৃতি গড়ে ওঠে চট্টগ্রামে। এসব খাতের ব্যবসায়ীরা নেতৃত্ব দিতেন শিল্প-বাণিজ্যের সর্বক্ষেত্রে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নেতৃত্বের অদক্ষতায়, অদূরদর্শী, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক সংস্কৃতির অভাব ও অর্থ ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে ব্যবসায় পিছিয়ে পড়তে হয়। এতে সংকুচিত হয় ব্যবসাক্ষেত্র। এসব উদ্যোক্তার নগদ অর্থ প্রবাহের কারণে বন্ধ হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফলে প্রতি মাসে খেলাপি তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। এতে পাওনা আদায়ে বেড়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলার সংখ্যাও। গত জুন থেকে সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে ৩০ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ১৮২ মামলা করে। বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৬৬৮ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৪৩ টাকা।
এর মধ্যে জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৪৯ কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার ৫১ টাকা। জুলাইয়ে ৯৫৭ কোটি ৬৭ লাখ ৮৮ হাজার ৮৪৯ টাকা, আগস্টে ৩০ কোটি ১৪ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ১৩০ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার ৬১৫ টাকা। যা চলতি বছরের প্রথম চার মাসের দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থাৎ জানুয়ারি-এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৬৭ কোটি ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫৮ টাকা। আর এসব ঋণ আদায়ে ১৪৪ মামলা করা হয়।
জানা যায়, গত চার মাসে ১৮২ মামলার মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা করে ব্র্যাক ব্যাংক। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ৫৭ মামলা করে। অপরদিকে ইস্টার্ন ব্যাংক ৩৮ মামলা করে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। অপরদিকে জনতা, উত্তরা, ট্রাস্ট ও আইএফআইসি ব্যাংকসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৮৭ মামলা করে। এসব মামলায় বড় খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল গুঁড়োদুধ আমদানির বড় প্রতিষ্ঠান চিটাগং সিন্ডিকেট, সান ডেইরি অ্যান্ড এগ্রো প্রোডাক্টস, মমতা ডেইরি অ্যান্ড ফুডস, ম্যারিন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, নুরজাহান সুপার অয়েল লিমিটেড, আহমেদ ট্রেডার্স, মাওলানা অ্যান্ড সন্স, জাসমির সুপার অয়েল লিমিটেড, সানোয়ারা ডেইরি ফুডস লিমিটেড, গোল্ডেন হরাইজন, আম্বিয়া স্টিল রি-রোলিং মিলস, জেসি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড প্রভৃতি।
জানা যায়, ভোজ্যতেল আমদানিকারক, আবাসন নির্মাতা, পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান ও জাহাজ ভাঙা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের পাইকারি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়ে পড়ে। এসব খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেও মিলছে না ঋণ ফেরত পাওয়ার প্রয়োজনীয় আশ্বাস। আবার অনেক ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা শীর্ষ কর্মকর্তারাও সরাসরি দেখা দিচ্ছেন না ব্যাংক কর্মকর্তাদের।
এছাড়া গত ৯ মাসে সাউথইস্ট, ন্যাশনাল, ট্রাস্ট, যমুনা, ইস্টার্ন, শাহ্জালাল ইসলামী, ওয়ান ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের বন্ধকি সম্পদ নিলামে বিক্রির জন্য ৪০টির অধিক নিলাম অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কিন্তু এসব নিলামে পায়নি কোনো আগ্রহী ক্রেতা বা প্রতিষ্ঠান। ফলে সব মিলিয়ে বিপাকে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকরা।
ব্যবসায়ীরা জানান, অত্যধিক ব্যাংকঋণের সুদ, ব্যবসায়িক অদক্ষতা, টানা লোকসান, ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যর্থতায় নতুনভাবে ঋণ না পাওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এমন অবস্থা। আর উত্তরণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি পরিশোধের সুযোগের পাশাপাশি নতুনভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে গুণগত মান, সঠিক ব্যবসায়ী যাচাই, এক খাতে একাধিক ব্যবসায়ীকে ঋণ না দেওয়া, রফতানি ও উৎপাদন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রভৃতি বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া নতুন ব্যাংকের নিবন্ধন না দেওয়াসহ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ঋণ গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড, আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহজামান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অফিসে গিয়েও ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের দেখা মিলছে না। আর ফোনে তো পাওয়াই যায় না। এক্ষেতে কয়েকবার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিস দেওয়া হলেও কোনো সাড়া মিলছে না। এছাড়া গত কয়েক বছরে কিছু ব্যবসায়ীর আত্মগোপনে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে মামলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ আদায়ে ৩৭২ মামলা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। এছাড়া ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণের দায়ে ৫৯৯ মামলা করা হয়।

সর্বশেষ..