দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কাছে বন্দরের পাওনা সাড়ে ৮৬ কোটি টাকা

নিলামে বিক্রীত পণ্যের অর্থ

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: বিভিন্ন সময়ে নিলামে পণ্য বিক্রি করলেও চট্টগ্রাম বন্দরের হিস্যা পরিশোধে গড়িমসি করছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। নিলামে বিক্রয়লব্ধ অর্থের ওপর ১৫ ও ২০ শতাংশ হারে এ বকেয়া হিস্যা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮৬ কোটি টাকা। এসব পাওনা আদায়ে বছরের পর বছর কাস্টমসকে চিঠি দিয়েও কোনো সাড়া পাচ্ছে না চট্টগ্রাম বন্দর।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত নিলামে বিক্রীত পণ্যের অর্থের ওপর ২০ শতাংশ হারে চট্টগ্রাম বন্দরের চট্টগ্রাম কাস্টমসের কাছে ৮৬ কোটি ৫৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। এসব পাওনা আদায়ে চট্টগ্রাম বন্দর প্রতি মাসে একটি করে চিঠি দিয়ে আসছে কাস্টমসসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)।

জানা যায়, হিস্যা আদায়ে ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ২২ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭৪টা চিঠি দিয়েছে কাস্টমসকে, যদিও নিলামে বিক্রীত পণ্য ডেলিভারির ১০ দিনের মধ্যে বন্দরের হিস্যা পরিশোধের বিধান রয়েছে। কিন্তু এ আদেশ যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না চট্টগ্রাম কাস্টমস। তবে ২০১১ সালে তিন কোটি ও ২০১৪ সালের শুরুতে কাস্টমস চট্টগ্রাম বন্দরকে এক কোটি টাকার অধিক হিস্যা পরিশোধ করেছিল। মূলত তার পর থেকে আর হিস্যা পরিশোধ করেনি কাস্টমস। তবে বকেয়া টাকার মধ্যে ২০১৪ সালের আগের বকেয়াও রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কর্মকর্তারা বলেন, ২০১৩ সালের ৬ জানুয়ারি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের চেয়ারম্যান ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের উপস্থিতিতে চবক বোর্ড রুমে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত মোতাবেক মালামাল নিলাম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চবক কর্তৃপক্ষ কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে হিস্যা বিল প্রদান করে আসছে। কিন্তু বন্দরের হিস্যা বিল কাস্টমস পরিশোধ করছে না। এতে পাওনার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাস্টমস বলছে, এই খাতে কাস্টমসে কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। ফলে নিলামের পাওনা হিস্যা বন্দরকে পরিশোধ করতে পরছে না কাস্টমস।

চট্টগ্রাম বন্দরের পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রীর সভাপতিত্বে চবক বোর্ড রুমে অনুষ্ঠিত সভায় নিলামে প্রাপ্য হিস্যা আদায়ে পরবর্তী বাজেটে একটা খাত সৃষ্টি করে হিস্যা পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারপর দুই অর্থবছর শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু কাস্টমস এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এছাড়া একই বছরের ৬ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে সিদ্ধান্ত হয়, এনবিআর নিলামে বিক্রীত পণ্যে হিস্যা বাবদ অর্থ নিলাম ডাককারী জমা প্রদানের জন্য কাস্টমস ও চবকের নামে পৃথক দুটি কোড সৃজন করবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটিও বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু জানে না চবক। ফলে এই সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়িত না হওয়ায় হিস্যা পরিশোধের বিষয়টি অমীমাংসিত থেকেই যাচ্ছে। এতে বন্দরের পাওনার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ বিষয়ে চবকের পরিচালক ট্রাফিক এনামুল করিম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অনেক বছর ধরে কাস্টমস নিলামের হিস্যা চট্টগ্রাম বন্দরকে পরিশোধ করছে না। যদিও চবক কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে কাস্টমসসহ এনবিআরকে হিস্যা পরিশোধের জন্য চিঠি দিয়ে আসছে। কিন্তু কাস্টমস পাওনা টাকা পরিশোধ করছে না। এর আগে ২০১১ ও ২০১৪ সালে কিছু টাকা পরিশোধ করেছিল কাস্টমস। তার পর থেকে আর টাকা পাওয়া যায়নি।’

এদিকে হিস্যা পরিশোধ না করার বিষয়ে জানতে নিলাম শাখার দায়িত্বে থাকা উপকমিশনার ফরিদ আল মামুন শেয়ার বিজকে জানা, ‘আসলে হিস্যা পরিশোধ করা হচ্ছে না, ঠিক এমন নয়। দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, একটির টাকা অন্যটিতে যাবে এমন। এ বিষয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ একটা মিটিং হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে মিটিংটি হয়নি। আর বন্দর মোট বিক্রয়লব্ধ অর্থের ওপর ২০ শতাংশ বলছে, তাও ঠিক নয়। কনটেইনার হলে ১৫ শতাংশ আর কনটেইনারের বাইরে অন্য পণ্য হলে ২০ শতাংশ হারে হিস্যা ধরা হয়।’

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে আরও জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য, ধ্বংসযোগ্য ও বিস্ফোরক জাতীয় পণ্যে নিলাম ও ধ্বংসকার্য দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে প্রতি মাসে পত্রের মাধ্যমে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বিপুল পরিমাণ অখালাসকৃত মালামাল প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিলাম/ধ্বংস করার জন্য দালিলিকভাবে কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হলেও কায়িকভাবে তা বন্দর ইয়ার্ডে/শেডের অভ্যন্তরে থেকে যায়। এর ফলে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বর্তমানে বন্দরের অভ্যন্তরে ৯৭ হাজার ৫৫২ মেট্রিক টন নিলামযোগ্য পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮২টি গাড়ি, ২০ ফিট এলসিএল কনটেইনার, দুই হাজার ৩৭৯ টিইউস, ৪০ ফিট এলসিএল কনটেইনার, পাঁচ হাজার ৩২৬ টিইউস, এলসিএল কার্গো ৭৩ হাজার ১৫২ প্যাকেজ ও বাল্ক কার্গো পাঁচ হাজার ৩৪৮ প্যাকেজ।

উল্লেখ্য, এসব মালামালের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ বছরের পুরোনো নিলামযোগ্য পণ্য/কনটেইনার ও গাড়ি রয়েছে। এসব মালামাল দীর্ঘদিন নিলামের অপেক্ষায় পড়ে থাকায় নষ্ট ও বাণিজ্যিকভাবে মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। এতে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি হচ্ছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..