প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চট্টগ্রাম জেলা অর্থনৈতিক শুমারি-২০১৩ জ্বালানি সুবিধার আওতায় নেই ৭২% উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান

 

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বন্দর শহর চট্টগ্রামে কুটির শিল্প হতে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত উৎপাদন খাতে মোট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আছে ৫৮ হাজার ৬২০টি। এর মধ্যে জ্বালানি সুবিধা ব্যবহার করে মাত্র ১৬ হাজার ৫২২টি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ ৪২ হাজার ৯৮টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানিনির্ভর না, যা শতাংশ হিসেবে জ্বালানি সুবিধা গ্রহণ করে মাত্র ২৮% এবং জ্বালানি সুবিধা গ্রহণ করে না ৭২ শতাংশ

এ শুমারিতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় ২০১৩ পর্যন্ত উৎপাদন খাতে কুটির শিল্প, ছোট শিল্প, মাঝারি শিল্প ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৬২০টি। এর মধ্যে কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫১ হাজার ১৯২টি। ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৬২৫টি, মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক হাজার ১৪৩টি এবং বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৭৪টি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জ্বালানি সুবিধা ব্যবহার করে ১৬ হাজার ৫২২টি। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে আছে বিদ্যুৎ, সেলার, কাঠ, কয়লা, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম। অন্যদিকে  ৪২ হাজার ৯৮টি প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের জ্বালানি সুবিধা গ্রহণ করে না।

চট্টগ্রাম জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎপাদন  খাতের মধ্যে ১০ হাজার ৪৫৩টি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহƒত হয় বিদ্যুৎ, যা ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পাশাপাশি এক হাজার ৭৮৮টি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি হিসেবে সোলার ব্যবহার করে। এক হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করে। এক হাজার ৫৯৬টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করে। মাত্র ৭২৪টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে। এ জ্বালানি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিভাগ চট্টগ্রাম শহরের অবস্থান করছে। আর তার চেয়ে কম মাত্র ৩৪৬টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি হিসেবে পেট্রোলিয়াম ব্যবহার করে।

চট্টগ্রাম বন্দরে অন্যান্য খাতের তুলনায় উৎপাদনমুখী খাতের হার বেশি বাড়েনি। অর্থনৈতিক শুমারিতে উৎপাদনমুখী খাতের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনমুখী খাতের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আবার ৭৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান গ্রামে। শহরে (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা সদর) এ খাতের প্রতিষ্ঠানের হার ২৭ শতাংশ। উৎপাদনমুখী খাতের ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই কুটিরশিল্প, যেগুলোর স্থায়ী সম্পদ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। চট্টগ্রামে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৭৪টি। পাশাপাশি বাড়ছে পাইকারি ও খুচরা পণ্য বেচাকেনায় এ অঞ্চলের মানুয়ের অংশগ্রহণ।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বলেন, শিল্প-বাণিজ্যের জন্য আর্দশ স্থান হলেও চট্টগ্রামে জমির স্বপ্লতা ও জমির দাম অধিক, গ্যাস সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদসহ নানান কারণে থমকে গেছে চট্টগ্রামে শিল্প-বিনিয়োগ। সম্ভাবনার পুরোটায় বিকশিত হতে পারছে না। ফলে বিনিয়োগকারীরা চট্টগ্রামের পরিবর্তে দেশের অন্যান্য জেলায় শিল্প স্থাপন করছে কিংবা আগ্রহী হচ্ছে। চট্টগ্রামে বৃহৎ উৎপাদনশীল শিল্পে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে আছে কেবল গ্যাস না পাওয়ায়। চট্টগ্রামে শিল্পে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে অনেক কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো জ্বালানি সংকট। চিটাগং চেম্বার অব কর্মাস ইন্ডাস্ট্রিসের সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শত শত প্রতিষ্ঠান শুধু গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না। চট্টগ্রামের ৪০০ ঘনফুটের চাহিদা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২২০ ঘনফুট। ফলে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস নিয়ে চট্টগ্রামে শিল্প, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক গ্রাহকদের ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি।

এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান শওকত ওসমান শেয়ার বিজকে বলেন, চট্টগ্রামে বিনিয়োগকে সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত করেছে গ্যাস সংকট। এখানকার ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও কোনো উদ্যোগ নেই তা নিরসনে। ফলে এখানকার বিনিয়োগকারীরা প্রধানত জ্বালানি সংকটে বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন ঢাকা, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকায়। তিনি আরও বলেন, যে শুধু যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখানে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, তা নয়। এখানে স্বল্প দামে জমি নেই। এটাও অন্যতম সমস্যা। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করে এমন সহায়ক উপাদানগুলো বেশরভাগই অনুপস্থিত।

খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের মহেশখালীতে এনার্জি হাবে পরিণত করতে যাচ্ছে। এ দ্বীপে লক্ষাধিক কোটি টাকার দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ হবে। এরই মধ্যে এ দ্বীপকে কেন্দ্র করে ১০ থেকে ১৫টি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যেগুলো আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে বাস্তবায়নের কথা। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি এলএনজি টার্মিনাল ও চারটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল। এছাড়া সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি তেল পরিবহনে করা হচ্ছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল। কয়লা খালাসের জন্যও বড় টার্মিনাল হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন, রাস্তাঘাট, আবাসনসহ নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে সরকার।