প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহনে বাড়লো ট্রাক ভাড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: দেশের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের ৮২ শতাংশই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বন্দরে খালাসকৃত এসব পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক ভাড়া বেড়েছে গড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। এর আগে লাইটার ভেসেল ভাড়াও বাড়ানো হয়েছিল। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে আমদানিকারকদের। ফলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।

চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্যের ৭০ শতাংশ খালাস হয় লাইটার জাহাজের সাহায্যে। আর নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলেডব্লিউটিসি’র আওতাধীন ৪৫০ জন মালিকের ৭৫০টি লাইটার জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে করে চট্টগ্রাম থেকে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহন করা হয়। জাহাজ ভাড়া টনপ্রতি সর্বনি¤œ ৫৭ থেকে সর্বোচ্চ ১৩৩ টাকা বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হয় গত পহেলা জানুয়ারি হতে।

এবার তিন ক্যাটগারিতে চট্টগ্রাম জেলার মোট ৭৩টি রুটে নতুন করে পণ্য পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক মালিক ও কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশন। এ অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে আড়াই হাজার ট্রাক আছে। আর আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে বেশি ট্রাক ব্যবহƒত হয়। বর্ধিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, বন্দরের মেইন জেটি থেকে খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত ৮ মেট্রিক টনের একটি ট্রাকে পরিবহন ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৩ হাজার ৬৩০ টাকা, গত জানুয়ারিতে যা ছিল ২ হাজার ৯৭৭ টাকা। অর্থাৎ এই রুটে প্রতি টন আমদানি পণ্যের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮২ টাকা।

হালকা পণ্যের ক্ষেত্রে বস্তা লবণ পরিবহনে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ১৮৫ টাকা ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। হালকা পণ্যের মধ্যে সর্বনি¤œ ২২ টাকা (টনপ্রতি) ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে মোজাইক পাথর পরিবহনে। এছাড়া মূল্য তালিকা অনুযায়ী চিনি বস্তা টনপ্রতি ৫৫ টাকা, চিনির কাঁচামাল ১০৭ টাকা, চাল বস্তা ৫৫ টাকা, চাল ঢালা ১১০ টাকা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ঢালা টিএসপি ৫৫ টাকা, ঢালা ইউরিয়া ৭৫ টাকা, বস্তা টিএসপি ৬৫ টাকা, বস্তা ইউরিয়া ৮৬ টাকা, ঢালা লবণ এইবিআই ১৮৫ টাকা, বস্তা লবণ ১৮৫ টাকা, কেমিকেল পণ্য (সোডা, এসিটেড) ১২৮ টাকা, ঢালা গম ও ডাল ৭৫ টাকা, বস্তা গম ও ডাল ১১৮ টাকা, ঢালা ভুট্টা, সরিষা ও সয়াবিন ৯৮ টাকা, বস্তা ভুট্টা, সরিষা ও সয়াবিনে ১৪০ টাকা, মোজাইক পাথর ২২ টাকা, সিমেন্ট বস্তা ৩৫ টাকা এবং কয়লা পরিবহনে অতিরিক্ত ৮০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সময়মত লাইটার জাহাজ বরাদ্দ না পেয়ে একেকটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে ৪০ থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। এর ফলে আমদানিকারক ও শিল্প মালিকরা পণ্য আমদানি করে প্রতি জাহাজে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন। এর সঙ্গে নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর কারণে একেকটি বড় জাহাজে অন্তত ৩০ লাখ টাকা বাড়তি খরচ হবে। ফলে লোকসান, অপ্রত্যাশিত ব্যয় বৃদ্ধিসহ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার আশঙ্কায় আছেন অধিকাংশ আমদানিকারক। এর মাঝে বাড়ানো ট্রাক ভাড়া নিয়ে  আপত্তি

জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক মালিক ও কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ট্রেডবডি।

এ প্রসঙ্গে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, আগে প্রতিটি ট্রাকে পণ্যপরিবহন করা হতো ১২ টন। এখন তা কমিয়ে আনা হয়েছে ৮ টনে। তার উপর বাড়ানো হয়েছে ভাড়াও। এতে একদিকে বাড়বে পরিবহন ব্যয়, অন্যদিকে অতিরিক্ত গাড়ির প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ ২৪ টন পণ্য পরিবহন করতে আগে প্রয়োজন হতো ২টি ট্রাকের। এখন প্রয়োজন হবে ৩টি। অতিরিক্ত ট্রাকের কারণে যানজটও সৃষ্টি হবে। তবে এ দাবি মানতে নারাজ বন্দর ট্রাক মালিক ও কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশন নেতারা। তারা বলছেন, আগেও ৮ টনই নির্ধারিত ছিল। এক্ষেত্রে মালিককে ফাঁকি দিয়ে হয়তো কোনো কোনো চালক হয়তো কম পণ্য পরিবহন করতেন।

ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক আবুল বশর বলেন, লাইটার জাহাজ সংকটে এখন এমনিতেই পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়েছে। নতুন করে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে যা পণ্যের দামের সঙ্গে এই খরচ যুক্ত হবে। এতে আমাদের আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাবে। আর ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে।

বর্ধিত ট্রাক ভাড়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক মালিক ও কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জহুর আহম্মদ বলেন, আমরা এককভাবে ভাড়ার তালিকা নির্ধারণ করি না। সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, চেম্বারসহ ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। যা সম্প্রতি কার্যকর হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সালের পর ২০১৬ সাল পর্যন্ত আর বাড়ানো হয়নি। অথচ ২ বছর পরপর ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম রয়েছে। আর বাজারে তো সব কিছুর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশিদ শেয়ার বিজকে বলেন, আমদানিকারকরা যখন পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে, তখন তারা কারও মতামত নেয় না।  সময়ের ব্যবধানে সবকিছুরই দাম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আমরা দাম সমন্বয় করছি মাত্র। সর্বশেষ ২০১২ সালের ৩ জুন ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। জাহাজ ভাড়া সমন্বয়ের মূল কারণ শ্রমিক মজুরি বাড়ানো হয়েছে।