দিনের খবর

চট্টগ্রাম বন্দর ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার বলি কর্ণফুলী নদী

মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৫০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য নির্গত হয়। এসব বর্জ্যে ৪৪ মিলিগ্রাম/লিটার (গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা ৩০ মিলিগ্রাম/লিটার) বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) এবং ৪২ মিলিগ্রাম/লিটার (গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা ১০ মিলিগ্রাম/লিটার) অয়েল ও গ্রিজ পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এসব মানমাত্রাবহির্ভূত তরল বর্জ্য নালা ও খাল দিয়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে কর্ণফুলী নদী। উপরন্তু, ট্রাক টার্মিনাল থেকে শুরু করে ফিশারিঘাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম বোট ক্লাবের মতো স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে কর্ণফুলী নদী দখল ও ভরাট করে। এতে নীরব ভূমিকা পালন করছে কর্ণফুলীর রক্ষক চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এ দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতায় প্রতিনিয়ত দখল ও দূষণের বলি হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। কর্ণফুলীর দূষণ ও দখলের দায় নিতে রাজি নয় চবক ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

চবক বলছে, ‘কর্ণফুলীতে তাদের জায়গায় কোনো অবৈধ স্থাপনা নেই।’ অন্যদিকে জেলা প্রশাসন বলছে, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুসারে কর্ণফুলীর দখল উচ্ছেদ ও দূষণ রোধের দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দরের।’

পরিবেশ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘কর্ণফুলী রক্ষার কোনো উদ্যোগ না থাকায় নতুন করে অবৈধ দখল হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তালিকায় রয়েছে দুই হাজার ২৭৫টি অবৈধ স্থাপনা। এর মধ্যে শুধু নাছির উদ্দিন নামের একজনেরই রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩০০ অবৈধ স্থাপনা। ভূমি মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তালিকায় থাকা অবৈধ স্থাপনাগুলো চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অধীনে। এছাড়াও কর্ণফুলী নদীপাড়ের লালদিয়ায় অবৈধ ও লিজ দেওয়া জায়গায় স্থাপনাগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের। এ দুই সংস্থাই কর্ণফুলীর রক্ষক। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের।’

এ অবস্থায় পরিবেশবিদদের দাবি, তালিকা অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীপাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং তা সুরক্ষিত করে কর্ণফুলীকে নান্দনিক করা হোক।

কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে শুরু করে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে অধিকাংশ জায়গা বন্দরের মালিকানাধীন। বন্দরের মালিকানাধীন কর্ণফুলীপাড়ের স্থাপনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বন্দর থেকে ইজারা নেওয়া অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের। অন্যদিকে, এ নদীপাড়ে জেগে ওঠা চর বিএস খতিয়ানে বরাদ্দ দেয় জেলা প্রশাসন, যা উচ্চ আদালতের আদেশ অনুসারে আরএস খতিয়ানে অবৈধ। তাই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে না পারায় মামলা ঠুকে দিয়েছেন জায়গা বরাদ্দপ্রাপ্তরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলা-মোকদ্দমা ও আইনি জটিলতার কারণেই কর্ণফুলীপাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ থমকে আছে।

২০১০ সালের জুলাইয়ে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে কর্ণফুলী নদী দখল, মাটি ভরাট ও নদীতে যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। জেলা প্রশাসন হাইকোর্টে ২০১৫ সালের ৯ জুন নদীর দুই তীরে দুই হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা থাকার জরিপ প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান ও বিচারপতি কাশেফা হোসেনের ডিভিশন বেঞ্চ সব স্থাপনা উচ্ছেদে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেন। জরিপের পরও কয়েক বছরে কর্ণফুলীর ফিশারিঘাট হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ আরও অন্তত এক হাজার অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

ওই রায় অনুসারে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হলেও কিছুদিন চলার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৮ সালের ৩ জুলাই আদালত ঘোষিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে কর্ণফুলী নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন না করায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, বন্দর চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসকসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন। পরবর্তীকালে গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দর ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান ও তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে শুরু হয় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। চার দিনে ২৩০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করার পর আবারও বন্ধ হয়ে যায় অভিযান। অন্যদিকে, লালদিয়ারচর থেকে গত ২৩ জুলাই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ২০ একর জায়গা দখলমুক্ত করে চবক।

এদিকে, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করায় গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানকে তলব করেন হাইকোর্ট এবং ২৬ জানুয়ারির আগে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে গত ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে থাকা কর্ণফুলীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বন্দর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের তিন মাস সময় দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আগে সংশ্লিষ্ট স্থানের পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ  দেন আদালত। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য ১২ মে দিন ধার্য করা হয়।

‘চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলন’-এর সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর হাইকোর্টকে জানিয়েছে তারা ২০ একর জায়গা উদ্ধার করেছে। কিন্তু আমরা তাদের কোনো কার্যক্রম দেখছি না। বন্দরের যেটা উদ্ধার করেছে, সেটি হলো লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের জন্য। বন্দর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেনি। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন তো টোটালি ফাঁকিবাজি করছে। ওরা আসলে অবৈধ জায়গা উদ্ধারই করছে না। এ দুই সংস্থার সমন্বয়হীনতার বলি হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। কর্ণফুলী দূষণ ও দখল রোধে এ দুই সংস্থা আজ পর্যন্ত কোনো সমন্বয় সভা করেনি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘কর্ণফুলীপাড়ে জেগে ওঠা চর আমরা বিএস খতিয়ানে বরাদ্দ দিয়েছি। এখন আদালত বলছেন, আরএস খতিয়ানে স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। আরএস খতিয়ানের হিসাবে বিএস খতিয়ানে ইজারা দেওয়া জায়গায় স্থাপনা অবৈধ। এখন দোষ কি আমাদের?

এদিকে, নদীপাড়ে ইজারা দেওয়া জায়গায় নির্মাণ হওয়া স্থাপনাকে ‘অবৈধ’ বলতে নারাজ চবক। চবকের ডেপুটি ম্যানেজার অ্যান্ড হেড অব স্টেট জিল্লুর রহমান বলেন, ‘পতেঙ্গা ১৮ নম্বর থেকে হালদাচর পর্যন্ত জায়গা বন্দরের নিয়ন্ত্রণে। মাঝিরঘাট খাল থেকে কাস্টমঘাট, সদরঘাট থেকে চাক্তাই খাল বন্দরের জায়গা রয়েছে। পতেঙ্গার লালদিয়া ছাড়া বন্দরের জায়গায় কোনো অবৈধ স্থাপনা নেই!’

কর্ণফুলীর রক্ষক কেÑএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী নদী একটি বিশাল ব্যাপার। এর পুরোটা দেখভাল করা বন্দরের পক্ষে সম্ভব নয়।’

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২০ লাখ টাকা এবং চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বন্ধ আছে কেন জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বন্দর করছে। বন্দরের ওপর আদালতের একটি নতুন আদেশ হয়েছে। বন্দরের পুরো জায়গায় অবৈধ স্থাপনা। তারাই উচ্ছেদ করবে। আমাদের সহযোগিতা লাগলে দেব। জরিপে প্রাপ্ত অবৈধ স্থাপনাগুলো তো আলাদা নয়।’

কর্ণফুলীর রক্ষক কে বা এর দখল-দূষণ রোধ করবে কেÑএমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘কর্ণফুলী রক্ষায় একটি মাস্টার প্ল্যান করা হয়েছে। যা চট্টগ্রাম বন্দরই করেছে। মাস্টার প্ল্যানটি যেহেতু তারা করেছে, এ ব্যাপারে তারাই সিদ্ধান্ত নেবে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..