সম্পাদকীয়

চট্টগ্রাম বন্দর ট্রেড ইউনিয়নে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন

শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় ট্রেড ইউনিয়ন বা কর্মচারী পরিষদের (সিবিএ) গুরুত্ব কারও অজানা নয়। কিন্তু কর্মচারী পরিষদ যদি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে সংগঠন পরিচালনা করতে চায়, তাহলে শ্রমিক সংগঠন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাওয়াই স্বাভাবিক। তেমনই ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী পরিষদে। নির্বাচন না দিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ পরিষদ দায়িত্ব পালন করতে চায় বলে অভিযোগ। সরকারের শ্রম দপ্তরে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত একটি সংগঠনের এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের অনিয়ম রোধে সরকারের আশু পদক্ষেপ কাম্য।

দৈনিক শেয়ার বিজে গতকাল ‘আদালতের নির্দেশ মানছেন না মেয়াদোত্তীর্ণ সিবিএ নেতারা’ শীর্ষক প্রতিবেদন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সিবিএ’র দু’বছর মেয়াদি পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের আগস্টে। এরপর নিয়মানুযায়ী গোপন ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে নতুন পর্ষদ গঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ পর্ষদের হর্তাকর্তারা নির্বাচন নিয়ে নানা তালবাহানা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আদালত ও শ্রমদপ্তর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়েছেন। তার পরও নির্বাচন আয়োজনে সংশ্লিষ্টদের এমন অনীহা গ্রহণযোগ্য নয়।

সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন না থাকার বিষয়টিকে শ্রমিকবঞ্চনার সঙ্গে তুলনা করা হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন নেই, সেখানে শ্রমিকদের ঠকানো হয় বলেই সাধারণ ধারণা। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন আছে, সেখানে শ্রমিকনেতা নামক এমন অনেকের আনাগোনা আছে, যাদের তৎপরতায় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার নজিরও রয়েছে। আবার শ্রমিকদের স্বার্থ দেখার কথা থাকলেও অনেক নেতা মালিকপক্ষের সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজের আখের গোছানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন বলেও নানা সময় জানা যায়। এসব কর্মকাণ্ড দেশের শিল্প খাতে একটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় বলে মনে করি।

দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় সাধারণত ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার সুযোগ বেশি। তবে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতায় বেশ পিছিয়ে। এমনকি অসংখ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন নানা সময় বন্ধ হয়ে গেছে ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে। আর সেসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে সিবিএ নেতাদের অযাচিত কার্যক্রমের অভিযোগ পাওয়া যায়। কাজেই প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকস্বার্থ রক্ষা করতে হলে শ্রমিকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শ্রমিকবান্ধব ও প্রতিষ্ঠানবান্ধন ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রক্রিয়ায় ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন সম্পন্ন করা। কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবে বলে বিশ্বাস।

চুড়িহাট্টার মতো আর কোনো অগ্নিদুর্ঘটনা নয় অগ্নিদুর্ঘটনা কমছেই না। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক গুদাম থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ৭০ জন। গতকাল এই অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হলো। চুড়িহাট্টা দুর্ঘটনার পরও অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। ৩৬ দিনের মাথায় (২৮ মার্চ) রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর ফারুক রূপায়ণ (এফ আর) টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান ১৯ জন। আহত হন প্রায় ১০০ জন।

সব দুর্ঘটনা হিসাবে আসে না। বেশি হতাহত হওয়া দুর্ঘটনাই স্মৃতিতে জাগরূক থাকে। এ ধরনের কয়েকটি অগ্নিদুর্ঘটনার মধ্যে ২০১০ সালে গাজীপুরের গরিব অ্যান্ড গরিব গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে ২১ জনের প্রাণহানি, ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ১২৪ জন, ১৪ ডিসেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুরে দ্যাটস ইট স্পোর্টসওয়্যারে ২৯ জন, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে ১১১ জন, ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টঙ্গীতে টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় ৪১ জন এবং ২০১৭ সালের ৩ জুলাই গাজীপুরের কাশিমপুরে মাল্টিফ্যাবসের কারখানায় ১৩ জনের প্রাণহানির খবর কোনোভাবেই ভুলে যাওয়ার নয়। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের পাশাপাশি আহত হয়ে জীবন্মত হয়ে থাকা এবং একমাত্র উপার্জনক্ষমকে হারিয়ে পরিবারের দুর্ভোগে পড়ার উদাহরণও কম নয়। এগুলোর আর্থিক মূল্য নিরূপণ সম্ভব নয়।

দুঃখজনক হলো, অগ্নিদুর্ঘটনার পরই আমরা সরব হই। এরপর সবই চলে ঢিমেতালে। যেন আরেকটি দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা! অগ্নিদুর্ঘটনার পর সুপারিশ ও নির্দেশনা ছিল পরিকল্পিতভাবে কেমিক্যাল শিল্প জোন করে পুরান ঢাকা থেকে সব কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেওয়া হয়নি। আমরা মনে করি, উৎস ও কার্যকারণ বিদ্যমান থাকলে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটবেই।

বারবার প্রাণহানির পরও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা রোধে আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে পারিনি। এক্ষেত্রে সুশাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক সচেতনতার যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনই রয়েছে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা রাজউক, কেমিক্যাল মালিকদের সংগঠন, কারখানা ও স্থাপনা, অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উদাসীনতা। নিমতলীর দুঃস্মৃতি ফিকে না হতেই পাশের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, এরপর এফ আর টাওয়ার দুর্ঘটনা দায়িত্বহীনতাকে নতুন করে সামনে আনল।

ঝুঁকি এড়াতে ঘিঞ্জি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম সরিয়ে ফেলতে হবে। কারখানা সরিয়ে নিতে হবে রাসায়নিক শিল্পনগরী কিংবা প্লাস্টিক শিল্পনগরীতে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধোঁয়া বা তাপমাত্রা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা রাখা, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা থাকা (স্প্রিংকলার) এবং ফায়ার ফাইটিং পাম্পহাউস ও জরুরি নির্গমন সিঁড়ি-মেঝেতে আলোর ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..