সারা বাংলা

চট্টগ্রাম বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে গবাদিপশুর ‘লাম্পি স্কিন’ রোগ

মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে গবাদি পশুর ‘লাম্পি স্কিন রোগ’। ভাইরাসজনিত এ চর্মরোগে আক্রান্ত গবাদিপশুর সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। মারা যাচ্ছে আক্রান্ত পশু। পাশাপাশি বেড়েছে এ রোগে আক্রান্ত পশুর গর্ভপাত।

চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার প্রায় পাঁচ শতাংশ গবাদিপশু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গবাদিপশু আক্রান্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় এবং কম রাঙামাটিতে। এই বিভাগে গত ছয় মাসে মারা গেছে ২৬টি গবাদি পশু। তবে খামারিদের হিসাবে এ হার অনেক বেশি। তাদের মতে, শুধু চট্টগ্রাম জেলায় মারা গেছে প্রায় ১৩০টির মতো গবাদি পশু। অভিযোগ উঠেছে, প্রাণিসম্পদ দপ্তরে টিকা সংগ্রহ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন খামারিরা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রতিবেদন অনুসারে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় মোট গবাদিপশুর সংখ্যা ৫২ লাখ ৮১ হাজার ৬৮টি। জেলাগুলোর ১০৭ উপজেলার মধ্যে ১০২ উপজেলায় লাম্পি স্কিন রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। মোট ৭৩৩টি ইউনিয়নে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে গবাদিপশু। গত ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে লাম্পি স্কিন রোগে চট্টগ্রাম বিভাগে মোট দুই লাখ ৬১ হাজার ৭৪১টি গবাদিপশু আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে আক্রান্ত গবাদিপশু সংখ্যা ১৬৫টি। এ রোগে এই বিভাগে ২৬টি পশু মারা গেছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ১১ জেলায় ৪৩টি গবাদি পশুর গর্ভপাত হয়েছে।

কক্সবাজারের আট উপজেলার ৬২ ইউনিয়নে আক্রান্ত পশুর সংখ্যা ১৫ হাজার ৪৮০টি। এর মধ্যে নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে ১০টি, মৃতের সংখ্যা চারটি এবং গর্ভপাতের সংখ্যা তিনটি। চট্টগ্রামের ১৮ উপজেলার ১১০ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার ২০০টি; এর মধ্যে নতুন আক্রান্ত ৩০টি, মারা গেছে চারটি ও গর্ভপাত হয়েছে দুটি। ফেনির ছয় উপজেলার ৪৭ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৩০১টি। এর মধ্যে নতুনভাবে আক্রান্ত আটটি, মারা গেছে আটটি ও গর্ভপাত হয়েছে ৯টির। কুমিল্লার ১৭ উপজেলার ১৫৭ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে ২৩ হাজার ৪৪০টি, যার মধ্যে নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে ৩০টি, মারা গেছে তিনটি ও গর্ভপাত হয়েছে ১১টির।

লক্ষ্মীপুরের চার উপজেলার আট ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে ছয় হাজার ২০৯টি এবং নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে সাতটি। চাঁদপুরের আট উপজেলার ১১৮ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে পাঁচ হাজার আটটি, নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে ১৫টি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০ উপজেলার ১০০ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে ছয় হাজার ৬২৪টি, নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে ২১টি ও গর্ভপাত হয়েছে দুটি। নোয়াখালীর ৯ উপজেলার ৬৭ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে ৯ হাজার ৮৭৬টি। নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে ২৪টি, মারা গেছে পাঁচটি ও গর্ভপাত হয়েছে ছয়টির। রাঙামাটির ১০ উপজেলার ৩২ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে ২৭৪টি, নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে পাঁচটি। খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলার ১৮ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে ৩৯৮টি, নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে সাতটি এবং বান্দরবানের তিন উপজেলার ১৪ ইউনিয়নে আক্রান্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৩১টি, নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে সাতটি গবাদি পশু।

এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ১১ জেলায় মোট এক লাখ ৭০ হাজার ৫৫২টি আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা দিয়েছে। টিকা দিয়েছে ৮৬ হাজার ৭০০টি পশুকে, জনসচেতনতামূলক সভা করেছে ৫০৪টি এবং পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ করেছে ২১ হাজার ৮৫০টি।

চিটাগং ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক শাহেদ আয়াতুল্লাহ খান বলেন, ‘এ রোগে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ১৩০টি গবাদি পশু মারা গেছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলছে, গট ফক্স টিকায় কাজ হবে, কিন্তু তাদের কাছ থেকে টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষুদ্র খামারিরা টিকা পাচ্ছে না। এক ক্ষুদ্র খামারি টিকা চাওয়ায় তাকে প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলেছে, আপনি আগে ৪০০ গরু জোগাড় করেন। এভাবে অনেককে ভ্যাকসিন দিচ্ছে না প্রাণিসম্পদ দপ্তর। ভালো হয়ে যাওয়ার পর আবার অনেক পশু এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপপরিচালক ফরহাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এ রোগ এখন কমতির দিকে। আমরা প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশেনের সঙ্গে সমন্বয় করে ভ্যাকসিন দিচ্ছি। তবে কোনো ভ্যাকসিনই শতভাগ কাজ করে না, ৯০ ভাগ কাজ করে। ভ্যাকসিনগুলো পশুর চামড়ার নিচে দিতে হয়, এ কারণে একসঙ্গে ৩০০-৪০০ পশুকে দিতে হয়।

উল্লেখ্য, লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগটি ১৯২৯ সালে সর্বপ্রথম ধরা পড়ে জাম্বিয়ায়। এরপর পুরো আফ্রিকা মহাদেশসহ ইউরোপের অনেক দেশেই রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৯ সালের আগে বাংলাদেশ রোগটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। চলতি ২০১৯ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের পটিয়া, কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার চরফরিদ, শিকলবাহা, মহিয়া, ভেল্লাপাড়া, জিরি, বোরমছড়া প্রভৃতি এলাকায় রোগটির প্রাদুর্ভাব ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। এরই মধ্যে রোগটি দেশের প্রায় অংশে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..