বাণিজ্য সংবাদ

চট্টগ্রাম মহানগরীতে নেই মানসম্মত গণপরিবহন

অর্ধশতাধিক রুটের মাত্র একটিতে ‘সিটিং সার্ভিস’ আছে। তবে যাত্রীর চাপে সকাল ও সন্ধ্যায় সেটিও ‘লোকাল’ হয়ে যায়। তাই বাড়তি ভাড়া গুনেও গাদাগাদি করে পথ চলতে হয় যাত্রীদের। বাকি প্রায় সব রুটেই লক্কড়-ঝক্কড় বাস। অনুমোদন না নিয়েও গণপরিবহন চলছে বলে তথ্য মিলেছে। আর কাগজে থাকলেও রাস্তায় বিআরটিসি বাসের দেখা মেলে কালেভদ্রে। বন্দরনগরীর গণপরিবহনের এমন বেহাল অবস্থা নিয়ে ধারাবাহিকের আজ ছাপা হচ্ছে প্রথম পর্ব

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: বন্দরনগরী চট্টগ্রামে রয়েছে গণপরিবহনের ৫৫টি রুট। কিন্তু কোনো রুটেই নেই মানসম্মত যাত্রীপরিবহন সার্ভিস। মাত্র একটি রুটে কয়েকটি বাস নিয়ে ‘সিটিং সার্ভিস’ চালু হলেও সেটির অবস্থাও হ-য-ব-র-ল। রাষ্ট্রায়ত্ত বিআরটিসিরও তেমন সার্ভিস নেই। আর ২০১৬ সালে একটি প্রাইভেট কোম্পানি মাত্র চারটি বাস নিয়ে ‘এসি সার্ভিস’ চালু করলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। তাই শহরজুড়ে চার হাজারের বেশি গাড়ি নিয়মিত চললেও স্বস্তিদায়ক কোনো পরিবহন সেবা নেই বন্দরনগরীতে। বাধ্য হয়ে নিয়মিত যাতায়াতসহ সকাল-সন্ধ্যা অফিসফেরত যাত্রীরা অনিরাপদ পরিবহনেই চলাফেরা করছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপ ও বিআরটিএ’র তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় ৫৫ রুটে নিয়মিত যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করছে। এসব রুটে মোট পাঁচ হাজার ৩৯৮টি সিলিং রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রান্সপোর্ট কমিটির (আরটিসি) অনুমোদন নিয়ে তিন হাজার ৯৯৩টি গাড়ি রাস্তায় চলাচল করছে। এছাড়া আরও বিভিন্ন রুটে ৮০৩টি গাড়ি রাস্তায় নামানোর অনুমতি দিয়েছে আরটিসি কমিটি। কিন্তু এসব রুটে বাস-মিনিবাস, হিউম্যান হলার ও অটোটেম্পো চললেও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক কোনো গণপরিবহন নেই। যে কারণে নগরীতে প্রায় সবগুলো গাড়িই গাদাগাদি করে মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলছে। আবার অনেক গাড়ির ফিটনেস না থাকলেও পুলিশি সহায়তায় রাস্তায় চলাচল করছে নিয়মিত।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, নগরীর ১৬ রুটে প্রায় এক হাজারের বেশি বাস-মিনিবাস চলাচল করছে। এর মধ্যে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা সি-বিচ পর্যন্ত ১০ নং রুটটি খুবই ব্যস্ততম। ওই রুটে ২০৫টি বাস-মিনিবাস চলাচল করছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রুটটিতে স্বস্তিদায়ক বা মানসম্মত গণপরিবহন নেই। বরং গণপরিবহনের নামে যেসব যানবাহন চলছে, সেগুলো পুরোনো, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা। এদিকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে সি-বিচ পর্যন্ত ১৫ নং রুট। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বেশ কজন বাস মালিক ৫৫টি বাস নিয়ে ওই রুটে মেট্রো ‘প্রভাতী সিটিং সার্ভিস’ চালু করেন। সেখানেও যাত্রীর চাহিদার তুলনায় বাস অপর্যাপ্ত। আর এটিই বন্দরনগরীর একমাত্র সিটিং সার্ভিস হলেও সকাল-সন্ধ্যায় ওই পরিবহনে সিটিং সার্ভিস থাকছে না। মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী চাপের কারণে অন্য পরিবহনের মতো তারাও সকাল-সন্ধ্যায় গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন করছে। অন্য ১৫ রুটে সিটিং সার্ভিস না থাকায় যাত্রীরা পুরোনো-ফিটনেসবিহীন গাড়িতে বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত করছেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নগরীতে কয়েক হাজার বাস-মিনিবাস চলাচল করলেও মানসম্মত সার্ভিস নেই। তাই ৫৫টি গাড়ি নিয়ে ১৫ নং রুটে মেট্রো প্রভাতী নামের সিটিং সার্ভিস চালু করা হয়েছে। তবে সকাল ও সন্ধ্যায় ওই সার্ভিস ঠিকমতো সেবা দিতে পারে না। তাই তারা আরও দুটি রুটে ৭০টি গাড়ি নামানোর অনুমোদন চেয়েছে।’
এদিকে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ‘প্রিমিয়ার ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস লিমিটেড’ নামে একটি প্রাইভেট কোম্পানি গণপরিবহন হিসেবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) সার্ভিস চালুর জন্য বিআরটিএ থেকে ২০টি বাসের অনুমোদন নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা মাত্র চারটি বাস নিয়ে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা সি-বিচ পর্যন্ত সার্ভিস চালু করে। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট কাউন্টার না থাকায় যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও প্রত্যেক স্টপে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাসহ আরও কিছু কারণে ওই সার্ভিসটি জনপ্রিয়তা পায়নি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে অপরিকল্পিতভাবে গণপরিবহন চলাচল করছে। এসব গাড়ির মধ্যে অধিকাংশেরই ফিটনেস নেই। তাছাড়া সবগুলো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করছে। জরিমানা, মামলা ও জব্দ করেও কোনো সমাধান হচ্ছে না। কারণ, যাত্রীর তুলনায় গণপরিবহন অপ্রতুল। তাই মহানগরীতে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে চসিক মেয়রের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১০০ এসি বাস নামানোর উদ্যোগ নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। বিভিন্ন রুটে ওই গাড়িগুলো যুক্ত হলে গণপরিবহনে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।’
এদিকে নগরীতে এস আলম গ্রুপের ১০০ এসি বাস নামানোর বিষয়টি মেয়র নাছির উদ্দীনও নিশ্চিত করেছেন। তবে কবে নাগাদ এসব গাড়ি আসবে তা স্পষ্ট করে জানাতে পারেননি।
এদিকে চকবাজার থেকে আগ্রাবাদ-বারেক বিল্ডিং মোড় রুটে কোনো বাস সার্ভিস নেই। ফলে অটোটেম্পোতে ভরসা করতে হয় স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ শত শত যাত্রীকে। এ রুটে ২৬২টি সিলিং থাকলেও কাগজে-কলমে অনুমোদিত অটোটেম্পো ১৫৮টি। যদিও ওই রুটে বাস্তবে অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে বেশি টেম্পো চলাচল করছে। আর এসব অটোটেম্পোতে চালকসহ ৯ জন যাত্রী পরিবহনের অনুমতি আছে। কিন্তু কোনো ধরনের আইন না মেনে প্রতিটি টেম্পোতে ১৭ থেকে ১৯ জন পর্যন্ত পরিবহন করা হচ্ছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম কলেজ হোস্টেল গেট থেকে বড় পোল পর্যন্ত ১৭ নং রুটে ৩০টি হিউম্যান হলার চলাচলের জন্য আরটিসি কমিটি সর্বশেষ অনুষ্ঠিত মিটিংয়ে অনুমোদন দিয়েছে। অথচ আরটিসি কমিটির অনুমোদনের চার-পাঁচ বছর আগে থেকেই ওই রুটে এসব গাড়ি যাত্রী পরিবহন করছে। বিআরটিএ থেকে কোনো অনুমতি না দেওয়ায় এসব গাড়ি নির্ধারিত রুট না মেনে কলেজ গেট থেকে বারেক বিল্ডিং রুটে চলাচল করছে। অটোটেম্পোর মতো তারাও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করছে। পাশাপাশি নানা অজুহাতে অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করছে। আবার বিআরটিএ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে মাঝপথে যাত্রী নামিয়ে পালিয়ে যাওয়ার নজিরও আছে।
বন্দরনগরীতে গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য ঠেকানো ও মানসম্মত যাত্রীসেবা দিতে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। বিআরটিসি বাসেরও দেখা মেলে না। সংস্থাটির ঢাকা সিটির জন্য ২১৫ বাস বরাদ্দ থাকলেও চট্টগ্রাম শহরের জন্য মাত্র সাতটি গাড়ি বরাদ্দ দিয়েছে। ওই গাড়িগুলোও চার রুটে চলাচল করার কথা। কিন্তু কাগজে থাকলেও রাস্তায় বিআরটিসির কোনো বাস দেখা যায় না।
এ বিষয়ে জানতে বিআরটিসির চট্টগ্রাম বাস ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাড়ি চলাচলের তথ্য দেননি। উল্টো সরকার কেন গাড়ি বরাদ্দ দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সে প্রশ্ন করার পরামর্শ দেন। এ সময় ওই প্রশ্নের উত্তরের জন্য বিআরটিসি ঢাকা অফিসে যোগাযোগের পরামর্শও দেন তিনি।

 

ট্যাগ »

সর্বশেষ..