বাণিজ্য সংবাদ

চট্টগ্রাম মহানগরের ৭০% গাড়ির নেই ফিটনেস

অর্ধশতাধিক রুটের মাত্র একটিতে ‘সিটিং সার্ভিস’ আছে। তবে যাত্রীর চাপে সকাল ও সন্ধ্যায় সেটিও ‘লোকাল’ হয়ে যায়। তাই বাড়তি ভাড়া গুনেও গাদাগাদি করে পথ চলতে হয় যাত্রীদের। বাকি প্রায় সব রুটেই লক্কড়-ঝক্কড় বাস। অনুমোদন না নিয়েও গণপরিবহন চলছে বলে তথ্য মিলেছে। আর কাগজে থাকলেও রাস্তায় বিআরটিসি বাসের দেখা মেলে কালেভদ্রে। বন্দরনগরীর গণপরিবহনের এমন বেহাল অবস্থা নিয়ে ধারাবাহিকের আজ ছাপা হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব

চট্টগ্রাম মহানগরের ৭০% গাড়ির নেই ফিটনেস
সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় গণপরিবহনের নাজুক অবস্থা অনেক দিনের। তবে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ফিটনেসবিহীন মোটরযানের সংখ্যা। মহানগর এলাকায় নিবন্ধিত মোটরযানের ৭০ শতাংশই ফিটনেস সনদ নবায়ন না করেই চলছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের অধিক সময় নবায়ন না করার সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশের ওপরে। এতে নিয়মিত যাত্রীরা নিরাপদ পরিবহনসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্যমতে, ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৩৭৯ মোটরযান চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৯ হাজার বড় ট্রাক, প্রায় সাড়ে তিন হাজার ছোট ট্রাক, আট হাজার পিকআপ, ছয় হাজারের অধিক বাস-মিনিবাস, আড়াই হাজারের বেশি প্রাইম মুভার (লরি), তিন হাজার ৭০০ প্রাইভেট জিপ, সাড়ে ২৯ হাজার প্রাইভেট কার, এক হাজারের অধিক মাইক্রোবাস, ৩৮৫টি অ্যাম্বুলেন্স, আড়াইশ টেম্পো, প্রায় সাড়ে চার হাজার হিউম্যান হলার, প্রায় ৩০০ মিনি কাভার্ডভ্যানসহ সাড়ে ছয় হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। কিন্তু এসব মোটরযানের অধিকাংশই ফিটনেস হারিয়েছে বহু আগে। আর প্রশাসনের তৎপরতা না থাকায় সেসব গাড়িও নিয়মিত চলাচল করছে রাস্তায়।
বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, শুরু থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ফিটনেস সনদ নবায়ন না করা মোটরযান রয়েছে ৫১ হাজার ৮৯টি, যা মোট নিবন্ধিত মোটরযানের প্রায় ৭০ শতাংশ। এছাড়া ২০১৪ পর্যন্ত পাঁচ বছরের ফিটনেস সনদ নবায়ন না করা গাড়ি ৩০ হাজার ৯২টি। আর ২০১৫ পর্যন্ত চার বছরের সনদ নবায়ন না করা রয়েছে ২৭ হাজার ৩৪৯টি। ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিন বছরের ফিটনেস সনদ নবায়ন না করা রয়েছে ২৪ হাজার ৫৪৮টি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত দুবছরের সনদ নবায়ন না করা গাড়ি রয়েছে ২০ হাজার ৭৮৫টি। আর ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক বছরের ফিটনেস সনদ নবায়ন না করা রয়েছে সাড়ে ১৩ হাজার গাড়ি।
এদিকে ৭৩ হাজার ৫০০ নিবন্ধিত মোটরযানের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় নিয়মিত গণপরিবহন হিসেবে ৫৫ রুটে বাস-মিনিবাস, হিউম্যান হলার ও অটো টেম্পো চলাচল করছে প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক। আর প্রাইভেট কার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলের সঠিক হিসাব না থাকলেও নিবন্ধিত গাড়ির অধিকাংশই নিয়মিত চলাচল করছে বলে বিআরটিএর দাবি। তবে এর মধ্যে কিছুসংখ্যক সিএসজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হলেও সনদ নবায়ন না করা বাকি গাড়িগুলো পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় বহালতবিয়তে রাস্তায় চলাচল করছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। ফলে নগরীতে মানসম্মত পরিবহন সংকটের পাশাপাশি নতুন গাড়ি সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাতে যাত্রীরা নিরাপদ পরিবহনসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজ সম্ভব হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের টোকেনবাণিজ্য ও পুলিশকে মাসোহারা দেওয়ার মাধ্যমে। ফলে ফিটনেস সনদ নবায়ন না করা গাড়ি হরহামেশাই রাস্তায় চলাচল করছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের জন্য ট্রাফিক পুলিশকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, পুলিশ বড় ধরনের মামলা না দিয়ে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে অল্প জরিমানা করে ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে চালক ও গাড়ির মালিকপক্ষের অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টাকা দিতে হয়। তাই কাগজপত্র ঠিক না করেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টাকা দিয়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল করছে। এছাড়া ৪৫ দিনের মাথায় আরটিসি সভা হওয়ার কথা থালেও সাত-আট মাসেও হচ্ছে না। সর্বশেষ মিটিং গত ফেব্রুয়ারিতে হয়েছিল। তাই নিয়মিত সভা না হওয়ার কারণে অনেক সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না বলে তিনি মত দেন।
আরটিসি কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ৪৫ দিনে কোথাও আরটিসি কমিটির সভা হয় না। আর বিআরটিএ, পরিবহন মালিক পক্ষ ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ হচ্ছে না। একই সঙ্গে সঠিক রুটে গাড়ি চলাচল ও ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি সমাধানও হচ্ছে না। আর পরিবহন চালক ও মালিক পক্ষ সুযোগ দিচ্ছে বলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা টাকা নিচ্ছে বলে তিনি জানান।

সর্বশেষ..