মত-বিশ্লেষণ

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে শিক্ষার ভূমিকা

আবদুল জলিল: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল নির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশেই এটি নিয়ে ব্যাপক পর্যালোচনা হচ্ছে। এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল কাজে লাগানো যায়, সে প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। এ ধরনের জ্ঞানচর্চা শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে বেগবান করবে, উৎপাদনের উৎকর্ষকে এগিয়ে নেবে। পণ্যের গুণগত মান বাড়াবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়িয়ে সভ্যতাকে সমৃদ্ধির কাক্সিক্ষত সোপানে পৌঁছে দিতে অনবদ্য অবদান রাখবে।
শিল্পায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যুগে যুগে শিল্পায়নের গতিধারা পরিবর্তিত হয়েছে। শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। একসময় মানুষ গুহায় বসবাস করত, পশুপাখি শিকারের জন্য তারা পাথরের তৈরি ধারাল অস্ত্র ব্যবহার করত। পরবর্তীকালে গুহার পাশে কৃষি আবাদের জন্য মাটি খোঁড়ার কাজে যে যন্ত্র ব্যবহার করা হতো, তাও শিল্প উৎপাদনেরই অংশ। ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। যোগাযোগের জন্য বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, ছাপাখানা ও টেলিগ্রাফ মেশিনে স্টিম পাওয়ারের ব্যবহার, কয়লাভিত্তিক শক্তি উৎপাদন প্রভৃতির মাধ্যমে প্রথম শিল্পবিপ্লব এগিয়েছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে কেন্দ্রীভূত বিদ্যুতায়ন, টেলিফোন, রেডিও, টেলিভিশন আবিষ্কার, সুলভ মূল্যে তেলের জোগান এবং জাতীয় পর্যায়ে যানবাহন চলাচলের জন্য অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে ওঠার মাধ্যমে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। এর প্রভাবে ধীরে ধীরে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে থাকে। এর পরই ইউরোপে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। এটি হলো ডিজিটাল কমিউনিকেশন ও ইন্টারনেট অবকাঠামোভিত্তিক শিল্পবিপ্লব। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তি ও সবুজ প্রযুক্তি প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়া এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির প্রয়াসও এ শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়।
এ শিল্পবিপ্লবের সুফল পেতে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উৎপাদিত পণ্য যাতে মানসম্মত হয়, তার প্রতিও সবাই বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখছে। এজন্য উন্নত দেশগুলো স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ভাবন ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশে ক্রমাগত পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে।
সারা বিশ্বে এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের হাওয়া বইছে। রোবটিক টেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ন্যানো-টেকনোলজি, বায়ো-টেকনোলজি প্রভৃতির আবিষ্কার ও প্রয়োগের মাধ্যমে শিল্প খাতে যে অসাধারণ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা-ই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অনিবার্য ফল। এটি মূলত মোবাইল সফটওয়্যারভিত্তিক একটি শক্তিশালী বিপ্লব।
শিল্পবিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদরা মনে করছেন, বিশ্ব এখনও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনালগ্নে রয়েছে। তাদের ধারণা এ বিপ্লব এতই শক্তিশালী যে, এটি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিবে। ‘উবষষ ঞবপযহড়ষড়মরবং জবধষরুব ২০৩০ জবঢ়ড়ৎঃ’ অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে যেসব চাকরির সুযোগ তৈরি হবে, তার ৮৫ শতাংশ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। স্বাভাবিক কারণেই এটি আজকের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে প্রভাব ফেলবে। এটি তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে যে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে, এটি শিল্পকারখানায় অনিবার্যভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। একই সঙ্গে এই অটোমেশন মানুষের কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিও বাড়াবে।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। ১৯৯৮ সালে বিশ্বখ্যাত ফটোপেপার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কোডাক বিশ্বের ফটোপেপারের চাহিদার শতকরা ৮৫ ভাগ উৎপাদন করত। সে সময় এ প্রতিষ্ঠানে জনবল ছিল এক লাখ ৭০ হাজার। ডিজিটাল ফটোগ্রাফি আসার ফলে কোডাক এখন দেউলিয়া হয়ে গেছে। এর কর্মচারীরা চাকরি হারিয়েছে। অরৎনহন হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো হোটেল কোম্পানি। কিন্তু তাদের নিজস্ব কোনো হোটেল নেই। শুধু সফটওয়্যার ব্যবহার করে এসব কোম্পানি নিজ নিজ সেক্টরে একচেটিয়া ব্যবসা করছে।
অনাগত ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুত হতে হবে এবং এখনই তা হওয়ার সময়। কারণ রোবটিক টেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতি হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ফল। এর সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শুধু এগুলোই নয়, যে কোনো উদ্ভাবনের সঙ্গে ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঙ্গে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা জড়িত। শিল্পোন্নত দেশগুলো শুরু থেকেই এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এ খাতে সবচেয়ে মেধাবী জনবলকে নিয়োগ করেছে। সবচেয়ে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ কাজে লাগিয়েছে। ফলে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে, সেগুলো তাদের শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ওইসব দেশে বিশ্বমানের পণ্য ও সেবা তৈরি হচ্ছে। এতে তাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। তাদের পণ্য বিশ্ববাজারে দাপটের সঙ্গে টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে বাংলাদেশেও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজš§কে কোন ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্য করা যাবে, তা এখনই খুঁজে বের করতে হবে। এ দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নয়Ñএটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষানীতি তৈরি, পাঠদানসহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্তদের সম্মিলিত দায়িত্ব। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে শিক্ষার্থীদের চলমান পরিবর্তনের সঙ্গে সমৃদ্ধ করবে, তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয়তা তৈরি করবেÑসেটি পাঠ্যধারা ও পাঠদান পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। পাঠদানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে সব সময় অটোমেশনের ফলে চাকরিচ্যুতি এবং ক্রমাগত প্রযুক্তি পরিবর্তনের ফলে জ্ঞানলুপ্তির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
একবিংশ শতাব্দীতে ‘নিরক্ষর’ বলতে যারা লিখতে ও পড়তে পারে না, তাদের বোঝাবে না; বরং যারা শিখতে, ভুলতে ও পুনরায় শিখতে পারে না, তারাই হবে নতুন শতাব্দীর নিরক্ষর জনগোষ্ঠী। অথচ ২০১৮ সালে প্রকাশিত ঞযব ঊপড়হড়সরংঃ: ওহঃবষষরমবহপব টহরঃ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের খুব অল্প দেশ এ ধরনের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও পরিবর্তনের বিষয়টিকে তাদের শিক্ষানীতিতে প্রতিষ্ঠা করেছে।
এ কথা সত্য, প্রতিটি শিল্পবিপ্লব এসেছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন থেকে। আর এ ধরনের উদ্ভাবন মানুষকে সাময়িকভাবে কর্মহীন করেছে। শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করেছে। কিন্তু মানুষ দ্রুত এসব পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। প্রথম শিল্পবিপ্লবের ফলে মানুষের জায়গায় মেশিন সংযোজিত হলেও উন্নয়ন ও উৎপাদনে মানুষের ভূমিকা গৌণ হয়ে যায়নি। বরং এসব মেশিন তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে আরও বেশি কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। মানুষকে প্রতিদিনের কায়িক শ্রম কমিয়ে খবধফবৎংযরঢ়, ওহহড়াধঃরড়হ, ঈৎবধঃরারঃু, ঊসঢ়ধঃযু এবং ঝঃৎধঃবমরপ ঃযরহশরহম-এর সুযোগ করে দিয়েছে, যা মানুষের দক্ষতা ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। মনে রাখতে হবে, যে কোনো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনই মানুষের সৃষ্টি। সুতরাং কোনো উদ্ভাবনই মানুষকে কর্মহীন করতে পারে না। শুধু প্রয়োজন উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা। আর উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই পারে কেবল তা নিশ্চিত করতে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথ ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও হাঁটছে। তবে শিল্পোন্নত দেশগুলো যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ হয়তো এখনও সে গতিতে এগুতে পারেনি। এর কারণ সৃজনশীল উদ্ভাবন ও মেধা বিকাশে এদেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা শিল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় কম। এর পরও বর্তমান সরকার গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটেও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা কারিক্যুলামে প্রযুক্তিকে সন্নিবেশিত করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম ও যোগ্য ভবিষ্যৎ প্রজš§ গড়ে তোলাই এ প্রয়াসের অন্যতম লক্ষ্য।
আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার মধ্যে কার্যকর লিংকেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। শিল্পকারখানার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির সুযোগ অবারিত করতে হবে। তাহলেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে উদ্ভূত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশীয় শিল্পকারখানায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে। আর এক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল তৈরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হবে সভ্যতার বাতিঘর।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..