প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং আমাদের করণীয়

জুলকারনাইন:অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে বদলে যাচ্ছে আমাদের পৃথিবী। জগৎজুড়ে পরিবর্তনের ছোঁয়া। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। বিদায় হচ্ছে পুরোনো ধ্যান-ধারণা। নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের দক্ষতা শিখতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে। প্রযুক্তির ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনের থেকে প্রযুক্তি বদলের গতি আরও অনেক দ্রুত হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি বদলের সঙ্গে তাল মেলাতে বিশ্ববাসীর সামনে দেখা দিয়েছে এক নতুন চ্যলেঞ্জ। নতুন নতুন প্রযুক্তির বিকাশ ও বিস্তার আমরা চাই বা না চাই আমাদের গ্রহণ করতেই হবে, তা না হলে এ বিশ্বে আমরা পিছিয়ে পড়ব। বর্তমান বিশ্বে উৎকর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। আমরা খুব সহজেই ধারণা করতে পারি আগামী দশকগুলোয় প্রযুক্তিচালিত চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বিশ্বের সব ক্ষেত্রে পুরোনো কাঠামোকে বদলে দেবে নতুনভাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমান চাকরির অনেকগুলোই আর থাকবে না। সেখানে প্রযুক্তির কল্যাণে যেসব নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে তার ধরন এখনো আমাদের অজানা। রোবোটিকস অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বøক চেইন টেকনোলজি, ইন্টারনেট অব থিংস, ডিসেন্ট্রালাইজড কনসেনসাস, জিন প্রকৌশল ও অন্যান্য প্রযুক্তি বিশ্বকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে। এছাড়া পঞ্চম প্রজন্মের ওয়ারলেস প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টিং ও সম্পূর্ণ স্বশাসিত যানবাহনের উদ্ভাবনের জন্য উদীয়মান প্রযুক্তির যুগান্তকারী যুগের সূচনা হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এখন বাস্তবতা, অস্বীকার করার উপায় নেই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে নতুন শিল্পবিপ্লব আমাদের ফেলে এগিয়ে যাবে। আমাদের জন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, ১৩ বছর ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি অনেক শক্ত হয়েছে। সারাদেশের সব ক্ষেত্রেই এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব ফেলেছে। মানুষ এককথায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটছে, মাথাপিছু আয় দ্রæত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান অর্থবছরে সাময়িক হিসেবে মাথাপিছু আয় হিসাব করা হয়েছে দুই হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের কম-বেশি তিন কোটি মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। আইসিটি খাতে রপ্তানি আয় বছরে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আউটসোসিং খাতে বছরে আয় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অনলাইন শ্রমশক্তিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ফিল্যান্সিংয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। হাইটেক পার্কে সরাসরি কর্মসংস্থান প্রায় ২১ হাজার। স্কুলগুলোয় মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম আছে ৫৮ হাজারেরও বেশি। দিন দিন এটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুমের ব্যবস্থা করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।  দেশে এখন শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সরকারের ২০৪১ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় ১৫ হাজার মার্কিন ডলারের পাশাপাশি জনগণকে সমানভাবে ক্ষমতায়ন করে একটি ধনী দেশে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। সবাই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার হবে ছয় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের ৯৩তম অবস্থানে, আর জনসংখ্যার দিক দিয়ে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। এ রকম একটা জনবহুল দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা খুব সহজ নয়। তবে আজ থেকে ১৩ বছর আগে এই কঠিন কাজটি হাতে নিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নয়নের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছিলেন। তার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ এখনও ‘ফাইভ জি’ চালুর বিষয় চিন্তাও করেনি। অথচ বাংলাদেশে এরই মধ্যে ‘ফাইভ জি’ চালু হয়েছে। ২০২৩ সালে আসছে তৃতীয় সাবমেরিন কেব্ল। সরকার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট উচ্চগতির ডেটা দিচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে। আগামীর পৃথিবী হবে ডেটানির্ভর। এরই ধারাবাহিকতায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকবে। ডেটার চাহিদা পূরণে ইকো সিস্টেম দাঁড় করাতে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক জনগণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এবং গ্রাহক স্বচ্ছন্দে তা গ্রহণ করছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব করার জন্য এরই মধ্যে সরকার ‘এক দেশ এক রেট’ প্যকেজ চালু করেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মেশিন ইন্টেলিজেন্সও বলা হয়। কম্পিউটার সায়েন্সের উৎকৃষ্টতম উদাহরণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি প্রধানত যে চারটি কাজ করে তা হলোÑকথা শুনে চিনতে পারা, নতুন জিনিস শেখা, পরিকল্পনা করা এবং সমস্যার সমাধান করা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্মার্টফোনে ব্যবহার হচ্ছে সুন্দর সেলফি তুলতে, গ্রাহকের অভ্যাস ও প্রয়োজনীয়তা মনে রেখে কাস্টমাইজড সেবা প্রদান করতে এবং ভয়েস শুনে বিভিন্ন সেবা দিতে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত বছর বিজয় দিবসে সিটি ব্যাংক ‘বিকাশ’-এর সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে। এ ঋণ প্রদানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিকাশ হিসাবধারী বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করে ঋণের জন্য আবেদন করলে সিটি ব্যাংক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ মঞ্জুর করে দেবে। এখানে কোনো মানুষের সাহায্য লাগবে না। আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে লোন পাওয়া যাচ্ছে। কোনো জামানত ও কাগজপত্র লাগছে না। ব্যাংকের কোনো ঋণ প্রসেসিং ফিও নেই। বিকাশ অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স থেকে মাসিক ভিত্তিতে ঋণ আদায় করা হয়ে থাকে। ইন্টারেস্ট রেটও সহনীয়। ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা এ সুবিধা গ্রাহকরা পাচ্ছেন। ব্যাংক খাতে এটা একটা যুগান্তকারী কার্যক্রম। এছাড়া গার্মেন্ট কারখানায় রোবটের ব্যবহার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ওয়াল্টন কারখানায় ফ্রিজের কম্প্রেসার অ্যাসেম্বল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে রোবোটিক প্রযুক্তি। আইসিডিডিআরবি ‘কারা’ নামে টেলি অপথালমোলজি প্রযুক্তি দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যান্সি শনাক্তের একটি আধুনিক পদ্ধতি চালু করেছে। ‘বন্ডস্টাইন’ সফলভাবে মেডিকেলের প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর জন্য আইওটি ডিভাইসের মাধ্যমে স্মার্ট ট্র্যাকিং ব্যবহার করে আসছে।

বøক চেইন টেকনোলজি হলো তথ্য স্থানান্তর ও তথ্য সংরক্ষণের জন্য বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে একটির পর একটি চেইন আকারে বিভিন্ন বøকে সংগ্রহ করে প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে কোনো কাজ করা যায়। এটা এমন একটি বণ্টনযোগ্য ডেটাবেইজ যাতে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলোর মধ্যে সব লেনদেনের তথ্য নথি আকারে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি লেনদেন আবার সিস্টেমের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্বারা যাচাই করা যায়। একবার কোনো তথ্য সিস্টেমে গেলে তা স্থায়ীভাবে থেকে যায়, তা ডিলিট করা যায় না। এটি নির্ভুলভাবে কাজ করে। বর্তমানে নেটওয়ার্ক সুরক্ষা এবং ডেটা ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে বøক চেইন খুবই জনপ্রিয় ও কার্যকর। দেশের দুর্নীতি কমানো ও জনগণের তথ্য সংরক্ষণের জন্য এবং অর্থনৈতিক লেনদেনসহ সব কাজে এটা ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এরই মধ্যে এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তবে সেটা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এটা যুগান্তকারী ভ‚মিকা রাখছে। মানুষের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব রেকর্ড বøক চেইনের মাধ্যমে স্টোর করা হয় এবং এসব তথ্য ডাক্তারদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। আমাদের দেশে বেসরকারি বড় বড় হাসপাতালে সীমিতভাবে এ প্রযুক্তিগত সেবা দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফৌজদারি আদালতে প্রবেশন, জামিন, সাজার মেয়াদ নির্ধারণ ও অপরাধ প্রবণতা নিরূপণে সহায়ক হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেয়া হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে জব মার্কেটে। অটোমেশনের ফলে শিল্পকলকারখানা হয়ে পড়বে যন্ত্রনির্ভর। একদিকে প্রচলিত শ্রমবাজারের অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ কর্মীরা চাকরি হারাবে, অন্যদিকে নতুন ধারার শ্রমবাজারে দক্ষ জনবলের জন্য প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। জ্ঞানভিত্তিক এই শিল্পবিপ্লবে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদই বেশি মূল্যবান হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে অফ-শেয়ারিংয়ের পরিবর্তে রি-শেয়ারিং প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে হবে। অর্থাৎ যেসব উৎপাদন প্রক্রিয়া আগে উন্নয়নশীল দেশে হস্তান্তর করা হয়েছিল, সেগুলো আবার উন্নত দেশে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানুষকে ১০০ বছর সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখনকার প্রজš§ আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত ও সচেতন হচ্ছে। আমাদের শিশু-কিশোররা জš§ থেকেই টেকনোলজির দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বিশ্ববাসীর দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে এ চ্যলেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বে নিজেকে পরিচিত করতে সক্ষম হবেÑএটাই প্রত্যাশা।

পিআইডি নিবন্ধ