প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চাঁদপুরে ‘কৃষকের অ্যাপে’ ধান বিক্রয়ে ফড়িয়াচক্রের কারসাজি

বেলায়েত সুমন, চাঁদপুর: দেশব্যাপী গত মাসে ডিজিটাল কৃষকের অ্যাপে ধান ক্রয়ে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চাঁদপুরের কৃষকরা অ্যাপে ন্যায্য দামে ধান বিক্রয় করে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও তা পারছেন না। কৃষি কার্ড না থাকায় উৎপাদিত ন্যায্য ধান বিক্রি করতে পারছেন না এ জেলার প্রান্তিক কৃষক। এলাকাভিত্তিক মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া সিন্ডিকেট ও কিছু অসাধু কৃষি উপসহকারীর যোগসাজশে কৃষক না হয়েও টাকার বিনিময়ে কৃষি কার্ড তৈরি করে কৃষকের অ্যাপে নিবন্ধন করছেন। ফলে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের মুনাফা কৌশলে লুটে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াচক্র। এতে কার্ড জটিলতায় প্রান্তিক কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে। জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন কৃষি বøকে অনুসন্ধানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।

সূত্রমতে, অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ ২০২২ মৌসুমে বিভাগ, জেলা ও উপজেলাওয়ারী ধানের প্রস্তাবিত লক্ষ্য অনুযায়ী চাঁদপুরের সাতটি উপজেলায় ‘কৃষকের অ্যাপে’ ধান ক্রয়ের অনুমোদন দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলায় বোরো ধানের সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৩৪ হাজার ৭৪৫ মেট্রিক টন, সংগ্রহের লক্ষ্য ১ হাজার ৩১১ মেট্রিক টন। মতলব উত্তর উপজেলায় উৎপাদন লক্ষ্য ৬২ হাজার ৬৮২ মেট্রিক টন, সংগ্রহের লক্ষ্য ১ হাজার ৩১১ মেট্রিক টন। হাজীগঞ্জ উপজেলায় উৎপাদন লক্ষ্য ৫৯ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন, সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ২৫২ মেট্রিক টন। শাহরাস্তিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার ৭৬৪ মেট্রিক টন, সংগ্রহের লক্ষ্য ১ হাজার ২৭১ মেট্রিক টন। কচুয়া উপজেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭৯ হাজার ৭২৬ মেট্রিক টন, সংগ্রহের লক্ষ্য ১ হাজার ৬৬৮ মেট্রিক টন। ফরিদগঞ্জে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৬৩ হাজার ১২৬ মেট্রিক টন, সংগ্রহের লক্ষ্য ১ হাজার ৩২০ মেট্রিক টন এবং হাইমচরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ১৫৮ সংগ্রহের  লক্ষ্য ৮৭ মেট্রিক টন।

গত এপ্রিল থেকে চাঁদপুর সদর, কচুয়া, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর, শাহরাস্তি, মতলব উত্তর এ সাত  উপজেলায় কৃষকের অ্যাপের মাধ্যমে ধান বিক্রিতে আগ্রহীদের নিবন্ধন শুরু হয়। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এখনও। নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় অধিকাংশ কৃষক নিবন্ধন না করে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াচক্রের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করছেন। ফলে ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না কৃষক। যদিও সরকার কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘কৃষকের অ্যাপে’ ধান ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ এখন ভেস্তে যেতে বসেছে কিছু কর্মকর্তা আর ফড়িয়াচক্রের কারসাজির কারণে।

এ ফড়িয়াচক্র সবচেয়ে বেশি সক্রিয় মতলব উত্তর, হাইমচর ও কচুয়ায়। জানা যায়, মতলব উত্তর উপজেলায় ৪৫ হাজার কৃষক পরিবারের মধ্যে কৃষি কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ২৭ হাজার ৭২০ জন। এর মধ্যে ‘কৃষকের অ্যাপে’ এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১০০ জন।

হাইমচর উপজেলায় কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৩০ হাজার। কৃষি কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ১৮ হাজার ৭৩০ জন হলেও অ্যাপে ধান বিক্রয়ে নিবন্ধিত কৃষকের সংখ্যা ১২৮ জন। কচুয়া উপজেলায় কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ৭৫ হাজার ৫০০ জন। কৃষকের অ্যাপে ধান বিক্রয়ের জন্য এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৪৫৭ জন।

অভিযোগ রয়েছেÑহাইমচর উপজেলা ফড়িয়াচক্রের সঙ্গে সমন্বয় করছেন উপজেলা কৃষি উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা ভজন হরি মজুমদার, মতলব দক্ষিণে আয়েত আলী, শাহরাস্তিতে কৃষ্ণ চন্দ্র। কচুয়ায় আগে এসব নিয়ন্ত্রণ করতেন শিবু লাল নামে এক কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি নানা অনিয়মের কারণে বদলি হয়ে রামগঞ্জ উপজেলায় আছেন। তার স্থলে কচুয়ায় ফরহাদ নামে এক কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা এখন এ উপজেলায় এসব নিয়ন্ত্রণ করছেন। যদিও সংশ্লিষ্টরা অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করেন।

হাজীগঞ্জ উপজেলার হাটিলাপূর্ব ইউনিয়ন কৃষি বøকের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা সফিকুর রহমান ঢালি কার্ডপ্রতি ৫০০ টাকা হারে কৃষি কার্ড বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে। এমনকি একটি কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশিক্ষণ উপকরণ (ব্যাগ) পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন এ কৃষি উপসহকারী। বছরের পর বছর কৃষি কার্ড নেই বলে কৃষকদের বঞ্চিত করে মধ্যস্বত্বভোগী, সার বীজ বালাইনাশক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আঁতাত করে কৃষি বøকে কৃষকদের কৃষি সেবা দেয়ার নামে দিনের পর দিন হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে এক বছর আগে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাগ চুরি করে বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ অস্বীকার করেননি তিনি। তিনি বলেন, ব্যাগ এলে দিয়ে দেব। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ জুনে।

হাজীগঞ্জের একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, ‘ঢালী একটা ধূর্ত অফিসার, কৃষি কার্ড দেবেন বলে বছর বছর ঘুরিয়েও দেননি। অথচ টাকা দিলেই কার্ড দিচ্ছেন। কৃষি কার্ড না থাকায় আমরা সরকারের এসব অ্যাপে ধান দিতে পারি না। ধান ব্যবসায়ীরাই এ এলাকার কার্ডধারী কৃষক।’

শাহরাস্তি উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা মজিবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘উপজেলা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে আমরা কৃষকদের সচেতন করতে কৃষকের অ্যাপে নিবন্ধন করতে মাইকিং করেছি। এছাড়া লিফলেট বিতরণ ও সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছি। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে নিবন্ধনকারীদের লটারি করা হবে। সেই তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ধানের আর্দ্রতা মেপে সঠিক ওজন দিয়ে বস্তা ভরে গুদামে রাখা হবে। এখনও নিবন্ধন চলছে। এখন পর্যন্ত শাহরাস্তিতে ৬৭৭ জন কৃষক কৃষকের অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন। আমার এখানে কোনো দালালচক্র কিংবা বেপারি, মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের কোনো কারসাজি নেই। যদিও প্রতিটি উপজেলার কৃষকদের অভিযোগ, প্রকৃত কৃষক হওয়ার পরও বছরের পর বছর কৃষি অফিসে ধরনা দিয়েও কৃষি কার্ড মিলছে না।