প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চাঁদপুরে দুই ভেড়া-বকনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন!

সমতলের অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প

বেলায়েত সুমন, চাঁদপুর : গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান অঞ্চলকে বাদ দিয়ে দেশের সমতল অঞ্চলের ২৯ জেলার ২১০ উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের নিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কক্সবাজার, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী অঞ্চলের রাখাইন, ত্রিপুরা, মুণ্ডা, বুনো এবং বকবানিয়া জনগোষ্ঠীর লোকদের উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চল-৪-এর আওতাভুক্ত করা হয়। শুরু থেকেই চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে নানা অনিয়মেই প্রকল্পের কার্যক্রম চলতে থাকে। ফলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের বদলে বঞ্চিত হওয়ার নতুন আরেক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্প শুরুর পরই প্রকল্পের আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহের জন্য ২০২০ সালের এপ্রিলে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার অনুকূলে ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় প্রকল্পের কাজ। প্রথমেই উপজেলায় বিপ্লব চন্দ্র বর্মণ নামে পৌর এলাকায় বসবাসরত একজন ফিল্ড ফ্যাসিলেটেটরকে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেয়া হয় প্রকল্প থেকে। পরে এ ফিল্ড ফ্যাসিলেটেটর পৌর এলাকার শ্রীপুর ও সাহাপুর থেকে ২৯ জেলে পরিবারের সদস্যদের ভোটার আইডি কার্ড ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে শাহরাস্তি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে জমা দেয়। যদিও প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় সুফলভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেঞ্চমার্ক সার্ভে (প্রশ্নপত্র জরিপ) পদ্ধতি অবলম্বন করে তালিকা তৈরির কথা ছিল। বেঞ্চমার্ক পদ্ধতি অবলম্বন না করেই নিজের পাড়া-প্রতিবেশীদের নাম তালিকাভুক্ত করেন ফিল্ড ফ্যাসিলেটেটর বিপ্লব চন্দ্র বর্মণ। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরের নভেম্বরে তালিকাভুক্ত সুফলভোগীদের দুই দিনের স্থলে নামকাওয়াস্তে এক দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রকল্পের সুফলভোগীদের তালিকা আর শাহরাস্তি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মাস্টাররোলে সংরক্ষিত প্রশিক্ষণ শেষে ভাতা নেয়া সুফলভোগীদের তালিকায় নামের অমিল থাকায় বিপত্তি দেখা দেয়। প্রকল্প অফিসে প্রেরিত সুবিধাভোগীর তালিকায় একই উপজেলার সাহাপুর গ্রামের মানিক চন্দ্র বর্মণ ও আশু চন্দ্র বর্মণের নাম চূড়ান্তভাবে থাকলেও তারা কোনো প্রশিক্ষণ ও ভাতা পাননি।

প্রকল্পের আওতায় আধুনিক পদ্ধতিতে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের লক্ষ্যে উন্নত জাতের ঘাস উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের কথা থাকলেও শাহরাস্তিতে নামমাত্রই চলছে প্রকল্পের ঘাস চাষ ও বাজার সৃষ্টির কার্যক্রম। প্রাথমিকভাবে প্রকল্প এলাকায় বেঞ্চমার্ক সার্ভে অনুযায়ী প্রকল্পের সুফলভোগীদের মধ্য থেকে কোনো একজনের ঘাস চাষের প্লট ও বাজার সৃষ্টি করার কথা থাকলেও প্রকল্পের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রকল্পে মাসভিত্তিক বেতনে কর্মরত ফিল্ড ফ্যাসিলেটেটর বিপ্লব চন্দ্র বর্মণকে ঘাস চাষের জন্য এবং ঘাসের বাজার সৃষ্টির জন্য প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাকসুদ আলমকে প্ররোচিত করার অভিযোগ পাওয়া যায়।

জানা যায়, বিপ্লব চন্দ্র বর্মণ নিজেই মাত্র আধা শতাংশ জমিতে নামমাত্র ঘাস চাষ করেন, তবে ঘাসের কোনো বাজার সৃষ্টি করতে পারেননি। ফলে প্রকল্পের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ খাতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার অনুকূলে ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সে বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানান। প্রকল্পের মাধ্যমে শাহরাস্তি উপজেলায়  ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও আমিষের চাহিদা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি করার কথা থাকলেও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের নানা অনিয়মে তা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কচ্ছপ গতিতে চলা প্রকল্পের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে নামমাত্র বরাদ্দ আর প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাহরাস্তি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার তথ্য গোপন ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারায়। উপজেলার কর্মকর্তা এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও অনুসন্ধানে অনিয়মের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রকল্পের ডিপিপি সংস্থান অনুযায়ী, শাহরাস্তি উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ২৯ সুফলভোগীর মধ্যে ২৩ সুফলভোগী প্রকল্পের মাধ্যমে সাতটি প্যাকেজের প্রথম প্যাকেজে একটি উন্নত জাতের ক্রসব্রিড বকনা বাছুর পাওয়ার সংস্থান ছিল। সংস্থান অনুযায়ী সুফলভোগীদের মধ্যে উপজেলার পৌর শ্রীপুর গ্রামের নিমাই চন্দ্র বর্মণ বকনা বাছুর পান। ২০২০-২১ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাছুরের ঘর পান নিমাই চন্দ্র বর্মণ। পরে আপৎকালীন খাদ্য সহায়তা হিসেবে বাছুরের ৯ বস্তা খাদ্য সহায়তা পান তিনি। প্রকল্পের দ্বিতীয় প্যাকেজে (ছয়টি প্যাকেজের প্রতিটিতে ২০টি) সোনালি মুরগি ও অস্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ বাবদ সহায়তা ও তিন মাসব্যাপী খাদ্য সহায়তার ডিপিপি সংস্থান থাকলেও উপজেলায় তালিকাভুক্ত সুফলভোগীদের কেউ সোনালি মুরগি, মুরগির বাসস্থান নির্মাণে সহায়তা ও তিন মাসের খাদ্য সহায়তা এখনও পাননি।

প্রকল্পের তৃতীয় প্যাকেজে (ছয়টি প্যাকেজের প্রতিটিতে ২০টি) খাকি ক্যাম্বেল হাঁস, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ বাবদ সহায়তা ও তিন মাসব্যাপী খাদ্য সহায়তার ডিপিপি সংস্থান থাকলেও উপজেলায় তালিকাভুক্ত সুফলভোগীদের কেউ খাকি ক্যাম্বেল হাঁস, হাঁসের বাসস্থান নির্মাণে সহায়তা ও তিন মাসের খাদ্য সহায়তা এখনও পাননি।

প্রকল্পের চতুর্থ প্যাকেজে (দুটি প্যাকেজের প্রতিটিতে) ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, স্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ বাবদ সহায়তা ও তিন মাসব্যাপী খাদ্য সহায়তার ডিপিপি সংস্থান থাকলেও উপজেলায় তালিকাভুক্ত সুফলভোগীদের কেউ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, বাসস্থান নির্মাণ সহায়তা ও তিন মাসের খাদ্য সহায়তা এখনও পাননি।

প্রকল্পের পঞ্চম প্যাকেজে (দুটি প্যাকেজের প্রতিটিতে দুটি) ভেড়া, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ ও তিন মাসব্যাপী খাদ্য সহায়তার ডিপিপি সংস্থান অনুযায়ী উপজেলার পৌর এলাকার লিটন চন্দ্র বর্মণ নামে এক সুফলভোগী দুটি পুরুষ ভেড়া পেয়েছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরের নভেম্বর মাসে প্রকল্পের বাজেট অর্ডার ১৫৫৩ অনুযায়ী ভেড়ার অস্থায়ী গৃহ নির্মাণ উপকরণ বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী গৃহ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে লিটন চন্দ্র ভেড়ার তিন মাসের আপৎকালীন খাদ্য সহায়তা পাননি বলে জানিয়েছেন উপজেলা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন। কেন তিনি ভেড়ার আপৎকালীন খাদ্য সহায়তা পাননি, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনননি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর।

প্রকল্পের ষষ্ঠ প্যাকেজে (ছয়টি প্যাকেজের প্রতিটিতে একটি) মহিষ, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ বাবদ সহায়তা ও তিন মাসব্যাপী খাদ্য সহায়তার ডিপিপি সংস্থান থাকলেও উপজেলায় তালিকাভুক্ত সুফলভোগীদের কেউ মহিষ, বাসস্থান নির্মাণ সহায়তা ও তিন মাসের খাদ্য সহায়তা এখনও পাননি।

প্রকল্পের সপ্তম প্যাকেজে (একটি প্যাকেজে একটি) হƒষ্টপুষ্টকরণ গরু, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ বাবদ সহায়তা ও তিন মাসব্যাপী খাদ্য সহায়তার ডিপিপি সংস্থান থাকলেও উপজেলায় তালিকাভুক্ত সুফলভোগীদের কেউ গরু, বাসস্থান নির্মাণ সহায়তা ও তিন মাসের খাদ্য সহায়তা এখনও পাননি।

প্রকল্পের আওতায়  শাহরাস্তি উপজেলায় মাত্র দুটি পুরুষ ভেড়া ও একটি ক্রসব্রিড বকনা পেয়েছেন দুই সুফলভোগী। দুটি ভেড়া ও একটি বকনার জন্য চলতি বছরের মে মাসে প্রকল্প থেকে শাহরাস্তি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বরাবরে ভ্যাটেরিনারি মেডিসিন, ভিটামিন অ্যান্ড মিনারেলস ও অ্যান্টিসেফটিকসহ মোট ৭২৯টি ওষুধ পাঠানো হয়েছে।

এর মধ্যে ইঞ্জেকশন রয়েছে ১৩১টি। ওষুধ এখনও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এসে পৌঁছেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. অসীম কুমার দাস শেয়ার বিজকে বলেন, সারা বছরের জন্য ওষুধ পাঠানো হয়েছে। দুই ভেড়া আর এক বকনার জন্য এত ওষুধ কেনÑএমন প্রশ্নের উত্তরে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রকল্পের সুফলভোগীরা ভবিষ্যতে আরও উপকরণ পাবেন।

প্রকল্পে অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. অসীম কুমার দাস জানান, অনিয়ম সম্পর্কে যেহেতু জেনেছি, সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেব।

চাঁদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, একজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানেন না, তা তো হতেই পারে না। কিছু না জানলে তিনি কীসের জ্বালানি ভাতা নিয়েছেন? আর প্রকল্পের তথ্য দিতে কেনইবা তিনি অনীহা প্রকাশ করছেন, তা আমার বোধগম্য নয়।

প্রকল্পে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহরাস্তি উপজেলার দায়িত্বরত উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাকসুদ আলম প্রকল্প সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান।