রামিসা রহমান : বিডি জবসে সরকারি চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারক চক্র। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম বিডি জবসের গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এই চক্রটি এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এ ধরনের বেশ কিছু তথ্য শেয়ার বিজের হাতে এসেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিডি জবসের অবহেলার কারণে এ ধরনের ভুয়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে প্রতারক চক্রটি। বিডি জবস কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে নিয়োগদাতাদের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করার মতো সব ধরনের টুলস নেই।
আর এই সুযোগে বিডি জবসে ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচারের মওকা পেয়ে যায় প্রতারণাকারী চক্রটি। ইতোমধ্যে ওই চক্রের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেক চাকরিপ্রার্থী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী এবং পেশাজীবীদের কাছে বিডি জবস একটি নির্ভরযোগ্য চাকরির সন্ধানদাতা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে নিয়োগের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, তেমনি প্রতিদিন হাজারো ব্যবহারকারী নতুন নতুন চাকরি খুঁজতে এই ওয়েবসাইট ঘাঁটেন।
সম্প্রতি বিডি জবসে প্রকাশিত একটি চাকরির বিজ্ঞাপনে যোগাযোগের জন্য একটি মেইল অ্যাড্রেস দেয়া হয়। ইমেইল অ্যাড্রেসটি হলো chcpproject@gmail.com । বিজ্ঞাপনে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হলেও সেটি যে প্রকৃত বা নিবন্ধিত কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। খোঁজ নিয়ে ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মেলেনি। আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট ইমেইল থেকে একটি উত্তর আসে, যেখানে আবেদনকারীর কিছু প্রাথমিক তথ্য চাওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ‘রেজিস্ট্রেশন ফি’ বা ‘প্রসেসিং চার্জ’ হিসেবে পাঠাতে বলা হয়।
ভুক্তভোগী এক চাকরি প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিজ্ঞাপনটি একটি স্বনামধন্য প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হওয়ার কারণে সন্দেহের অবকাশ রাখে না। চাকরি পাওয়ার আশায় অনেকের মতো আমিও নির্দিষ্ট ফি পাঠিয়ে দেই। মোবাইল ব্যাংকিং এবং অন্যান্য পেমেন্ট মাধ্যম ব্যবহার করে টাকা পাঠানোর পর নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের ইমেইল থেকে প্রাথমিকভাবে কিছু আশ্বাসমূলক বার্তা পাই। এর কিছু সময় পর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ইমেইলের কোনো উত্তর আসে না, প্রচারিত নম্বর বা ঠিকানায় যোগাযোগ সম্ভব হয় না এবং অবশেষে বুঝতে পারি, আমি একটি ভুয়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়েছি।’
এই প্রতারণার শিকার একজন প্রার্থী আশরাফুল সাদমান শেয়ার বিজকে বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে আমি বিডি জবসের ওয়েবসাইটে ‘কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট (CHCP Project) ’-এর নামে একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে পাই। সেখানে জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজে নিয়োগ, ভালো বেতন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়। একজন মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থী হিসেবে এবং মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার মানসিকতা থেকে আমি বিজ্ঞাপনটিকে গুরুত্ব দিই এবং সেখানে নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন করি। আবেদন করার পর প্রথমেই আমাকে বলা হয়, রেজিস্ট্রেশন বা ভেরিফিকেশন ফি হিসেবে ৭৪৫ টাকা একটি বিকাশ নম্বরে পাঠাতে হবে। চাকরির আশায় টাকাটা আমি পাঠিয়ে দেই। এর কিছু সময় পর আমার কাছে একটি ফর্ম পাঠানো হয়, যেখানে ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সম্ভাব্য কর্মস্থল এবং অন্যান্য তথ্য পূরণ করতে বলা হয়। ফর্মের সঙ্গে সুযোগ-সুবিধা এবং শর্তাবলি সংবলিত একটি ডকুমেন্টও সংযুক্ত ছিল। সেই শর্তাবলিতে উল্লেখ ছিল, প্রার্থীকে একটি ট্রেনিং কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে এবং এর জন্য ৩ হাজার ৭৫০ টাকা ফি প্রদান করতে হবে, তবে প্রশিক্ষণ শেষে এই অর্থ ফেরত দেয়া হবে। এই আশ্বাসের ভিত্তিতে আমি আবারও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। এরপর আমাকে আবার একই বিকাশ নম্বর দিয়ে বলা হয়, সেখানে ৩ হাজার ৮৩০ টাকা পাঠাতে হবে। চাকরির প্রত্যাশায় আমি ওই টাকাও পাঠিয়ে দিই।
ওই চাকরিপ্রার্থী আরও বলেন, ‘একদিন না যেতেই আমাকে আবার ফোন করা হয় এবং আরও বড় একটি প্রলোভন দেখানো হয়। ফোনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠান থেকে নির্বাচিত প্রার্থীদের একটি মোটরসাইকেল ও একটি ল্যাপটপ দেয়া হবে, যাতে তারা নিজ দায়িত্ব আরও দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারেন। তবে এই সুবিধা পেতে হলে আরও ১২ হাজার টাকা দিতে হবে এবং তা এক ঘণ্টার মধ্যেই পাঠাতে হবে, কারণ পণ্যগুলো সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার করে দেওয়া হবে। এই দ্রুত অর্থ পাঠানোর চাপ এবং অস্বাভাবিক সুবিধার কথা শুনে আমার সন্দেহ হয়।
‘আমি তখন আর দেরি না করে বিষয়টি যাচাই করার উদ্যোগ নেই। সরাসরি আমি নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিকের মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের রেজিস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখানে জানতে পারি, ‘(CHCP Project)’-এর নামে বর্তমানে এমন কোনো নিয়োগ কার্যক্রম চলছে না এবং তাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়নি,’ যোগ করেন ওই ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থী।
আশরাফুল সাদমান বলেন, ‘ওই কর্মকর্তা আমাকে জানান, এরকম ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের বিষয়ে এর আগেও একাধিকবার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও আমি তাদের ওয়েবসাইট বা অফিশিয়াল কোনো মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত কোনো সতর্কবার্তা খুঁজে পাইনি। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি বিডি জবস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তাদের পুরো ঘটনা খুলে বলি। বিডি জবসের এক প্রতিনিধি আমাকে জানান, বিষয়টি জানার পর তারা সংশ্লিষ্ট ভুয়া প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনটিকে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্লক করে দিয়েছে।’
প্রতারণা শিকার ওই চাকরিপ্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধু ব্লক করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি আমাকে বিডি জবসের মেইলে একটি অভিযোগ পাঠাতে বলেন। প্রতারিত হওয়ার বিষয়ে আমি বিকাশ কর্তৃপক্ষের কাছেও একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছি। বিকাশে আমার অভিযোগ নম্বর ৩০৪৩০১৯২। বিকাশ কর্তৃপক্ষ আমাকে আশ্বস্ত করেছে, ছয় কর্মদিবসের ভেতরে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। তবে এখনো আমার টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
বিডি জবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত নই। আমাদের প্রতিষ্ঠানে যদি কোনো বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেন, তাহলে আমরা তা খতিয়ে দেখি। ভুয়া বিজ্ঞাপন দিলে আমরা তাদের সঙ্গে সঙ্গে ব্লক করে দিই। আমাদের প্ল্যাটফর্মটা আসলে ফেসবুক ইউটিউবের মতোই। কিন্তু আমাদের আরও সাবধানতা অবলম্বন করে কাজ করতে হবে। আমাদের পক্ষে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে অফলাইনে শতভাগ ভেরিফিকেশন করা সম্ভব নয়। তাই আমরা অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন করে থাকি। কিন্তু এই বিষয়টা নিয়ে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা এর পর থেকে আরও সতর্ক থাকব।’
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে অনলাইন জব পোর্টালগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী নীতিমালা ও পর্যবেক্ষণ কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের বৈধ কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন নম্বর অথবা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে যাচাই করা, সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post